বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, স্বাধীনতার পর থেকে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার মানের ক্রমে অবনতি হয়েছে। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা লাভের প্রধান মাধ্যম হলো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর সাধারণত একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে চার বছরের অনার্স ও এক বছরের মাস্টার্স কোর্স পড়ানো হচ্ছে। এ ছাড়াও কোনো কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল ও পিএইচডি গবেষণার সুযোগ রয়েছে। অন্য দিকে কলেজগুলোতেও চার বছরের অনার্স কোর্স এবং এক বছরের মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। বর্তমানে দেশে প্রায় দুই হাজার কলেজে, ৫০টি সরকারি (পাবলিক) বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১০৫টি বেসরকারি (প্রাইভেট) বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা দেয়া হচ্ছে। এ সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মূলত আন্ডার গ্র্যাজুয়েট এবং মাস্টার্স কোর্স পড়ানো হয়। তবে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিগ্রিও দেয়া হয়। আমাদের উচ্চশিক্ষার মান ও ভূমিকা নিয়ে আলাপ-আলোচনা ও প্রশ্ন মূলত এসব প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
আধুনিক বিশ্বে উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব¡ অনস্বীকার্য। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটেছে। উচ্চশিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে জ্ঞানচর্চা বৃদ্ধি পেয়েছে। জ্ঞানের জগতে বহু নতুন জ্ঞানের সংযোজন হয়েছে; সমৃদ্ধ হয়েছে বিশ্ব-জ্ঞানভাণ্ডার। উন্নত দেশে বিশেষ করে পশ্চিমা দেশে উচ্চশিক্ষার প্রসারের কারণে জ্ঞানের বিস্ফোরণ ঘটেছে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশেও এর ঢেউ লেগেছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার উৎকর্ষতা, উঁচু মান এবং অধুনা সৃষ্ট জ্ঞান-বিজ্ঞান থেকে আমরা বিচ্ছিন্ন থাকতে পারি না। এ যুগ বিশ্বায়নের যুগ। সমগ্র বিশ্বকে একটি বৃহৎ পল্লীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। অতএব, এ বৃহৎ পল্লীর এক অঞ্চলের উন্নয়নের প্রভাব অন্য অঞ্চলে পড়তে বাধ্য। তা ছাড়া জ্ঞানের জগতে কোনো সীমারেখা নেই। জ্ঞান প্রবহমান, এক থেকে বহুর মধ্যে সঞ্চারিত হয়, যদি না কেউ জ্ঞানবিমুখ হয়। আমাদের দেশে সীমিত আকারে উচ্চশিক্ষার প্রচলন বহুকাল আগেই শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত ভারতে ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তন হয়; তারপর থেকেই ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবে পৃথিবীর এ অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটতে থাকে। তদানিন্তন পূর্ব বাংলায় হাতেগোনা মাত্র কয়েকটি কলেজ ছিল, যেখানে উচ্চশিক্ষা দেয়া হতো। এই সীমিত সুযোগ গ্রহণ করেছিল এ অঞ্চলের এক উঠতি মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানরা ছিল পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর। এর কারণ ছিল ঐতিহাসিকভাবে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি তাদের অনীহা ও উচ্চশিক্ষার অত্যন্ত সীমিত সুযোগ। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বঙ্গভঙ্গের কারণে এ অঞ্চলের মুসলমানদের মধ্যেও নতুন আশা-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে প্রভাবশালী হিন্দুদের বাধার মুখে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়। এতে এ অঞ্চলের মুসলিম নেতাদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং তারা উপলব্ধি করেন যে, মুসলমানদের পশ্চাৎপদতার কারণ হলো উচ্চশিক্ষার অভাব। তাই উচ্চশিক্ষার প্রসারকল্পে তারা ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন। স্যার নওয়াব সলিমুল্লাহ, নওয়াব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, এ কে ফজলুল হক প্রমুখ নেতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। এ পটভূমিতে ১৯২১ সালে ঢাকা শহরের রমনার মনোরম পরিবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় এবং সেই বছরের জুলাই মাস থেকে এর শিক্ষাকার্যক্রম শুরু হয়। ফলে এ দেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন মাত্রা যোগ হয়। ১৯৭০ সাল নাগাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে প্রতিষ্ঠিত হয় রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠিত হয় একমাত্র কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ইধহমষধফবংয টহরাবৎংরঃু ড়ভ ঊহমরহববৎরহম ধহফ ঞবপযহড়ষড়মু (ইটঊঞ) এবং এই সময়ের মধ্যে প্রায় প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি কলেজ ও বেশ কিছু বেসরকারি কলেজও প্রতিষ্ঠিত হয়। কলেজগুলো ছিল মূলত ঢাকা, রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত। গত শতাব্দীর ’৩০ থেকে ’৬০-এর দশকের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক জ্ঞানী-গুণীর সমাগম ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় তার মানসম্মত শিক্ষার ও গবেষণাকর্মের জন্য সুখ্যাতি অর্জন করে। বহু গুণী শিক্ষক এই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা কর্মের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, এইচ টার্নার, জিএইচ ল্যাঙ্গালী, হরিদাস ভট্টাচার্য, রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রমুখ। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেন প্রখ্যাত গবেষক ও বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস। বোস আইনস্টাইন তত্ত্বের জন্য তিনি বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হন এবং এর সাথে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম। এ ছাড়া পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগ দেন আরো অনেক কৃতী শিক্ষক। এদের মধ্যে ছিলেনÑ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লøাহ, এস কৃষ্ণা, জ্ঞানচন্দ্র বোস, মোকাররম হোসেন খন্দকার, কাজী মোতাহার হোসেন, আহমদ হাসান দানী প্রমুখ। বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কিছু পিএইচডি ও ডিএসসি ডিগ্রি সম্পন্ন করা হয় এ সময়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে অনেক জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয়।
বলা বাহুল্য, এ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মাধ্যম ছিল ইংরেজি। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের গ্রন্থাগারগুলো ছিল ইংরেজি বইয়ে সমৃদ্ধ। জ্ঞানচর্চার এক উন্নত পরিবেশ বিরাজ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে।
সে সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানের সাথে পৃথিবীর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনা করা যেত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চমানের শিক্ষার প্রভাব প্রতিফলিত হয় অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত এদেশে শিক্ষার মান ছিল সন্তোষজনক। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে শিক্ষার মান আমরা ধরে রাখতে পারিনি; পারেনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্বাধীনতার পর ইংরেজিসহ বাংলা ভাষাকেও উচ্চশিক্ষার মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। এ কথা সত্য যে, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষা দেয়া ছিল তখনকার সময়ের দাবি। তাই এ ধরনের জাতীয় সিদ্ধান্ত তখন গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু এর একটি নেতিবাচক প্রভাবও জ্ঞান আহরণ এবং বিতরণের ক্ষেত্রে লক্ষ করা গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে শিক্ষার মান ক্রমেই অবনতিশীল হয়। নানা কারণে গত ৩০-৪০ বছর ধরে এ দেশের সব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার মান নিম্নমুখী। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক সব স্তরে শিক্ষার মানের অবনতি হয়েছে যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার সব পর্যায়ে একই সূত্রে গাঁথা। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ’৬০-এর দশক পর্যন্ত আমরা এ দেশে উচ্চশিক্ষার যে মান অর্জন করেছিলাম, স্বাধীনতা-উত্তরকালে সে মানের শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছি। ইংরেজি ভাষা শিক্ষার অবহেলার কারণে এবং বাংলা ভাষায় রচিত গ্রন্থের অভাবে আমরা আমাদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নিদারুণ নিম্নমান ডেকে এনেছি।