করোনা-পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতির চিত্র কিছুটা নিশ্চল। করোনার আঘাত সারা পৃথিবীতে পড়েছে। বিভিন্ন দিক ও বিভাগে পড়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি পড়েছে অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়েছে খুব। এর মধ্যেও অর্থনীতির কিছু কিছু সূচক মোটামুটিভাবে উজ্জ্বল। আর এসব সূচকের উজ্জ্বলতাই সম্ভাবনাকে গ্রহণ করে! কিছু কিছু সূচক নেতিবাচক বা উজ্জ্বল নয়। ২০২১ এ রফতানি আয় ৪৮ মিলিয়ন ডলারের উপরে ছিল। সেপ্টেম্বরে এসে ৪৬ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এতে দেখা যায় ২ মিলিয়ন ডলার কমেছে! এর ফলে টাকার বিনিময় মূল্যও কমে গেছে। আগে টাকার বিনিময়মূল্য ছিল ৮৫.৫। টাকার অবমূল্যের কারণ আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া। এর ফলে উৎপাদনমূল্যও বেড়েছে। আবার ডলারের চাহিদা বাড়ার কারণেও টাকার মূল্য কমেছে।
অর্থনীতির আরেকটি সূচক হচ্ছে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশী প্রবাসীদের অর্থ। সেখানে দেখা যায়, জুলাই-আগস্ট ২০২১ এ অবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক ছিল না! সে সেময় আমি বলেছিলাম এর প্রবাহ ধরে রাখা কঠিন হবে। কেন? কারণ তাদের কাছে যেসব সঞ্চয় ছিল সেগুলো দেশে তাদের পরিবারের কাছে পাঠিয়েছিল। কিন্তু টাকার মূল্য কম থাকায় তারা আশানুরূপ অর্থ হাতে পায়নি। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। রেমিট্যান্স কমে গেল।
আরেকটি কারণ খুব গুরুত্বপূর্ণ। তা হলো বিদেশে করোনা বিপর্যয়ে অনেকে চাকরি হারিয়েছে। অনেকের ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকে বেকার হয়ে গেছে। সে সাথে করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থব্যবস্থা খুব একটা সন্তোষজনক অবস্থানে ছিল না। ফলে এখানে সমস্যাটি বড় হয়ে উঠেছে। এই কথাটিও আমি বলেছিলাম গত সেশনের সমীক্ষা বিশ্লেষণে। বাংলাদেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে রফতানি পণ্যের একটা বড় ভূমিকা আছে। নব্বই দশক থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত জাতীয় উৎপাদনে রফতানি আয় ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। জাতীয় উৎপাদনের কারণে এই বৃদ্ধি ঘটেছে। তবে করোনার কারণে রফতানি খাত বেশ কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যার ফলে ২০-২১ অর্থবছরের জুলাই আগস্টে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল মাত্র ২.২ শতাংশে। এখন সেটার চাকা ঘুরে কিছুটা বেড়েছে। কাজেই আশা করা যায় করোনা-পরবর্তী সময়ে দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাবে এবং পাচ্ছেও। এই প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে আশা করা যায়। রফতানি আয় কমার কারণ হলো, যেসব দেশে আমাদের রফতানিপণ্য যায় সেসব দেশেও করোনার প্রভাবে রফতানি কমে গেছে। কোনো কোনো দেশে বন্ধই হয়ে গেছে। কাজেই দেখা যাচ্ছে করোনা-পরবর্তী প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক। তারপরও করোনা সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়ায় যথেষ্ট অনিশ্চয়তাও রয়েছে। হয়তো এ অনিশ্চয়তা কেটে যাবে একদিন।
