জন্মদিন এলে শিশুরা ভীষণ আনন্দিত হয়। কারণ ওই দিন তাদের ঘিরে সবাই আনন্দ-উৎসব করে আর ওদের ভাসিয়ে দেয় উপহারের জোয়ারে। আগে দেখতাম বিত্তবানদের ঘরেই এই উৎসব প্রধানত উদযাপিত হতো। কিন্তু এখন মধ্যবিত্তকে ছাড়িয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারেও ছোঁয়া লেগেছে জন্মদিন উৎসবে।
ছোটদের যেমন আনন্দ দেয় জন্মদিন উৎসব, বড়দের বেলায় উল্টোটা দেখি। অনেকেই বেশ আতঙ্কিত হন এই দিনটি এলে। এহ্। বড় হয়ে যাচ্ছি যে তো! একটা বছর চলে গেল! অনেকে মনেই করতে চান না এই বিশেষ দিনটিকে।
আমার ছোটকালে কোনো দিন জন্মোৎসব হয়েছে বলে মনে পড়ে না। বড় বোনদের বিয়ের পর প্রথম দেখলাম তাদের সন্তানদের বেশ ঘটা করে পালন করা হচ্ছে দিনটি। আমার জন্মদিনটা জানতাম মায়ের মুখে শুনে, কিন্তু কোনো দিন বিশেষ কোনো ‘অনুভব’ পাইনি এটা নিয়ে। মনেও থাকতো না কখনো বা। বুড়োবেলায় এসে নিজের সন্তানদের জন্মদিন পালন করেছি। আবার তারা বড় হয়ে তাদের বাবা-মায়ের জন্মদিন বেশ চমকপ্রদভাবে পালন করছে নিয়মিত।
জন্মদিনের সাথে বয়েস বাড়ার সরাসরি সম্পর্ক। প্রথম প্রথম আমারও মনে হতো হায় হায় আর একটা বছর চলে গেল! সময় যাবার সময় মনে হয় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে, আর চলে যাবার পর মনে হয় যেন দৌড়ে পালিয়ে গেল। এ এক অদ্ভুত খেলা। এই সময়ের পালিয়ে যাওয়াটাই মনটাকে মুষড়ে দেয় মনে কত কিছু করার ছিল গত বছরটায়, কিন্তু করা হলো না।
নয়া দিগন্তের জন্মদিনেও কি এর সাথে সম্পৃক্তদের এমনতর মনে হয়েছে? কত কিছু করা হয়নি? যদি এমন মনে হয়ে থাকে তাহলে তাদের জন্য আমি একটি আপ্তবাক্য শোনাতে পারি আব্বার কাছে শোনা। তিনি কোনো মনীষীর লেখা থেকেই বলেছিলেন আমাকে। প্রতিটি দিনই তোমার বাকি জীবনের প্রথম দিন। জন্মদিনও তেমনি একটি দিন। সুতরাং নতুন সঙ্কল্প নিয়ে নবোদ্যমে কাজে লেগে পড়ার দিন।
আমার আব্বা মরহুম মোহাম্মদ আব্দুস সালাম রেলওয়েতে চাকরি করতেন ব্রিটিশ আমল থেকে। চট্টগ্রামের সিআরবিতে তার দফতর ছিল সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে। রেলওয়ে কর্মচারীদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের কেন্দ্র ওয়াজিউল্লাহ ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। দীর্ঘকাল আমৃত্যু। আমার জ্ঞান হওয়া থেকে দেখেছি তাকে এই দায়িত্বে।
সেখানেই এক অনুষ্ঠানে একবার তাকে সংবর্ধনা দেয়া হয়েছিল জন্মদিন উপলক্ষে। সে দিনই কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন এই আপ্তবাক্যটি। প্রচুর বই পড়তেন আব্বা। সেখান থেকে কিছুটা নেশা পেয়েছি আমি এবং আমার বোনেরা।
অনুষ্ঠান শেষে বেশ অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিলেন সে দিন। জানালায় দাঁড়িয়ে আমি অপেক্ষায় ছিলাম তার। দরজা খুলে বেরুলাম বাগানে। প্রধান রাস্তার ওপরেই বাসা ছিল আমাদের, টাইগার পাসে। হঠাৎ শুনি রিকশাওয়ালার সাথে বেশ একটা তর্কাতর্কি লেগে গেছে আব্বার।
আমার আব্বার মত ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ আমি খুবই কম দেখেছি আজ অবধি। সেই মানুষটা হঠাৎ কেন এমন ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন, বুঝলাম না।
আমি ছ’আনার বেশি এক পয়সাও দেবো না।
আব্বা বেশ উত্তেজিত হয়ে বলছেন, শুনলাম।
আট আনার কমে আমি নেবো না।
রিকশাচালকের জাবব। চাটগাঁর ভাষায়।
তোমাকে কিন্তু ছ’আনা বলে এনেছি।
আমি আপনাকে বলেছি আট আনার কম নেবো না। আট আনাই দিতে হবে।
না দিলে কী করবে? মারবে?
