ভারত দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশে^র সপ্তম বৃহত্তম রাষ্ট্র। জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল তথা বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশটির পশ্চিম সীমান্তে পাকিস্তান, উত্তর-পূর্বে চীন, নেপাল ও ভুটান এবং পূর্বে বাংলাদেশ অবস্থিত। সংবিধানে দেশের ধর্মীয় অবস্থান সেকুলার বা অসাম্প্রদায়িক উল্লেখ করা হলেও ১৯৪৭ থেকে সাম্প্রতিক কালপর্ব পর্যন্ত ইতিহাসের ধারায় সাম্প্রদায়িক বৈশিষ্ট্য বেশি প্রকট হয়ে দেখা দেয়। কূট-রাজনীতির কবলে পড়ে বারবার সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ রক্তাক্ত করেছে দেশের ইতিহাস। ভ্রান্ত ইতিহাস চর্চা করেও কূট-রাজনীতির চালবাজিতে ভারতে হিন্দুত্ববাদিতা উসকে দিয়ে বারবার ভোটের বাক্স পূর্ণ করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কদর্য ইতিহাসও চলে আসছে। এতে দেশের সংহতি বিনষ্ট হচ্ছে। এ ব্যাপারে ভারতের বিবেকবান হিন্দু বুদ্ধিজীবীরাও শঙ্কিত।
২৯ রাজ্যের ১২১ কোটি (২০১২) জনসংখ্যার দেশের সংহতি ও একতার মূল চাবিকাঠি যে গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থা তাও আজ প্রশ্নের মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে ভারতের উচ্চ আদালত সম্পর্কে ভারতবাসীর যে আস্থা ছিল তা-ও ২০১৯ এ বাবরি মসজিদ নিয়ে ‘রাজনৈতিক রায়’ প্রদান ভারতবাসীদের চরম হতাশ করেছে। প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ বলেছেন, এটাকে রাজনৈতিক রায়- আর এ রাজনীতি হচ্ছে বিজেপি সরকারের ইচ্ছার প্রতিফলন, তা মোদি কর্তৃক প্রধান বিচারপতিকে ধন্যবাদ প্রদানের ভাষায় স্পষ্ট ধরা পড়েছে। এ ছাড়া ওই রাজনৈতিক রায়ের পুরস্কার পান গগৈ ২০ মার্চ ২০২০-এ মনোনীত হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার মাধ্যমে।
বিগত ১৩৪ বছর আইনি মামলার চূড়ান্ত রায়ে অযোধ্যার যে ২.৭৭ একর জমিকে বিরোধের মূলকেন্দ্র বলে গণ্য করা হয়, তা বরাদ্দ করা হয়েছে ‘রামলালা বিরাজমান’ বা হিন্দুদের ভগবান শ্রী রামচন্দ্রের বিগ্রহকে, যার অর্থ, সেখানে রামমন্দিরই তৈরি হবে। ভারতের শীর্ষ আদালতে পাঁচ সদস্যের একটি সাংবিধানিক বেঞ্চ সর্বসম্মতভাবে ওই রায় দিয়েছে। আদালত অপরপক্ষে অযোধ্যারই অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মসজিদ নির্মাণের জন্য বরাদ্দ করা হবে পাঁচ একর জমি। সর্বোচ্চ আদালতের রায় ঘোষণার সাথে সাথেই এর সমালোচনা করে অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি বলেছেন, মুসলমানদের দানের পাঁচ একর জমির প্রয়োজন নেই।
মুসলমানরা যে শান্তিপ্রিয় জাতি তা আরেকবার প্রমাণিত হয়েছে। এই রায় ঘোষণার পর ভারতসহ প্রতিবেশী দেশের মুসলমানরা কোনো সাম্প্রদায়িক বিরোধের সৃষ্টি না করে ধৈর্যধারণ করেছে। এমনকি খবর পাওয়া যায়নি, কোনো হিন্দুর ওপর কোথাও আক্রমণ করার। বরং যদিও এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার কোনো সুযোগ নেই তথাপি আইনি পথেই এই মামলার রায়কে চ্যালেঞ্জ জানায় মুসলিম ল বোর্ড। অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড ওই বছরই (২০১৯) ডিসেম্বরে অযোধ্যা মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ করে পুনঃশুনানির একটি আবেদন করেছিল। আবেদনটি খারিজ হয়। মামলার রায় নিয়ে কথা বলে এখন তেমন লাভ নেই। তবে আমরা ইতিহাসের দিকে তাকাতে পারি। কিভাবে ‘বিকৃত ইতিহাস’ চাপা দিচ্ছে সত্য ইতিহাসকে। আর ভারতে এ সত্য ইতিহাস চাপা দেয়া হচ্ছে কূট রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার স্বার্থে। সে বিষয় নিয়ে বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সামান্য আলোকপাত করব।
ভারতের উত্তর প্রদেশের অযোধ্যার ৫০০ বছরেরও অধিক পুরনো বাবরি মসজিদ ১৯৪৯ সালে (২২ ডিসেম্বর) আকস্মিকভাবে কিভাবে ‘রাম জন্মভূমিতে’ পরিণত হলো, আর ভারতের আদালতে অনিষ্পন্ন অবস্থায় ১৯৯২ সালের (৬ ডিসেম্বর) উগ্রবাদী হিন্দুদের দ্বারা গুঁড়িয়ে দেয়া হলো, কী কারণে? কংগ্রেস সরকার তখন ভেবেছিল এ কাজ করার মাধ্যমে তার দলের সাম্প্রদায়িক স্বার্থ রক্ষার বৈশিষ্ট্য হিন্দু জনতার কাছে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পাবে।
বাবরি মসজিদ ছিল উত্তর প্রদেশের ফৈজাবাদ জেলার অযোধ্যা শহরের রামকোট হিলের ওপর অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। ১৯৯২ সালে একটি রাজনৈতিক সমাবেশের উদ্যোক্তারা ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুযায়ী মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে মসজিদসংলগ্ন এলাকায় একটি রাজনৈতিক সমাবেশ শুরু করে, যা পরে মসজিদটি সম্পূর্ণরূপে ভূমিসাৎ করা হয়। এ মসজিদ ভাঙার পরপর ছড়িয়ে পড়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। যা মুম্বাই, দিল্লি শহরেই দুই হাজার মুসলামানের প্রাণ কেড়ে নেয়।
সত্যান্বেষী হিন্দুরাও বাবরি মসজিদের ঐতিহাসিক সত্যতা স্বীকার করলেও, প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণায় অযোধ্যায় কোথাও রাম জন্মভূমির হদিস না মিললেও, শুধু উগ্র হিন্দুদের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে ভারতের তৎকালীন সরকারপ্রধান নরসিমা রাও সম্পূর্ণ কূট রাজনীতির স্বার্থে এমন ন্যক্কারজনক কাজে ইন্ধন জুগিয়েছেন। কিন্তু ওই পক্ষপাতও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কংগ্রেসকে ক্ষমতায় বেশি দিন ঠাঁই দেয়নি। নরেন্দ্র মোদি ওই চেনা পথেই হাঁটছেন।