রফতানি খাতে কিছুটা ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির দিক দেখা যাচ্ছে। তবুও এই অর্থ বছরে জুলাই-আগস্টে দুই মাসে প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক । যে বিষয়টা উল্লেখযোগ্য এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রয়োজনীয় তা হচ্ছে- ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি। প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হলে অর্থনৈতিক উন্নতিও ঘটবে। দেখা যাচ্ছে- মূল্যবান জিনিসের আমদানি, মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি বেশ বড় মাত্রার প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এর সাথে আবার করোনা টিকারও কিছুটা সম্পর্ক আছে। সবার টিকা দেয়া। টিকা না দিলে বিদেশ যেতে না পারা- এসবও এখন কাজ করছে অর্থনীতির ক্ষেত্রে। তবে যা-ই হোক সব মিলে উৎপাদনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। একটি কথা মানতে হবে যে- আমাদের দেশের অর্থনীতি অনেকটা আমদানির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী, যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যাটারিয়াল অর্থাৎ কাঁচামাল ইত্যাদি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে জুলাই-আগস্টে বর্তমান অর্থবছরে আমদানি বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে! এই অর্থবছরের দুই মাসে যা দাঁড়িয়েছে ১১ শতাংশে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরে ছিল ১২.৪ শতাংশ।
একইভাবে মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানিও বেড়েছে। গড়মাত্রায় ২৭ শতাংশ যা গত অর্থবছরে ছিল ২৪ শতাংশ। ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যাটেরিয়ালে দাঁড়াল ৩৭ শতাংশে যা পূর্বের অর্থবছরে ছিল ২১ শতাংশ। আমাদের দেশের যে উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে তার প্রমাণ বহন করে ওই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আমদানিতেই। বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি প্রবৃদ্ধি থেকেই সেটা দেখা যায়। মূল্যস্ফীতি মোটামুটি একই রকম। ৫.৬ শতাংশের ধারে কাছে আছে। বার্ষিক হিসেবে দেখা যায় সেটা ৫.৫ শতাংশেই রয়েছে। এটা খুব বেশি না! কাজেই আমি মনে করি মূল্যস্ফীতি নিয়ে খুব বেশি চিন্তার কারণ নেই।
তবে একটি বিষয় খুব ঝুঁকিপূর্ণ। সন্তোষজনক তো নয়ই। সেটি হলো ব্যাংক সেক্টর। ব্যাংক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও সন্তোষজনক নয়! আর সন্তোষজনক না হওয়ার কারণগুলোর একটি হলো ব্যাংকঋণ। এ ঋণের কারণে অর্থনীতির কিছুটা ব্যত্যয় ঘটেছে। ঋণের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। ঋণখেলাপির সংখ্যা বাড়ছে এবং সে সংখ্যাটি আশঙ্কাজনক। এখানে ঋণখেলাপি যারা তাদেরকে নানা রকম সুবিধা দেয়া হয়েছে। তারপরও ঋণ পরিশোধের চিত্র খুব একটা সন্তোষজনক নয়। অগ্রগতিও নেই তেমন। এই বিষয়টায় বিশেষ নজর দেয়া দরকার। ঋণগ্রহীতা গড়িমসি করলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থ নেয়া দরকার। এবং সে আইনকে কিভাবে দ্রুত প্রয়োগ করা যায় সে বিষয়টার প্রতি কর্তৃপক্ষের বিশেষ দৃষ্টি দেয়া লাগবে।
মূল্যস্ফীতি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে খানিকটা বেশি। দেখা যায় প্রতি মাসে ৫ শতাংশের ওপরে। আমার কাছে যে তথ্য আছে সে হিসেবেই এই কথা বলছি। আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তাহলো বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ। এটি অনেকদিন ধরে ৮ পার্সেন্টের সামান্য ওপরে থাকছে। এখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি টার্গেট ছিল প্রায় সাড়ে ১৪ পার্সেন্টের মতো। এখানে একটা চিত্র দেখতে পাচ্ছি- একদিকে ঋণের প্রবৃত্তি কম ব্যাংকঋণ থেকে। অপর দিকে আমদানির মাত্রা বেড়ে গেছে। যাই হোক এখন পর্যন্ত পার্শ্ববর্তী অনেক দেশের তুলনায় আমাদের অর্জন ভালো। