করোনাকালে বাংলাদেশের শেয়ারবাজার দুই মাস বন্ধ ছিল! গোটা বিশ্বের কোথাও দুই মাস একাধারে শেয়ারবাজার বন্ধ ছিল- এই রকম রেকর্ড নেই। প্রাক্তন-কমিশনের মেয়াদ শেষের দিকে বা শেষ হওয়ার কারণে খোলা রাখার ক্ষেত্রে এতটা গুরুত্ব দেয়নি। এতে করে বিনিয়োগকারীরা খুব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদেশীরা তো এই দেখে আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। সেই সাথে আমাদের দেশের লোকজনও শেয়ারবাজারের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলল। স্টক মার্কেট পৃথিবীর কোথাও বন্ধ থাকেনি, থাকে না। বন্ধ থাকে না ব্যাংকও। কয়েক দিন বাংলাদেশে ব্যাংক বন্ধ ছিল। তবে শেষের দিকে ব্যাংক সীমিত আকারে চালু ছিল; কিন্তু তখনো স্টক মার্কেট বন্ধ। স্টক মার্কেটের সূচক পার্সেন্টিজ ৪০০০-এর নিচে চলে গিয়েছিল! তখন বিনিয়োগকারীদের যে কী দুরবস্থা ছিল তা বলার অপেক্ষা রাখে না!
তবে নতুন কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর ৯ মাসে সূচক প্রায় ৯০ শতাংশ বেড়েছে। এ কারণে মানুষ আবার স্টক মার্কেটে ফিরে আসছে। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা বাড়ছে। মানুষ তার ফান্ড নিয়ে এই মার্কেটের দিকে এগোচ্ছে! প্রতিদিন যে বেচাকেনা সেটি দুই-আড়াই হাজারের দিকে যাচ্ছে। এই লেনদেন দিন দিন আরো বাড়বে। নতুন নতুন কোম্পানিও দিন দিন আসছে। আসছে তারা নতুন নতুন প্রোডাক্ট নিয়ে। আসছে সুকুক বা সুদবিহীন ইসলামিক বন্ডও। আগে এটা তেমন উল্লেখ করার মতো ছিল না! কিন্তু এটা এখন যথেষ্ট সম্ভাবনার দিকে যাচ্ছে। আরো অনেক বন্ড প্রোডাক্ট আনা হচ্ছে। সেই সাথে মার্কেটও বড় করা হচ্ছে! এ কারণে কিছু নিয়মকানুনের পরিবর্তন করা হচ্ছে। যেমন আগে আইপিওতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কোটা বরাদ্ধ কম ছিল। এখনকার কমিশন সেটি বৃদ্ধি করেছে। ফলে স্বাভাবিক পদ্ধতিতে মার্কেট বড় হচ্ছে। এভাবে অনেক সংস্কার করেছে, করছে। বাদ দেয়া হয়েছে লটারি সিস্টেমও। মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে নতুন করে তেমন সংস্কার করা হয়নি; কিন্তু চিন্তাভাবনা হচ্ছে। আমাদের সিকিউরিটি অ্যান্ড কমিশন চেয়ারম্যান বলেছেন- মিউচুয়াল ফান্ড যারা পারফর্ম করে তারা কমিশন বেশি পাবে। তো এটা দরকার ছিল আগ থেকে করা। সেটি করা হয়নি! এতে করে তারা বিনোয়োগকারীদের ঠকিয়েছে। সামনের দিকে হয়তো আর এতটা ঠকাতে পারবে না। ট্যাক্সের তথা করপোরেট ইনকাম ট্যাক্সের হারের দিকটা কমানো উচিত। কিছুটা হয়তো কমছে; কিন্তু এটা আরো কমানো উচিত। এখানে বিনোয়োগের উৎসাহ হয় তো আরো বাড়ত।
আরেকটা হচ্ছে যে, সরকার কিছু শেয়ার ছাড়ার কথা ছিল। আগের অর্থমন্ত্রী অনেকবার বলেছিলেন অমুক তারিখে তমুক তারিখে শেয়ার বিক্রি করা হবে। আসলে কোনোটাই বিক্রি করতে পারেনি। আমরা মনে করি সরকার যদি এখনো সেটি ইচ্ছা করে তাহলে মার্কেটে ভালো দাম পাবে। হাজার হাজার কোটি টাকা সরকার এখান থেকে নিতে পারবে। ইন্ডিয়ার মতো দেশে এয়ার ইন্ডিয়া এয়ারলাইন্স টাটা সন্সকে বিক্রি করে দিয়েছে! আর বাংলাদেশে কয়েক লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি করতে পারে না। এটা আসলেই অনেক দুঃখজনক বিষয়। প্রধানমন্ত্রীকে কেউ যদি এতটুকুও বলতে পারত- সরকার এখান থেকে যথেষ্ট টাকা আয় হবে, তাহলে হয়তো হয়ে যেত।
তাহলে কাজটা এগোবে বলে আমাদের বিশ্বাস। সরকার যে অবকাঠামো তৈরি করছে- ফ্লাইওভার বলো, ব্রিজ বলো কিংবা মেট্্েরারেল বলো এগুলোও শেয়ারবাজারে আনা যায়! বিদেশে এসব আনা হলেও বাংলাদেশে তা আনা হচ্ছে না। কেউ উদ্যোগ নেয়ার প্রয়োজনও মনে করেনি। এই বিষয়টা দুঃখজনক। শেয়ারবাজারে উচ্চ মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণ আছে। নিম্ন মধ্যবিত্তের পয়সাকড়িও নেই-অংশগ্রহণও নেই। তবে মধ্যবিত্ত লোকদের আশা আছে। তাদের যদি সুযোগ করে না দেয়া হয় তাহলে তারা হতাশায় নিরাশায় ভোগবে। আর উচ্চ মধ্যবিত্তরা বা বণিকশ্রেণী বিদেশে টাকা পাচার করবে এবং করছেও। তাদের জন্য বিনিয়োগের জায়গা যদি আমরা ব্যবস্থা করতে পারি তাহলে উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত খুশি হবে এবং উচ্চবিত্তরা খুশিতে টাকাপাচার বন্ধ রাখবে। যদিও এই প্রক্রিয়া অতি সহজে বন্ধ হবে না! তবুও পাচার অনেকটা কমে আসবে।
এখন শেয়ারবাজারে আস্থা অনেকটা ফেরত এসেছে। যদিও অনেক শেয়ারের দাম অনেকটা বাড়তি তবুও অনেক অনেক কোম্পানির শেয়ার দাম বাড়েনি। আসলে দিন দিন শেয়ার আস্থাই বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরেকটা বিষয়- জুয়া শেয়ারবাজার। ইন্ডিয়া, চীনসহ প্রায় দেশেই এটা আছে। আমাদের দেশে বিদেশের মতো উন্নত মানের ভালো কোম্পানি নেই। ফলে জুয়ার দিকে এগোয় মানুষ। আশা করি উন্নত দেশের মতো এই দেশেও ভালো ভালো কোম্পানি আসবে। সেই সাথে জুয়া ক্যাসিনোর প্রভাবও কমে যাবে। সবশেষে এই কথাই বলতে চাই, শেয়ারবাজারের প্রতি এই করোনা-উত্তর সময়ে বেশির ভাগ বিনিয়োগকারীই আশাবাদী।