উল্লেখ্য, ১৫২৮ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ নির্মাণ করেন মুঘল সম্রাট বাবরের সেনাপতি মীর বাকি। তিনিই সম্রাট বাবরের নামে ‘বাবরি মসজিদ’ এর নামকরণ করেন। এর দুই বছর আগে ভারতে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (১৪৮৩-১৫৩০)।
দীর্ঘ ২৫৭ বছর পর ১৮৮৫ সালে এসে প্রশ্নের মধ্যে পড়ে বাবরি মসজিদটি। মহন্ত রঘুবীর নামে একজন মন্দির সেবক বাবরি মসজিদের বিতর্কিত কাঠামোর বাইরে সামিয়ানা টাঙিয়ে রামলালার মূর্তি স্থাপন করে আদালতের দ্বারস্থ হয়। আবেদন খারিজ করে দেয় ব্রিটিশ আদালত। এরপর চলে দীর্ঘ আদালতি প্রক্রিয়া।
ভারতের প্রতœতত্ত্ব বিভাগ ১৯৭৫ সালে ‘রামায়ণ বর্ণিত স্থানগুলোর প্রতœতাত্ত্বিক নির্ণয়’ নামক প্রজেক্টের কাজ করে। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের ডাইরেক্টর বি বি লাল ছিলেন এই উদ্যোগের সূচনাকারী। বিশেষজ্ঞরা বাল্মীকির রামায়নে উল্লিখিত পাঁচটি শহরে প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান চালায়। বাবরি মসজিদের পেছনেই ১১ মিটার গভীর পরিখা খনন করা হয়। প্রতœতত্ত্ব বিভাগের অনুসন্ধানের ফলাফলের সারাংশ প্রকাশ করে ‘ইন্ডিয়া টুডে (১৫ জানুয়ারি ১৯৮৯)’ ও ‘সানডে মেইল (২০ নভেম্বর ১৯৮৮)’ পত্রিকাগুলো। পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, উল্লিখিত স্থানটি রামের জন্মস্থান নয়।
প্রতœতত্ত্ব বিভাগ অনুসন্ধান করে জানিয়েছে, গুপ্তযুগে সেখানে কোনো বসতি ছিল না। সেখানে মানববসতি শুরু হয় মাত্র খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তম শতকে। আর অযোধ্যা ও তার আশপাশে খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতাব্দী থেকে শুরু করে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত জনবসতি ছিল না। ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকার প্রতিবেদক মিস্টার পংকজ পাচাউরি তার প্রতিবেদনে বলেন, ‘অযোধ্যায় যে ১৪টি স্থানে খননকাজ চালানো হয়েছে সেখানে রামের মূর্তি পাওয়া যায়নি। খননকাজের ফলাফল প্রতœতত্ত্ব বিভাগের জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে (Journal of Indian Archaeology 1976-77)।
ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রায়েও বাবরি মসজিদের জায়গা যে কারণে হিন্দুদের দেয়া হয়েছে
সে বিষয় ব্যাখ্যা দিয়েছে তা রামের জন্মভূমি ছিল এমন প্রমাণ সাপেক্ষে নয়, আদালত বলেছে, রাম চবুতরায় ‘দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন অব্যাহত পূজার্চনা’ এবং অন্যান্য তাৎপর্যপূর্ণ ধর্মীয় ক্রিয়াকলাপ চালানোর মাধ্যমে বাইরের অংশে দখলিস্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। হিন্দু সাক্ষীদের যুক্তি অনুসারে মসজিদের ভেতরে কসৌটি পাথরের স্তম্ভে হিন্দুরা পূজা করতেন বলে জানিয়েছে শীর্ষ আদালত।