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যে দেশগুলো আছে তাদের থেকে আমরা ভালো অবস্থানে আছি। বলা যায় ইন্দোনেশিয়া মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুর কোরিয়া ইত্যাদি দেশের তুলনায় আমাদের পরিস্থিতি অনেকটা ভালো। পাকিস্তানের তুলনায় আমাদের পরিস্থিতি আরো ভালো। ভারতের তুলনায় আমাদের অবস্থান ভালো ছিল! কিন্তু আগামী বছরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে সে হিসেবে বলা যায় যে ১০ পার্সেন্টের বেশি প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যাবে। তবে সার্বিক পরিস্থিতি ভেবে বলছি হতাশার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি। আশা করি হবেও না।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষক। আর গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ হচ্ছে কৃষি। এ কৃষি ক্ষেত্রের বিষয়টা ভালোই দেখছি। শস্য উৎপাদনও ভালোই চলছে। আমাদের কৃষিমন্ত্রী তো এ খাতে অনেকটা বিপ্লব ঘোষণা করেছেন। তাই কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লব চলছে। যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হয় তাহলে যথেষ্ট সন্তোষজনক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি ক্ষেত্রেও যে ঋণের প্রবাহ দেখছি সেটাও ভালোই আছে। তবুও সেটা কিছুটা কমেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে ছিল ৩৪৫৬ কোটি টাকা। এই অর্থবছরে এসে কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬৭৫ কোটি টাকা। কাজেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের কোনো ঝুঁকি নেই যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ না আসে। তবে একটি দুঃখের বিষয় যে, অনেক চাষি চাষ করতে যে ব্যয় করে তা আর পূরণ হয় না। বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দিন দিন কৃষক ঋণগ্রস্ত হচ্ছে। ঋণগ্রস্ত হয়ে গ্রাম ছেড়ে শহরের দিকে ছুটে আসছে। স্থানীয় কিছু কর্তৃপক্ষ লোভী হয়ে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে বলে এ অবস্থা সৃষ্টি হয়। একইভাবে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। নানান সমস্যার সাথে নদীভাঙনও এর করুণ পরিণতি নিয়ে আসে। আবার কখনও অবকাঠামো বা রাস্তাঘাট নির্মাণ, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্যাক্টরি ইত্যাদিতে জমির পরিমাণও কমে যায়।
এক পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে বছরে প্রায় ৩ পার্সেন্ট চাষযোগ্য জমি কমে যাচ্ছে। কৃষি যন্ত্রায়ন যথেষ্ট নেই। গ্রামের জনসংখ্যা যেমন বৃদ্ধি পেয়েছে সে হারে কৃষির সুবিধা বৃদ্ধি পায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষিতে আশার দিক না পেয়ে শহরমুখী হচ্ছে মানুষ। আসলে কৃষিতে সফল হতে হলে আরো সহযোগিতা বাড়াতে হবে। যারা শহরে চলেই এসেছে তাদের জন্য সার্ভিস এবং শিল্প খাতেও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা দরকার। আর যারা গ্রামে রয়ে গেছে তাদের মধ্যে অনেক ছোট কৃষক বা বর্গাচাষি রয়েছে। তাদের কৃষিব্যয়ের ঘাটতি থাকার কারণ হলো ফসল ওঠার সাথে সাথেই বিক্রি করে দেয়া। অথবা বিক্রি করে দিতে বাধ্য হওয়া। এর কারণ ফসল সংরক্ষণ করার কোনো ব্যবস্থা নেই তাদের। সে ফসল যদি পরে বিক্রি করার সুযোগ তাদের থাকতো তাহলে এমন সমস্যাটা হতো না।
ঋণের চাপে বাধ্য হয়ে তাদের কেউ কেউ শহরেও আসতো না। শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব এতটা বাড়ত না। এই ক্ষেত্রে সময়োপযোগী পরিকল্পনা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। তবেই এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। এদেশের মানুষ পরিশ্রম করতে জানে। ঝড় বাদল, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে ফের ঘুরে দাঁড়ায়। এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে। এ স্বপ্নই এগিয়ে দেয় মানুষকে। দেশের জন্য এভাবেই তিলে তিলে কাজ করছে মানুষ। সুতরাং করোনার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ।