আজকের লেখা আমার জীবনের কিছু ছোট ছোট ঘটনা দিয়ে শুরু করতে চাই। আমি তখন সবেমাত্র তৃতীয় শ্রেণীতে উঠেছি। আমাদের বাড়ির চার দিকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বসবাস। সেখানে মুসলিম সম্প্রদায় একটা দ্বীপের মতো। এ কারণেই ছোটবেলা থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সাথে আমার ওঠাবসা, স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা, বড় হওয়া। আমাদের পাশের বাড়িটি ছিল সনাতন ধর্মীদের সবচেয়ে নীচুস্তরের যে শ্রেণী তাদের। আমরা এদের সঙ্গেই বড় হয়েছি। তাদের সঙ্গে হাটে বাজারে গেছি, স্কুলে গেছি। আমার মনে আছে ওই পাড়ায় এক মহিলা বাস করতেন। তাকে আমরা কাকিমা বলে ডাকতাম। কাকিমাকে রাত-বিরাতে মানুষের বিপদ আপদে ছুটে আসতে দেখতাম। আমার একটা ঘটনা মনে আছে। আমি একবার হাঁটতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে যাই এবং পায়ে প্রচণ্ড ব্যথা পাই। খবর পেয়ে কাকিমা এসে হাজির। আমাকে দেখে তিনি বাড়িতে ফিরে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পর কিছু লতা-পাতাসহ ফিরে এলেন এবং আমার মাকে একটা রসুন থেঁতলিয়ে সরিষার তেলে গরম করে দিতে বললেন। আমার দৃশ্যটা এখনো মনে আছে। আমার পা তার কোলের ওপর তুলে নিয়ে অত্যন্ত মমতায় আমার ব্যথার জায়গায় গরম তেল মালিশ করে তার আনা লতা-পাতা দিয়ে বেঁধে দিলেন। পরদিন সকালে দেখি পায়ের ব্যথা এবং ফোলা দুটোই কমে গেছে। এ ঘটনা আজো আমার মনকে আলোড়িত করে।
আরেকটি ঘটনা মনে আছে। আমার ছোট ভাই যখন জন্মগ্রহণ করে। এবারও কাকিমা এসে হাজির। এসেই আমার মায়ের যতেœ লেগে পড়লেন। প্রসবান্তে গোসল থেকে শুরু করে যা যা করা দরকার সবই তিনি করে দিলেন। আমার মা কী খাবে কী খাবে না তাও ঠিক করে দিলেন। মজার ব্যাপার হলো এর জন্য তিনি কোনো পারিশ্রমিক নেননি। এই যে সহৃদয়তা, এই যে সম্পর্ক, এটা তো আত্মিক। এটার কোনো বিনিময় নেই। সে সময় একজনের বিপদে সবাই ছুটে আসত। কে মুসলিম কে অমুসলিম তা বিবেচ্য বিষয় ছিল না।
আমি তখন তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি। ফুফুর বাড়িতে বেড়াতে গেছি। বাড়ি থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে। রাতে ঘুমিয়ে গেছি। হঠাৎ লোকজনের শোরগোল হইচইয়ে ঘুম ভেঙে গেল। দেখি ফুফুর বাড়ি হ্যাজাকের আলোয় আলোময়। অনেক লোকজন। ফুফু বললেন আমাকে বাড়িতে যেতে হবে। আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না।
সবেমাত্র তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি, কী বুঝব। এখনো মনে হলে হাসি পায়। আমাকে পালকিতে করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলো। বাড়িতে গিয়েও দেখি একই কাণ্ড। অনেক লোকজন এবং চার দিক হ্যাজাকের আলোয় আলোময়। আমাকে নতুন কাপড় পরিয়ে বাইরের ঘরে নিয়ে আসা হলো। সেখানে দেখি আমার মতোই আরেক শিশু বসে আছে। সে ছিল সনাতন ধর্মীর। আমাদের দু’জনের হাতে রাখি বেঁধে দেয়া হলো। এটা করা হতো দুটি বিভিন্ন সম্প্রদায়কে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করার জন্য। সমাজে-রাখি ভাইরা আপনজনের মতোই ছিলেন এবং পরিবারের সুখ দুঃখে অংশগ্রহণ করতেন। বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে তাদের উপস্থিতি অপরিহার্য্য ছিল। এভাবেই মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে এ দেশের মানুষ-হাজার বছর ধরে বাস করে এসেছে পরম আত্মীয়ের মতো। এখনো আমাদের দুই পরিবারের রাখি সম্পর্ক অটুট রয়েছে।
সে সময় ধর্ম পিতার প্রচলন ছিল। তারা পিতার মতোই ভূমিকা পালন করতেন। আমার বাবারও একজন ধর্ম কন্যা ছিল। তিনিও ছিলেন সনাতন ধর্মী। বছরে একবার আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। আসার সময় মোয়া, খই এসব শুকনা খাবার নিয়ে আসতেন। আমরা তাকে দিদি বলে ডাকতাম। তিনি আমাদের ভাই ডাকতেন। আমাদের বাড়িতে তার জন্য আলাদা থালা, বাসন, হাঁড়ি-পাতিল সবকিছুর সাথে থাকার একটা ঘরও ছিল। সে সেখানে এসে থাকত। নিজে রান্না করত এবং যা খেতে চাইত বাবা তা-ই বাজার থেকে এনে দিতেন।