তিন গম্বুজের সৌধে যে প্রবেশ পথ তা নিয়ে শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ-‘পূর্ব ও উত্তর দিকের দুটো দরজার সম্ভাব্য একমাত্র কারণ এই যে, বাইরের চবুতরা হিন্দু ভক্তদের দখলে ছিল।’ এর ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, সম্ভাব্যতার ভারসাম্য বিচার করলে প্রমাণাদি থেকে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে যে হিন্দুরা বাইরের চবুতরায় ১৮৫৭ সালে ইট ও জাফরির দেয়াল তৈরি করা সত্ত্বেও নিরবচ্ছিন্নভাবে পূজা চালিয়ে গেছেন।
কিন্তু এই যে একটা কাল্পনিক গল্প তৈরি করে ধীরে ধীরে একটা বিশাল মামলা এবং হাজার হাজার মানুষ বলি দেয়ার রক্ত-ইতিহাসের ধারাবাহিকতা চলছে এরও একটা কার্যকারণ ইতিহাস আছে। সেটা আবার ব্রিটিশ ইতিহাসের ভেতর লুকিয়ে রয়েছে। মানে কূট-রাজনীতি-ভাগ করো, শাসন করো। ব্রিটিশদের আদি কৌশল। সে বিষয়ে সামান্য দৃষ্টিপাত করছি।
ভারতের বাংলা ‘দৈনিক আনন্দবাজার’ পত্রিকায় লেখক গৌতম রায় ‘মন্দির না মসজিদ’ (ডিসেম্বর ১৯৯০) শীর্ষক প্রবন্ধে বলেন, ‘অযোধ্যার নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্র সময় থেকেই (১৮৪৭-৫৬) বাবরি মসজিদের সাথে রামমন্দির ভাঙার কাল্পনিক কাহিনীটি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা জুড়তে শুরু করে। লক্ষ্য নবাবকে গদিচ্যুত করে নবাবীকে সাম্রাজ্যভুক্ত করা। এই ষড়যন্ত্রের হোতা ছিলেন ঠগী দমন করে নাম কেনা কর্নেল উইলিয়াম স্লিম্যান। লক্ষেèৗতে ব্রিটিশ সরকারের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মুসলিম রাজশক্তির বিরুদ্ধে হিন্দু প্রজাদের ক্ষেপিয়ে তোলা ছিল তার আশু কর্তব্য। সুকৌশলে তিনি বাবরের মন্দির ভাঙার কল্পকাহিনী প্রচার করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ জাগিয়ে তোলেন। আজ যাকে সিতার রসুইঘর বা রাম চবুতরা বলা হয়, স্লিম্যানই সেখানে রামের পূজা চালু করান। ১৮৫৫ সালে স্লিম্যানের প্ররোচনা এবং তার উত্তরসূরি আউট্রামের প্রত্যক্ষ উসকানিতে হিন্দুরা সমগ্র মসজিদের অধিকার দাবি করলে দাঙ্গা লাগে।’
বাবরি মসজিদ রক্ষা না হলেও ভারতে মুক্তচিন্তার মানুষের কাছে প্রত্যাশা ছিল- সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে মারাত্মক খেলা চালানো হচ্ছে, হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য-ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তার অবসানে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ন্যায়ভিত্তিক রায় দিতে সমর্থ হবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি।
এবার আসুন দেখি বিকৃত ইতিহাসের পাতায় কিভাবে আরো সত্য ইতিহাস চাপা পড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে ভারতে।
