মানবজীবনের সাথে বৃক্ষের গভীর সম্পর্ক আছে। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছিলেন যে বৃক্ষের জীবন আছে। যার জীবনীশক্তি আছে তাকে অবশ্যই মৃত্যুবরণ করতে হবে। মানুষের জীবনীশক্তি, আত্মা, রূহ অদৃশ্য। তাকে দৃশ্যমান সত্তার সাথে তুলনা করা যায় না। দেহ মন সম্পর্ক এবং স্রষ্টার সাথে সৃষ্টি জগতের সম্পর্ক প্রায় সমপর্যায়ের। দেহ দৃশ্যমান সত্তা কিন্তু মন অদৃশ্য সত্তা। এই দৃশ্যমান সত্তার সাথে অদৃশ্যমান সত্তার সম্পর্ক কী করে হলো তা চিন্তাশীল সমাজকে ভাবিয়ে তোলে; কারণ দেহ চযুংরপধষ কিন্তু মন গবঃধচযুংরপধষ. দেহ মনের সম্পর্ক যদি না থাকবে তা হলে দেহ অসুস্থ হলে মন অসুস্থ হয়ে পড়ে, আবার মন অসুস্থ হলে দেহ অসুস্থ হয়ে পড়ে কিভাবে। আবার স্রষ্টার সাথে মানুষের সম্পর্ক কী করে হলো। স্রষ্টা ঝঢ়রৎরঃঁধষ কিন্তু মানুষ চযুংরপধষ. এই বস্তুর সাথে অবস্তুর তথা স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক কী করে হলো তা চিন্তাশীল সমাজের ভাবার বিষয়। মানুষকে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছে উন্নত প্রজ্ঞার কারণে। কিন্তু এই প্রজ্ঞার জ্ঞানে সে দেবতার ও উপরের চলে গেছে। তামাম সৃষ্টি জগতের অর্থাৎ ১৫ লাখ প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে মানুষ একটি প্রাণী। কিন্তু মানুষ সাধারণ প্রাণী নয়; বরং তাকে জীববৃত্তির সাথে দেয়া হয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি। তাকে দেয়া হয়েছে প্রবৃত্তি। তার উচ্চতর প্রজ্ঞার মাধ্যমে সে চলে যেতে পারে স্রষ্টার কাছাকাছি। কিন্তু নিম্নশ্রেণীর চর্চার কারণে আবার চলে যেতে পারে অধঃপতনের চরম ও চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ অধঃপতন থেকে বাঁচানোর জন্য মানুষকে প্রদান করা হয়েছে সত্য জ্ঞানের শিক্ষা। যে জ্ঞান তাকে মুক্তি দিতে পারে। জ্ঞান আবার দুই প্রকার বস্তুগত জ্ঞান আবার আধ্যত্মিক জ্ঞান। বস্তুগত বিশ্বের জ্ঞান হলো চযুংরপধষ শহড়ষিবফমব. আধ্যাত্মিক জ্ঞান হলো অবস্তুগত অর্থাৎ গবঃধঢ়যুংরপধষ শহড়ষিবফমব.
স্রষ্টা জগৎ সৃষ্টি করেই ছেড়ে দেননি; বরং জগতের স্থায়িত্ব ও অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তাকে তার গতি প্রকৃতির শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি মানুষের অন্ধকার গলিপথের মোড়ে মোড়ে আলোকশক্তি প্রজ্বলিত করে রেখেছেন। মানুষ যদি এই আলো থেকে বঞ্চিত হয় তা হলে সে হবে হতভাগ্য শ্রেণীর সদস্য। স্রষ্টা কাউকে জ্ঞান প্রদান করেছেন; আবার কাউকে সম্পদ প্রদান করেছেন। কিন্তু যাকে জ্ঞান প্রদান করেছেন তিনি হলেন ভাগ্যবান; কারণ জ্ঞানই শক্তি। এই শক্তি তাকে জাগতিক সমস্যার সমাধান করতে পারে। সম্পদ দ্বারা সভ্যতা চাকবাক্য হয় বটে কিন্তু এই চাক্যচিক্যময় সভ্যতা সত্য জ্ঞানের অভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হতে পারে। তাই সভ্যতাকে ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য স্রষ্টার সবচেয়ে বড় রহমত হলো তিনি মানুষকে জ্ঞান প্রদান করেছেন। জ্ঞানই শক্তি, এটি