দরকার হলে তাই করবো।
বৃদ্ধ রিকশাচালক তখন উত্তেজনার চরমে। বেচারা সারা দিনের পরিশ্রমের ফলে মেজাজ হারিয়েছে। আর আববাও সারা দিন অফিস করে, সন্ধ্যায় ক্লাবে অনুষ্ঠান শেষে বেশ ক্লান্ত। তার চেয়ে আব্বার ব্যাপারটা বুঝতে দেরি হলো নাÑ তার কাছে রিকশাচালকের দাবিটা অনৈতিক মনে হয়েছে।
আব্বা দিয়ে দেন না আট আনা।
আমি বলেছিলাম।
না, কেন দেবো? আমি তো ভাড়া বলে এনেছি। আমাকে মারবে বলেছে, মেরে নিয়ে যাক পয়সা।
এরপর রিকশাচালকের দিকে ফিরে বলেনÑ
কই এস, মার আমাকে। ছুরি নাই? ছুরি বের করো। না থাকলে, এই যে আমার সিনা, মেপে নিয়ে যাওÑ সেই মাপের ছুরি নিয়ে এসে মেরে পয়সা নিয়ে যাও।
উরে বাপরে! এত উত্তেজিত আব্বা! ভাবাই যায় না। প্রশান্ত মহাসাগরের মতো শান্ত যে মানুষ, তার ভেতর এত রাগ আমি কল্পনাই করতে পারছিলাম না। এর মধ্যে আম্মা এবং আমার ছোট দ্’ুবোন দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। উদ্বিগ্ন সবাই।
আব্বা, আসেন, বাসায় আসেন, আমি পয়সা এনে দিচ্ছি।
না, এক পয়সাও বেশি দেবো না।
নিবো না আপনার পয়সা।
বলেই এক হেঁচকা টান দিয়ে রিকশায় উঠে চলে গেল রিকশাচালক।
আব্বাকে টেনে ভেতরে নিয়ে এলাম আমি। তিনি তখনও ফুঁসছেন রাগে। আম্মা, আব্বার উপর বিরক্ত হয়ে কিছু একটা বলছিলেন তাতে আব্বার রাগ আরও বেড়ি গিয়েছিল। হাতের ফুলের তোড়াটা টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলে প্রায় চিৎকার দিলেন।
চুপ করো। বেয়াদ্দব একটা রিকশাওয়ালা, আবার তার পক্ষে কথা বলো!
বেশ একটা উষ্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেও কিছুক্ষণের মধ্যে সব ঠাণ্ডা হয়ে এলো। আব্বাও স্বীকার করলেন রেগে যাওয়াটা মোটেও উচিত হয়নি তার। ওটা নিশ্চয় এনায়েত বাজারের রিকশাওয়ালা, ক্লাবের আশপাশেই থাকে হয়তো। দেখা হলে ক্ষমা চেয়ে তার ভাড়াটা দিয়ে দেবেন তিনি।
তারপরই ঘটল, আরেক ঘটনা। আব্বা হঠাৎ আঁৎকে উঠলেন যেতে যেতে।
এই যা!