ইংরেজ শাসকরা তাদের ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের স্বার্থে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বহুল পরিচিত ভাগ করার নীতি অবলম্বন করেছিল। কিন্তু এখন সেই ইংরেজ শাসন নেই, এখন কারা কোন স্বার্থে এমন বিবাদ-বিসংবাদ জিইয়ে রাখছে? স্বার্থটা এক, রাজনৈতিক ক্ষমতা, আর ওই নীতির ধারক বাহকরাও রয়েছে। সে দিন ইংরেজ-লালিত কিছু লেখক তাদের ইংরেজ প্রভুদের অনুগ্রহ পাবার লোভে তাদের চিন্তাভাবনার পরিপূরক টীকা-টিপ্পনি, ভাষ্য ও কল্পকাহিনী ইতিহাসে যুক্ত করে ইতিহাস বিকৃত করার ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত ছিল। এসব মিথ্যা কথনের মধ্য দিয়ে ইংরেজরা হিন্দু জনমানসে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ ছড়িয়ে ছিল। এই বিষবৃক্ষের বীজ এখন ভারতময় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। কোথাও কোনো ব্যক্তি মনে সুপ্ত, কোনো ব্যক্তি মনে তা গুপ্ত এবং রাজনীতিক মনে তা অঙ্কুরিত, প্রয়োগ-প্রয়োজনে তা বৃক্ষরূপ প্রাপ্ত ও ফলপ্রসূ হয়। আজ ভারতের জাতীয় স্বার্থে শুধু নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া তথা এশিয়ার স্বার্থে ইতিহাসের ওই সব বিকৃতিবা অতিরঞ্জন কথন অপনোদন করা জরুরি।
প্রথমে জোরপূর্বক ধর্মান্তর প্রসঙ্গে আসা যাক। মুসলমানদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ উত্থাপন করতে শোনা যায়, তরবারির ভয় দেখিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করত তারা। তুর্কি-মুঘলরা গ্রামে গ্রামে জোর করে ইসলামে দীক্ষিত করতে যাননি বরং ষোলো-সতেরো-আঠারো শতক অবধি সারা ভারতবর্ষের বেশির ভাগ অংশ তাদের শাসনে ছিল বলে ব্রাহ্মণ্য প্রভাব ছিল না। তাই সাধারণ মানুষ সহজেই ইসলাম বরণ করেছিল। তা ছাড়া সামাজিক জীবনে ইসলাম যে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, মানবাধিকার দিতে পেরেছিল, তাও ইসলাম গ্রহণের ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করেছিল। পূর্বে দক্ষিণে কোথাও দেশজ মুসলিম সংখ্যাগুরু ছিল না। আর রাজধানীতে চিরকাল তথা ৬০০ বছর ধরেই হিন্দুরাই ছিল সংখ্যাগুরু। তুর্কি-মুঘল আমলে আরব-ইরান, মধ্য এশিয়া থেকে লোক এসে একালের পশ্চিম এশিয়ার মতো কাজ করত, আবার ফিরেও যেত। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়ই ধর্মান্তরীকরণ ঘটত সুফি-ওলি-আউলিয়াদের উদারনৈতিক মনোভাবের জন্য।
ধর্মান্তরের চেষ্টা একমাত্র হয়েছে রাজনৈতিক অর্থে গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে এবং আশ্চর্যের কথা হলো, এ ধরনের চেষ্টাও হয়েছে মধ্যযুগীয় ইতিহাসের মাঝামাঝি সময়ে, প্রথম দিকে নয়। অথচ প্রথম দিকে এ ধরনের প্রচেষ্টা হলে তা আরো অর্থপূর্ণ হতো। কিন্তু লক্ষণীয় হলো, শুধু সেসব ব্যক্তিরই ধর্মান্তরের কথা উঠত যারা বিদ্রোহ করেছেন অথবা রাষ্ট্রের বিরোধিতা বা অনুরূপ কাজ করেছেন। সেসব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রদ্রোহীদের ক্ষমা করা