মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের রয়েছে নানা রকম চাহিদা। সেই সাথে গাছপালা পশুপাখির ও চাহিদা বিদ্যমান। খাদ্য অন্যতম মৌলিক চাহিদা। খাদ্যের অভাবে সমাজে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় জানি। তেমনি সমাজের ও কিছু চাহিদা রয়েছে যার ওপর ভিত্তি করে সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় থাকে। যেমন, নীতি নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সততা, কর্তব্য, ধৈর্য, শিষ্টাচার, উদারতা, দেশপ্রেম, পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদি। আর এসব উপাদানের ঘাটতি হলেই সমাজে মূল্যবোধের দুর্ভিক্ষ হয়।
একটা রাষ্ট্রকে কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য আদর্শ নৈতিকতার বিস্তার লাভ করা খুবই প্রয়োজন। বিপরীত স্রোতধারায় ঘটে থাকে সামাজিক বিপর্যয়। সমাজের ভিত্তি প্রস্তরে ধরে ফাটল। অপরাধ প্রবণতা, দুর্নীতি, অনৈতিক কর্মকাণ্ডে আজ মানবীয় গুণের দুর্ভিক্ষ চলছে। বিবেকবোধ, ন্যায়বোধ চর্চায় ধরেছে মরিচা। পারস্পরিক শ্রদ্ধা আস্থা বিশ্বাস আজ বিলুপ্তির পথে। ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে বিশুদ্ধ সম্পর্কগুলো।
আধুনিক প্রযুক্তির সভ্যতার প্রতিযোগিতায় মানবীয় আচরণের ক্ষেত্রে বিচ্যুত প্রভাব সৃষ্টি করছে।
স্নেহার্দ্রতা, মমত্ববোধ নিখোঁজ হয়ে শূন্যতা সৃষ্টি করছে। উদ্ভূত হচ্ছে অনভিপ্রেত পরিস্থিতি। অথচ মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে তার মনুষ্যত্ব নৈতিক আচরণের কারণে। আমাদের মাঝ থেকে যেন দিনদিন মানবিক গুণাবলির শিক্ষা হারিয়ে যাচ্ছে। যন্ত্র আবিষ্কারের সাথে সাথে মানুষ ও যন্ত্র হতে চলছে। স্বার্থপরতা, লোভ, হিংসা মস্তিষ্ক দখল করে নিচ্ছে। শিরা উপশিরায় বইছে অনৈতিকতার ধারা। এই পরিস্থিতিতে জীবনব্যবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে ক্রমেই। এ দুর্ভিক্ষ নয় খাদ্যের, এ দুর্ভিক্ষ নয় বস্ত্রের, এ দুর্ভিক্ষ অন্তর্নিহিত বিচারবোধের, এ দুর্ভিক্ষ মনুষ্যত্বের।
অর্থকড়ি আর ক্ষমতা দিয়ে আজকাল সততাকে শৃঙ্খলের কারাগারে আটকে রাখা যায়।
বাড়ি, গাড়ি,নারী! সবই পাওয়া যায় প্রতিপত্তি আর টাকার জোরে।
শুধু আজ চার দিকে বিশ্বাসের দুর্ভিক্ষ চলছে যে ছেলেটি লেখাপড়ার সকল স্তরে প্রথম হয়েছিল তার পরিবারের সবাই তাকে বিশ্বাস করেছিল, রাষ্ট্র তাকে বিশ্বাস করেছিল।
যে মানুষটি সমাজের অভিভাবক তাকে ও এই দেশ জাতি বিশ্বাস করেছিল! কিন্তু কোথায় হারিয়ে গেলো সেই বিশ্বাস? কোথায় নৈতিকতা কোথায় মূল্যবোধ? সাম্প্রতিক সময়ে অপসংস্কৃতি গর্ভপাত করছে মূল্যবোধের ভ্রƒণ। মানুষের আজকাল খাদ্যের অভাব নেই, না খেয়ে কেউ মৃত্যু বরণ করে না। দামি গাড়ি কিংবা দামি গয়না কিছুরই অভাব নেই।
শুধু অভাব বিরাজ করছে এক চিমটি বিশ্বাসের এক ফোঁটা আদর্শের।
চার দিকে দেখি মানুষগুলো মানুষ না। সত্য নেই সত্যের জায়গায়। মিথ্যার জয়জয়কার। মিথ্যা দিয়ে সত্য ঢাকার প্রবণতা। শিল্প সাহিত্যেও এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে মহামারীর মতো। সাহিত্য চর্চা হয়ে উঠেছে স্বার্থ হাসিলের উপলক্ষ। কবিতা রচনা যেন সম্পদশালী ও ক্ষমতাবানদের তোষামোদের প্রকাশ। অথচ শিল্প সাহিত্য কিংবা কবিতা মানুষের জন্য হওয়ার কথা। কিন্তু তার কিছুই নেই। বরং মনুষত্ব ছাড়া বাকি সবই জ্বলজ্বলে। দুর্ভিক্ষ শুধু মনুষত্বের।