আমার পড়াশোনা দিনাজপুর শহরে। দিনাজপুর পূজা পার্বণের শহর। মুসলমানের সংখ্যা খুবই কম ছিল। আমার এক বন্ধু ছিল পঙ্কজ মণ্ডল। আমরা প্রতিবার সরস্বতী পূজার পরের দিন আট-দশজন বন্ধুবান্ধব মিলে তার বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। পঙ্কজের মাকে আমরা মাসিমা বলে ডাকতাম। পূজার পরের দিন হতো ওদের উল্লাহার। যত রকমের ফল পাওয়া যেত সবই থাকত। আমাদের কাছে এটা ছিল অনেকটা উৎসবের মতো। মাসিমা অত্যন্ত যতেœ আমাদের সবাইকে খাওয়াতেন। কেউ আসতে না পারলে মাসিমা অস্থির হয়ে উঠতেন। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করতেন অমুক আসেনি কেন? সে অসুস্থ কিনা? এভাবেই তিনি সবার খোঁজখবর নিতেন। পরীক্ষার ফল বেরুলে সবাইকেই ডেকে পাঠাতেন। মিষ্টিমুখ করাতেন। দিনাজপুরের বিখ্যাত পুরোহিত পরিবার পণ্ডিত স্যারের পরিবার। শহরের কোনো পূজাই হতো না পণ্ডিত স্যার ছাড়া। শহরের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার অবাধ যাতায়াত ছিল তার বাড়িতে। আপ্যায়িত হতেন সবাই। পুলিন বিহারী চক্রবর্তী-পণ্ডিত স্যার নামেই পরিচিত ছিলেন। যতবারই আমি তার সাথে দেখা করতে গেছি, তার শোয়ার ঘরেই দেখা করেছি। তার বিছানায় বসেই আপ্যায়িত হয়েছি। প্রতিটি ছাত্রছাত্রীই তার কাছে ছিল সন্তানতুল্য। কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধের সময় যখন অমুসলিমরা দলে দলে উদ্বাস্তু হয়ে দেশ ত্যাগ করেন, তখন দেখেছি তাদের নিজ নিজ জিনিসপত্র গরু, ছাগল প্রতিবেশীর কাছে বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। যাওয়ার সময় বলে গেছেন ‘দাদা এগুলো রেখে গেলাম, যদি ফিরে আসি ফেরত দিয়েন আর না এলে এগুলো আপনার।’ স্বাধীনতার পর ফিরে এসে তারা এগুলো বুঝে নিয়েছেন। এই বিশ^াসের মধ্য দিয়ে আমরা বড় হয়েছি। এটা লেখাপড়া দিয়ে হয় না। অর্থের বিনিময়েও পাওয়া যায় না। এটা গড়ে ওঠে-পারস্পরিক বিশ^াস ও আস্থা থেকে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভেতরে সম্পর্কটা এভাবেই হাজার বছর ধরে গড়ে উঠেছে আমাদের দেশে। এটা আমাদের ঐতিহ্য। এ দেশের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী লোকদের মধ্যে মিলেমিশে থাকা, সুখ দুঃখ ভাগ করে নেয়া, একজনের বিপদে ছুটে আসা আমাদের সাংস্কৃতিক ধারা। এই ধারার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। শৈশব থেকেই দেখে এসেছি সম্প্রদায় নির্বিশেষে বিপদে আপদে সত্যপীর বা জিন্দাপীর, চেহেল গাজীর দরগায় সবাইকে মানত করতে, শিরনি দিতে। হজরত শাহজালাল রহ: বা খানজাহান আলীর ভক্তদের ভেতরেও রয়েছে অসংখ্য অমুসলিম।
খারাপ লাগে ইদানীং যে ব্যাপারগুলো ঘটছে সেগুলো দেখে। কোথায় যেন সম্প্রীতির সুরটা ভেঙে গেছে। অবিশ^াসের দোলাচল আমাদের ভেতর বাসা বেঁধেছে। এর কারণটা অবশ্যই খুঁজে বের করা দরকার। এ ব্যাপারে সবারই ভূমিকা রয়েছে। সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে সরকারের। ভূমিকা রয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের, সমাজের প্রভাবশালীদের, বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও ধর্মগুরুদের। ভূমিকা রয়েছে প্রচার মাধ্যমগুলোর। এগুলোতে সামাজিক সম্প্রীতিমূলক অনুষ্ঠানমালা প্রায় নেই বললেই চলে। যা ছিটেফোঁটা আছে তা অনেকটা দায়সারা গোছের। ছোট বেলায় আমরা পড়েছি- ‘পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই, একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই।’ এই চেতনা আমাদের পাঠ্যসূচি থেকে ক্রমেই উধাও হয়ে যাচ্ছে। নীতিবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষা ছাড়া ভ্রাতৃত্ববোধ তৈরি হয় না। তৈরি হয় বস্তুবোধ। যা সমাজে সঙ্ঘাত সৃষ্টি করে। শিশুরা ভবিষ্যতের নাগরিক হিসেবে পরিবার, প্রতিবেশী ও সমাজকে চিনবে, দেশকে জানবে। নৈতিকতাবোধসম্পন্ন নাগরিক হয়ে গড়ে উঠবে- এ ধরনের একটা শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
নৈতিক ভিত্তি যখন দুর্বল হয়ে পড়ে তখন দুর্নীতি ও দুষ্কর্ম প্রবল হয়ে ওঠে। আমাদের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। এখানে কেউ কারো হন্তারক হবে না, কেউ কারো জমি দখল করবে না, কাউকে তাড়িয়ে বেড়াবে না, কারো বাড়ি পোড়াবে না, কোনো মূর্তি ভাঙবে না। এটা বাংলাদেশে কখনো ছিল না। এটা নতুন উৎপাত। বাংলাদেশের যে সামাজিক শৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক ঐক্যবোধ, এটার ওপর চরম আঘাত। এ ব্যাপারে এখনই আমাদের সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়াতে হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।