অথবা তাদের গুরুত্বের কথা মনে রেখে তাদের কাছ থেকে নিবিরোধ আনুগত্যের স্বীকৃতি আদায় করা। মধ্য যুগে ধর্মকে জীবনে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হতো বলে নিজের ধর্ম ত্যাগ করে সম্্রাটের ধর্মকে গ্রহণ করাকেই আনুগত্যের পরাকাষ্ঠা মনে করা হতো। যেমন- সম্রাট আকবরের ‘দীন-ই-ইলাহি’ ধর্মকে অনেক হিন্দু অমাত্য গ্রহণ করেছিলেন সম্রাটের আনুগত্যকে দৃশ্যমান করতে। যাহোক, মধ্যযুগীয় ভারতে রাষ্ট্র কখনো ধর্মপ্রচারে আগ্রহ দেখায়নি।
আজকাল দেখা যাচ্ছে, একশ্রেণীর লেখক মুসলিম শাসকদের গড়া মন্দির ভাঙার বিষয়টি নিয়ে সবচেয়ে বেশি পানি ঘোলা করার প্রয়াস চালাচ্ছে। অথচ বিষয়টির সত্যাসত্য নিয়ে মোটেই চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে না। হিন্দু মন্দির ধ্বংস করার উদ্দেশ্য আর যাই হোক না কেন, ইসলামের প্রতি হিন্দুদের আকৃষ্ট করা নিশ্চয়ই নয়! কেননা কী করে আমরা ভাবতে পারি যে, কোন সম্প্রদায়ের হৃদয় জয় করা যায় তাদের মন্দির ধ্বংস করে? এই ধ্বংস ক্রিয়া তাদের মনে ইসলাম সম্পর্কে প্রেম নয়, বরং ঘৃণারই জন্ম দিতে পারে। তা হলে এ ধরনের কার্যকলাপের উদ্দেশ্য তাদের মন্দির ধ্বংস করা নিশ্চয়ই নয়! আর এটি ইতিহাসের সত্য কথন নয়।
গুজরাটের গণহত্যার সময় আক্রমণকারীদের মুখে বারবার সুলতান মাহমুদের সোমনাথ মন্দির ধ্বংসের কাহিনী এসেছে। বলা হয় যে মাহমুদ সোমনাথ দেবমূর্তি ধ্বংসের জন্য মন্দির আক্রমণ করেছিলেন। স্মর্তব্য যে, সোমনাথ মন্দির আক্রমণের আগে মুলতান শহরের ওপর আক্রমণ চালান মাহমুদ। সেখানে ছিল মুসলিম বাদশাহর শাসন। এই আক্রমণে মাহমুদকে মদদ জুগিয়েছিলেন লাহোরের রাজা আনন্দপাল।
মাহমুদ ওই বাদশাহকে পরাজিত করে মুলতান শহরকে তছনছ করে দেন। সেখানে একটি মসজিদও আস্ত ছিল না। তা হলে মাহমুদ মসজিদ ভাঙলেন কেন। সেখানে তো মূর্তি ছিল না? কেন মুলতানকে ধ্বংস করলেন, সেখানে তো হিন্দু শাসন ছিল না? এ ছাড়া মাহমুদের এক বিশাল হিন্দুবাহিনী ছিল যারা তার হয়ে মধ্য এশিয়ায় লড়াই করেছে। শুধু তা-ই নয়; মাহমুদ তার হিন্দু সেনাপতি তিলকের হাত দিয়ে দমন করিয়েছিলেন তারই মুসলমান প্রধান সেনাপতি নিয়ন্তিজিনের বিদ্রোহ। মাহমুদ যদি পৌত্তলিক বিরোধী হতেন তা হলে আফগানিস্তানের বামিয়ান বুদ্ধমূর্তি অক্ষত রাখলেন কী করে? ১৪০০ বছর মুসলিম শাসকরা ওই সহনশীলতা দেখাতে পেরেছেন এ জন্য, অন্য ধর্মকে আঘাত করা ইসলামের শিক্ষা নয়। সেই সাথে আরো লক্ষণীয় বিষয়, মুলতান থেকে সোমনাথ মন্দির আসার পথে আরো বহু মন্দির ছিল, একটাকেও মাহমুদ স্পর্শ করেননি। কোনো ঐতিহাসিক বলতে পারবেন না, যে আসার পথে মাহমুদ ওগুলোকে ধ্বংস করে এসেছেন। ফলে সিদ্ধান্ত নেয়া যায় যে দেবমূর্তি ধ্বংস নয়, সোমনাথ আক্রমণের মূল কারণ অন্য কোথাও। ধনসম্পদ লুটও হতে পারে এর উদ্দেশ্য-আমরা তা জানি না।