সর্বজনীন সত্য। তাই যিনি মহাজ্ঞানী তিনি সর্বশক্তিমান। মানবসত্তার জ্ঞান আর স্রষ্টার জ্ঞান এক নয়। কারণ যতটুকু জ্ঞান তাকে প্রদান করা হয়েছে তার বেশি জ্ঞান পাওয়ার অধিকার তার নেই; কারণ তিনি মানুষকে সৃজন করেছেন এবং তার চলার নির্দেশনা দিয়েছেন। একটি গাড়ি প্রস্তুতকারী গাড়ির তৈরির পর গাড়িটির স্থায়িত্ব ও পরিচালনার জন্য দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। মানুষের জীবন অবশ্যই একটি গাড়ির মতো তুচ্ছ নয়; বরং এই সৃষ্টি শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। গাড়ির ভেতর কোনো প্রবৃত্তি নেই। নেই কোনো হিংসা, হিংস্রতা ও ধ্বংসের খেলা। কিন্তু মানুষ কোটি কোটি মানুষকে হত্যা করতে পারে আবার অন্যকে বঞ্চিত রেখে ভোগের আসরে উন্মত্ত থাকতে পারে। এমনকি ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠতে পারে। স্রষ্টা যাতে মানুষ তার কৃতকর্মের ফলে ধ্বংস হয়ে না যায়, তার জন্য তিনি শিক্ষা প্রদান করেছেন যা সে জানত না।
একটি বৃক্ষের ভেতর নেই কোনো প্রবৃত্তির খেলা। বৃক্ষকে বাঁচিয়ে রাখে তার শিকড় ও লতাপাতার মাধ্যমে খাদ্য গ্রহণের ফলে। কিন্তু একটি বৃক্ষের শিকড়ের এমন কোনো গুণ নেই, যাতে সে রস টেনে জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করতে পারে। পাতার এমন কোনো শক্তি নেই যাতে সে খাদ্য গ্রহণ করে বৃক্ষের জীবনীশক্তি বৃদ্ধি করতে পারে; বরং বৃক্ষের জীবনীশক্তি বৃদ্ধির জন্য এমন কোনো ঘটনা ঘটে না, যাতে সে নিজ নিজই স্বয়ংসম্পন্ন। এই নিয়ন্ত্রণের ভার কে নেবে। কারণ বৃক্ষরাজি তথা জীবজগৎকে নিয়ন্ত্রণের জন্য এবং তার খাদ্য সরবরাহের জন্য এমন কিছু ঘটনা থাকতে হবে যিনি এগুলোর ব্যবস্থা করে থাকেন। নয়তো জীবজগতের অস্তিত্ব সংশয়পূর্ণ হয়ে ওঠে। মানবজীবনের সমস্যার কোনো শেষ নেই। সে যদি নিজের থেকে এগুলো নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করতে পারত, তা হলে তার দিকনির্দেশনার প্রয়োজন ছিল না।
মানুষের ইন্দ্রিয়ের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। তার ইন্দ্রিয় দ্বারা খেয়ালখুশিমতো আচরণ করতে পারে। কিন্তু পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের সীমাহীন স্বাধীনতা তাকে বিপদের ভেতর ফেলে দেখে। মুখ দিয়ে আপনি যা খুশি তাই বলতে পারেন না। হাত দিয়ে যা খুশি করতে পারবেন না। মস্তিষ্ক দিয়ে যা খুশি চিন্তা করতে পারবেন না। এমনকি বাসনা দ্বারা যা খুশি চাইতে পারেন না। মানুষের চাওয়ার ক্ষেত্রে ও সীমাবদ্ধতা থাকা উচিত। স্বাধীনতা মানে সুনির্বাচিত অধীনতা; অর্থাৎ যিনি স্বাধীনতা দাবি করবেন তার আত্মনিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা থাকতে হবে। যার আত্মনিয়ন্ত্রণের যোগ্যতা নেই, স্বাধীনতা দাবি করার অধিকার তার নেই।
মানুষের চাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা কেমন থাকতে হবে, তা একটি উদাহরণের দ্বারা বোঝাতে পারি। প্রতিবুদ্ধিজীবী জার্নাল ৩৩-এ সলিমুল্লাহ খান মানুষের সীমাহীন চাওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষতিকর দিকটি তুলে ধরেছেন।