কী হলো?
আম্মাও আতঙ্কিত।
আমার প্যাকেটটাতো নামানো হয়নি রিকশা থেকে।
কিসের প্যাকেট?
আরে, নতুন দুটো প্যান্ট আর সার্ট বানিয়েছিলাম দর্জি ক্লাবে পৌঁছে দিয়ে গেল সন্ধ্যায়।
এসেছিলেন আপনি? যা ভুলো মন আপনার।
আম্মা বলেছিলেন।
আরে না। সারা পথ কোলের ওপর ধরে রেখেছিলাম। তারপরই তো লেগে গেল ঝামেলা।
হায় হায়। এতগুলো টাকার জিনিস।
রিকশায় থাকলে নিশ্চয় দিয়ে যেত রিকশাচালক।
আমিই বললাম।
হুু যার নীতির ঠিক নেই সে আবার
বলেই আচ্ছা সামলে নিলেন নিজেকে।
ও আর পাওয়া যাবে না। জন্মদিনটাই অপয়া।
হতাশা আম্মার কণ্ঠে।
মন খারাপ করা মানুষগুলো কিছুক্ষণের মধ্যেই সব ভুলে ঘুমে নিমগ্ন হলো। নিয়ম তাই। চার দিকে নিস্তব্ধতা। তার মধ্যেই বাইরের জাফরিতে প্রবল ধাক্কা। কে যেন বাইরের দারজায় ধাক্কা দিচ্ছে গভীর রাতে।
ঘটনার তখনো চমক বাকি রয়েছে আসলে।
উঠে দেখি আব্বার কাপড়ের প্যাকেট হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে সেই বৃদ্ধ রিকশাচালক। আব্বাও ততক্ষণে উঠে এসেছেন।
এই নেন আপনার কাপড়। রিকশাতে ফেলে এসেছিলেন।
আমরা সবাই হতবাক।
মানুষটির সততা আমাদের যতটা মুগ্ধ করেছে। তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগছিল তার সম্বন্ধে নেতিবাচক স্মরণ করায়।
আব্বা তাকে সিনাতে টেনে নিলেন। দুঃখ প্রকাশ করলেন তার মেজাজ হারানোর কারণে। পাঁচ টাকা বকশিশ দিতে চাইলেন। কিছুতেই রাজি হলো না রিকশাচালক ভাড়াটা নিয়ে সালাম দিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিল।
ক’দিন পর হঠাৎ করেই আম্মা বাসায় আলোচনা করছিলেন- এবার জন্মদিনে কী শিখলাম জানো? মানুষের ওপর কখনো বিশ্বাস হারাতে নেই।
এই বিশ্বাস রাখতে গিয়ে কয়েকবার ঠকেছেন জানি, কিন্তু জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল তার মানুষের ভালোবাসা। জনসম্পৃক্ত মানুষ ছিলেন আমৃত্যু।
এই জন্মকালে নয়া দিগন্তের তাই সঙ্কল্প হোক- জনসম্পৃক্ততা। মানুষের দোরগোড়ার পৌঁছিয়ে তাদের ভালো-মন্দের, দুঃখ-কষ্টের এবং আনন্দ-বেদনার কথা তুলে এনে দেশের আম জনতার কাছে পৌঁছে দেয়ার। উৎসব হোক নতুন কাজের, কাজেই তো আনন্দ। তবে হয়তো বেশি শ্রমের প্রয়োজন। অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন তো অবশ্যই, কিন্তু অর্জনটা হবে অবিশ্বাস্য রকম পরিমাণের। শুভ হোক আগামীর জয়যাত্রা। হ