মাহমুদ যখন ওখান থেকে চলে গেলেন তখন সেই মন্দিরের দায়িত্ব দিয়ে গেলেন কোনো মুসলিম গভর্নরের হাতে নয়, দিয়ে গেলেন সেই রাজার ভাইয়ের হাতে। শুধু তা-ই নয়, সেই পরাজিত রাজার ভাইকে সিদ্ধান্ত দিয়ে গেলেন যে সে তৎক্ষণাৎ আবার সেখানে মন্দির বানাবে। মাহমুদের উদ্দেশ্য যদি হতো হিন্দু দেবতার মূর্তি ধ্বংস করা, তাহলে কেন তিনি মন্দিরের দায়িত্ব হিন্দুর হাতে দেবেন? যদি তার মতলব থাকত মূর্তিপূজা বন্ধ করা, তবে তিনি নিশ্চয়ই কোনো গোঁড়া মুসলিমকে দায়িত্ব দিয়ে যেতে পারতেন। যাতে কোনো দিন আর সোমনাথ মন্দির গড়ে উঠতে না পারে। তা হলে দেখা যাচ্ছে সুলতান মাহমুদ কর্তৃক সোমনাথ মন্দির ভাঙার ইতিহাসটাই একটা বিকৃত ইতিহাস। সাধারণ মানুষ এসব তথ্য জানতে পারে না। তাদের জানতে দেয়া হয় না। আর কোন কোন লেখক উগ্রবাদী দলের (বিজেপির মতো) আস্থা ও উপঢৌকনের আশায় বিকৃত ইতিহাস প্রচার করে হিন্দু-মুসলামানদের মধ্যে দাঙ্গা বাধিয়ে মজা লুটে। এ ছাড়া হিন্দু রাষ্ট্রের কথা বলে বিজেপি রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার জন্যও মুসলিমবিদ্বেষ ছড়িয়ে থাকে।
ভারতে সম্রাট আওরঙ্গজেবকে (১৬১৮-১৭০৭) প্রবল হিন্দুবিদ্বেষী বলে প্রচার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কাশীর বিশ^নাথ মন্দির ভাঙার। কিন্তু ওই শহরের জঙ্গমবাড়ি শিবমন্দিরকে তিনি বহু জায়গা জায়গির দিয়েছিলেন- এ ইতিহাস চাপা পড়ে থাকে। এক দিকে শিবমন্দির ধ্বংস করছেন, আবার অন্য দিকে একটি শিবমন্দিরকে জায়গির দিচ্ছেন; তা হলে বিষয়টি কী দাঁড়াল? এসব একশ্রেণীর মতলববাজদের অপপ্রচার ছাড়া কিছু না। উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরে দিনরাত্রি প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখার জন্য যত ঘিয়ের প্রয়োজন পড়ত তার সব খরচ আসত জায়গির হতে সেটি স্বয়ং আওরঙ্গজেব দান করেন। তিনি যদি এত হিন্দুবিরোধী ছিলেন তা হলে হিন্দুদের মন্দিরকে এত জায়গির দান করেছিলেন কেন?
বি এন পান্ডে এসব তথ্য সংগ্রহ করে একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, ওতে বিস্তারিত আছে। তা ছাড়া এলাহাবাদের সোমেশ^র নাথের মহাদেব মন্দির, গৌহাটির উমানন্দ মন্দির, মহারাষ্ট্রের নানদেড় জেরার মোহনপুরের দত্তাত্রেয় গুরুমন্দির, আমেদাবাদের শক্রঞ্জয় মন্দির, অযোধ্যার দন্তধাবন মন্দির, ভারতের প্রাচীনতম মন্দির-নাগেশ^র মন্দির,আবু পাহাড়ের মন্দির, জুনাগড়ের মন্দির, গয়ার মন্দির এবং একাধিক শিখ-গুরুদ্বারের জন্য ফরমান জারি করে জায়গির দান করেছিলেনর আওরঙ্গজেব। শুধু তা-ই নয়, মধ্যপ্রদেশের বর্ডার চিরকুটে আওরঙ্গজেব নিজেই রামমন্দির তৈরি করে দিয়েছিলেন এবং ওই মন্দিরকে ২৫০ বিঘা জমি জায়গির দিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব কেন এসব করতে গেলেন? ইসলামের মূল কথা হলো- অন্য ধর্মকে আঘাত না করা, ভালোবেসে কাছে টেনে নেয়া। কিন্তু একশ্রেণীর মতলববাজ লেখকরা বিকৃত ইতিহাস লিখে উপমহাদেশে দুই বৃহৎ সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে সাহায্য করছে।