‘বিষণœ মহেষখালি’ ‘প্রবন্ধে তিনি বলেন- একটা ক্ষুদ্র রাজ্য লিদিয়ার রাজা মিদাস দেবতার কাছে বর মানিয়া ছিলেন তাহার রাজ্যটি যেন সোনায় সোনায় ভরিয়া যায়। আর দেবতাও একদিন অপর্যাপ্ত পরিমাণে সেই বর মঞ্জুর করিলেন। বর ছিলেন রাজা যাহাতেই হাত দিবেন তাহাই তাহার স্পর্শের জাদুতে সোনা হইয়া যাইবে। তাঁহার সিংহাসনটি সোনার হইল। লোহার খাট সোনার হইল। সোনার হইল ঘরের মেঝে, দরজার কপাট, খাবার থালাবাটি। যাহাই রাজা হাতে ছুঁইলেন তাহাই সোনার হইয়া গেল। এই ক্রমে একদিন রাজার ফুটফুটে ছোট্ট মেয়েটি দৌড়াইয়া যেই রাজার কোলে বসল অমনি হইয়া গেল ছোট্ট সোনার পুতুলটি। রাজা হায় হায় করিয়া উঠিলেন।’
সুতরাং সীমাহীন চাওয়া যাবে না। চাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকা চাই। নইলে বিপদ আসতে পারে। উদাহরণটি হজরত ঈসার ছয় শত বছর আগেকার ক্ষুদ্র গ্রিক রাজ্য লিদিয়ার রাজার।
নশ্বর পৃথিবী কোনো কিছু চিরস্থায়ী না। সব কিছু ধ্বংসশীল। বিজ্ঞানী নিউটন বলেছেন, শক্তির কোনো ধ্বংস নেই; এক শক্তি আর এক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। বস্তুগত কোনো শক্তিতে রূপান্তর হবে তা মানবজ্ঞানের অতীত। কারণ মানুষ হলো অপূর্ণ সত্তা (ওসঢ়বৎভবপঃ নবরহম)। কিন্তু পরম সত্তা হলো পূর্ণ (ঢ়বৎভবপঃ)। তিনি তার সৃষ্টিজগৎ ধ্বংসের পর কী করবেন তা কিতাবের মাধ্যমে জানিয়ে দিচ্ছেন। এই জ্ঞানটা মানুষ ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে পাবে না। কারণ এটা অদৃশ্যের জ্ঞান। এই অদৃশ্যের জ্ঞান মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। যদি ¯্রষ্টা তার প্রতি অনুগ্রহ না করেন।
একটি বস্তু সদা পরিবর্তনশীল। তাই দার্শনিক হিরাক্লিটাস বলেছিলেন যে একই নদীতে দুইবার অবগাহন করা যায় না। পরিবর্তনশীল জগৎ সদা বিবর্তনের মাধ্যমে সৃষ্টি এবং ধ্বংসের খেলায় অগ্রসরমান। এই পরিবর্তন স্বতঃস্ফূর্ত। করোর খেয়ালিপনার কাছে সে নতি স্বীকার করতে পারে না। জগৎ জীবন নিয়ে মানুষের ভাবার শেষ নেই। পৃথিবীতে মানুষ আসার পর থেকে এই ধরনের চিন্তা সৃষ্টির উষ্ণা লগ্ন থেকে শুরু হয়েছে। এবং জগৎ ধ্বংস পর্যন্ত চলতে থাকবে। এর কোনো মীমাংসা নেই। কারণ এটা বিজ্ঞানের দ্বারা প্রমাণ করা যায় না। এগুলো হলো অনংড়ষঁঃব নবরহম. তাই এটা মানব জ্ঞানের অতীত।
সুতরাং পৃথিবীতে মানব জীবনের টিকে থাকার এবং জগৎ ধ্বংসের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আমাদের সত্য জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। কারণ সত্যই সুন্দর সত্যই মুক্তি। মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে মানুষ আজও এক সত্যে আসতে পারেনি। কিন্তু তার ভেতর সত্যের শিক্ষার জ্যোতি ছড়িয়ে পড়–ক জগৎ ও জীবনের স্বার্থে এই কামনা এবং বাসনা করা হচ্ছে একান্তভাবে।v
মানবজীবনের সাথে বৃক্ষের গভীর সম্পর্ক আছে। বিজ্ঞানী জগদীশ চন্দ্র বসু আবিষ্কার করেছিলেন যে বৃক্ষের জীবন আছে। যার জীবনীশক্তি আছে তাকে অবশ্যই মৃত্যুবরণ করতে হবে। মানুষের...
