সংস্কৃতি বলতে কী বোঝায় তা নিয়ে মতভেদ আছে হয়তো, থাকা স্বাভাবিক; কেননা, সংস্কৃতি একদিকে যেমন ঐতিহ্য সূত্রে লব্ধ অধিকার তেমনি ব্যক্তি বা সমাজবদ্ধ মানুষের সাম্প্রতিক মনন-স্বপ্নের সমাহার, দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উৎকর্ষমণ্ডিত নিদর্শন। সংস্কৃতি বলতে আমরা অবশ্যই মানুষের, লোক সাধারণের সংস্কৃতি বোঝাচ্ছি। তবু, লোকসংস্কৃতি কথাটা আমরা ব্যবহার করি কিছুটা ভিন্নার্থে। এক সুনির্দিষ্ট তাৎপর্যে। কোনো অনির্দেশ অস্পষ্টতায় নয়। আবহমান কাল থেকে সাধারণ সংগ্রামী মানুষের জীবনচর্যার শিল্পীত রূপটিকেই আমরা বলতে পারি লোকসংস্কৃতি। কালসীমায় একে আমরা শিল্পযুগ পূর্ববর্তী নগর চেতনায় দূরবর্তী কেন্দ্রে অবহিত সংস্কৃতি বলে চিহ্নিত করতে থাকি। আধুনিককালে অবশ্য নগর অভ্যন্তরেও এর অনুপ্রবেশ অনুধাবনযোগ্য। যে দেশে শতকরা ৮৫ থেকে ৯০ ভাগ অধিবাসী গ্রামবাসী, ১০ থেকে ১৫ ভাগ শহরবাসীর বেশির ভাগের রয়েছে নানা যোগাযোগÑ এই অনুপ্রবেশ সেখানে সহজেই বোধগম্য। অবশ্য লোকসংস্কৃতি একটি দেশের সর্বব্যাপী জীবনচর্যার প্রতিরূপ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই তো অঞ্চল বিশেষজ্ঞরও হতে পারে, তারও অংশ বিশেষেরও হতে পারে। ড. আশরাফ সিদ্দিকীর একটা কথা এখানে যথার্থ মনে হয় : ‘ঋড়ষশ পঁষঃঁৎব বা লোকসংস্কৃতি কথাটা শুনতে ছোট্ট হলেও এর পরিধি অত্যন্ত ব্যাপকÑ এর পঠন-পাঠনে নতুনত্ব¡, ভাষাতত্ত্ব, জাতিতত্ত্ব, মনস্তÍÍত্ত্ব ইত্যাদি সব কিছুই এসে পড়ে’ (লোক সাহিত্য, ঢাকা, ১৯৬৩ পৃ: ১০১)।
লোকসংস্কৃতি আসলে কোনো জনগোষ্ঠীর সমৃদ্ধ অর্থনীতির দ্যোতক না হলেও সচেতন সমৃদ্ধ মানস অভিব্যক্তির পরিচায়ক। লোকসংস্কৃতির বিভিন্ন দিক যেমনÑ লোকসংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য, লোকগীতি, লোককথা, লোকশিল্প প্রভৃতি যথার্থভাবে অনুধাবন প্রয়োজন। এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত আমাদের দেশে বহু যুগের ঘটনার। আমাদের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎও। লোকসংস্কৃতির শাখা প্রশাখাগুলোর আশ্চর্য আত্মপ্রকাশ ঘটেছে যুগ যুগ ধরে। প্রথাগত শিক্ষা, জাতিগত বৈশিষ্ট্যের অধিকারী না হয়েও সাধারণ মানুষ নীতিবোধ, রুচিবোধ ও শিষ্টাচারের উজ্জ্বল পরিচয় রেখেছেন এসব সংস্কৃতি কর্মে। দারিদ্র্যের হলাহল পান করেও তাদের রসবোধ রয়েছে অক্ষুণœ। আজ অবধি এক প্রসন্ন প্রত্যয় গ্রামবাংলার অজস্র নারী-পুরুষকে উদ্বুদ্ধ করে বিবিধ শিল্পকর্মে। আমাদের গীতিকা, মরমি গীতি, রূপকথা বহির্বিশ্বে সমাদৃত হয়ে এসেছে দীর্ঘদিন ধরে। আমাদের লোকশিল্পের বৈশিষ্ট্যগুলোর সংগ্রহে আন্তরিক আগ্রহ দেখা দিয়েছে ঘরে বাইরে। কাঁথা শিল্পের রেনেসাঁস চলমান। এখন একজন কাঁথাশিল্পী তার কাজের উপযুক্ত সম্মান ও পারিশ্রমিক পাচ্ছেন বলা যায়। অসংখ্য কাঁথা এখন বিদেশে রফতানি হচ্ছে। গ্রামীণ জীবনে এক নতুন অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোপান নির্মাণ করছে এই লোকসংস্কৃতির ধারা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ অনেক আগে এ ব্যাপারে সচেতন হতে আহ্বান জানিয়েছিলেন আমাদের; তিনি বলেছেন, ‘বিজ্ঞান কোনো জিনিষকেই সামান্য বলে উপেক্ষা করে নাÑ
যেখানে দেখিবে ছাই
উড়াইয়া দেখিবে ভাই
পেলেও পাইতে পার অমূল্য রতন
লোকসংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, তার সংরক্ষণের সযতœ প্রয়াস তাই আমাদের অনিবার্য দায়িত্ব। হ