মারাঠারা টিপু সুলতানের সময় মহীশূর আক্রমণ করেছিল। এই মারাঠারা হিন্দু, তারা মহীশূরের পবিত্র মন্দিরটি ধ্বংস করে সব সম্পদ লুণ্ঠন করেছিল। তখন টিপু একটি চিঠি লিখেছিলেন জগৎগুরু শংকরাচার্যকে যে, ‘আমি অনুতপ্ত, আমি মন্দিরটি রক্ষা করতে পারিনি। মন্দিরের কী কী লোকসান হয়েছে আপনি তালিকা করে আমার কাছে পাঠান-আমি তার ক্ষতিপূরণ দেবো।’ শংকরাচার্য তালিকা পাঠিয়েছিলেন এবং টিপু সব ক্ষতিপূরণ দিয়েছিলেন। তার রাজত্বকালে হিন্দুগণ উচ্চ রাজপদ লাভ করেছিলেন। হিন্দুদের নিজস্ব মত ও বিশ^াস অনুযায়ী ধর্মাচরণের পূর্ণ অধিকার ছিল, তিনি হিন্দু মন্দির ও ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের ভূমিদান করেছেন। মুসলিম হয়েও হিন্দুদের দেবমূর্তি বা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠায় অনেক ক্ষেত্রে অর্থ দিয়েছেন, এমনকি একবার এক মন্দির নির্মাণের নির্দেশ পর্যন্ত দিয়েছিলেন।
জিজিয়া সম্পর্কেও ভুল তথ্য প্রচার করা হয়। বলা হয় এটি ছিল অমুসলিমদের নির্যাতনের একটি আইনি পদ্ধতি বিশেষ। কিন্তু তা মোটেও না। জিজিয়া নারী, শিশু, বৃদ্ধ, দরিদ্র, সৈনিক, পঙ্গু, ভিখারি, তীর্থযাত্রী, নিঃস্ব, অসহায়, সম্বলহীন কৃষকরা দিতে বাধ্য ছিল না- তারা ছিল সম্পূর্ণ জিজিয়ামুক্ত। জিজিয়া দিতে হতো তৎকালে মোট জনসংখ্যার মাত্র ১০ শতাংশ লোককে। জিজিয়া শুধু ভারত নয়, বহিঃভারতের মুসলিম রাজ্যে মুসলিম প্রজার থেকেও আদায় করা হতো। ভারতে ধনী মুসলিমদের জন্য ছিল জাকাত। এ ছাড়া খারাজ, খামস, ফিদিয়া, ওশর ইত্যাদি করও মুসলিমদের দিতে হতো ধর্মীয় বিধান মতো।
একসময় (ব্রিটিশ আমলে) হিন্দু জমিদাররা দাড়িকর বসাত। তিতুমীরের বিদ্রোহের কারণের মধ্যে এই দাড়িকর ছিল অন্যতম। তা ছাড়া হিন্দু জমিদাররা মুসলিমদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে যে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করত আজো ভারতে কী এর ছিটেফোঁটা বহাল নেই? গোহত্যার অপরাধে মানুষ হত্যা কী চলছে না? এগুলো একধরনের ইতিহাসের বিকৃত ব্যাখ্যা এবং রাজনৈতিক হীন ফায়দা লুটে নেয়ার মতলববাজদের কর্ম। কিন্তু কেন যেন কিছুতেই থামছে না ভারতে।
মোট জনসংখ্যার দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী মুসলিমদের (১৪.২% ২০১৭) ধর্মীয় অধিকার নিয়ে ভারত সরকারকে ভাবতে হবে। মতলববাজদের সুযোগ দিয়ে কূট-রাজনীতির গাছের গোড়ায় পানি না ঢেলে বৃহত্তর স্বার্থে বিকৃত ইতিহাসের ধাঁধা থেকে ভারতকে বের হতে হবে। তা না হলে ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা কোন কিছুর দ্বারাই সম্ভব হবে না।