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার মানের অবনতির ফলে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করেছে অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের ইংরেজি শিক্ষার জ্ঞানের অভাব শিক্ষার মানকে নিম্নমুখী করেছে। বাংলা ভাষায় রচিত হয়নি পাঠ্য ও সহায়ক গ্রন্থ; বাংলা ভাষাকেও সমধিক গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এতে অবস্থার আরো অবনতি ঘটেছে। স্বাধীনতার পর যে সব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার প্রত্যাশায় বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে এসেছে তাদের ইংরেজি ভাষার জ্ঞান খুবই সীমিত। কিন্তু উচ্চশিক্ষার প্রায় সব গ্রন্থ (পাঠ্য ও সহায়ক গ্রন্থ), জার্নাল, দলিল-দস্তাবেজ ইংরেজিতে লেখা। অথচ শিক্ষার্থীরা (ছাত্রছাত্রীরা) ইংরেজি ভাষা জ্ঞানের অভাবে এসব বই পড়ে আত্মস্থ করতে পারে না। জ্ঞান আহরণ প্রক্রিয়ায় এভাবে বাধা পড়ে। এর ফলে জ্ঞানার্জন ও জ্ঞান সঞ্চারণের সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। এই বাধা অতিক্রম করা যেত যদি বাংলা ভাষায় অনেক পাঠ্য ও সহায়ক গ্রন্থ রচিত হতো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমরা এ কাজ করতে ব্যর্থ হয়েছি। অর্থাৎ বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ গ্রন্থ আমরা বাংলায় রচনা করতে পারিনি এবং বাংলা ভাষায় অনুবাদও করতে পারিনি। ফলে জ্ঞান আদান-প্রদানের যথেষ্ট সুযোগ আজো সৃষ্টি হয়নি। এ ছাড়াও শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, অস্থিরতা ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রমকে ব্যাহত করেছে। হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ রাখা হয়েছে। সন্ত্রাস, হরতাল ও ধর্মঘটের কারণে নির্ধারিত ছুটির চেয়ে অনির্ধারিত ছুটি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সৃষ্টি হয়েছে নিদারুণ সেশনজটের। অবশ্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আপাতত এ সমস্যা থেকে মুক্ত। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নিম্নমানের শিক্ষক নিয়োগ সৃষ্টি করেছে নতুন সঙ্কট। তা ছাড়া উচ্চশিক্ষার অপরিকল্পিত প্রসারও সৃষ্টি করেছে নতুন সমস্যার। সাম্প্রতিককালে শিক্ষকদের মধ্যে দলাদলি ও প্রশাসনের নগ্ন দলীয়করণ অবস্থার আরো অবনতি ঘটিয়েছে।
নব্বইয়ের দশক থেকে উচ্চশিক্ষার প্রসারকল্পে দেশব্যাপী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অনেক কারিগরি ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং একমাত্র মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়)। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এর নিশ্চয়ই একটি ইতিবাচক দিক আছে। দেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য কারিগরি, কৃষি ও মেডিক্যাল শিক্ষার প্রসার অতীব জরুরি। কিন্তু কৃষি ও কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়েও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। উন্নতমানের কারিগর ও কৃষিবিদ তৈরি করতে হলে যে উন্নতমানের গবেষণাগার; উন্নতমানের যন্ত্রপাতি ও কলাকৌশল দরকার তা বলাই বাহুল্য। একদা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের একজন কৃতী শিক্ষক ও গবেষক আমাকে বলেছিলেন, সে বিভাগের ল্যাবরেটরি কমপক্ষে ৫০ বছরের পুরনো (ড়ঁঃফধঃবফ)। তাই যদি অবস্থা হয়, তাহলে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়Ñ সে কারিগরি কিংবা কৃষি কিংবা সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যাই হোক না কেন, তাদের ল্যাবরেটরির কী হাল হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। উপযুক্ত ও মানসম্মত প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই।
মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান সম্পর্কে আমি তেমন একটা অবহিত নই। তবে প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজগুলোর অবস্থা মোটেই ভালো নয়। অনেক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ছিল। বর্তমান দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব পালনকালে এ সব মেডিক্যাল কলেজের অবস্থা দেখে আমি হতাশ হয়েছি; আমার কাছে মনে হয়েছে বেশ কিছু মেডিক্যাল কলেজে নৈরাজ্যকর অবস্থা বিরাজ করছে। হাসপাতাল ছাড়া কি মেডিক্যাল কলেজ হতে পারে? আর হাসপাতালে হাতেকলমে চিকিৎসার প্রশিক্ষণ ছাড়া কি ডাক্তার হওয়া যায়?
দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রায় সবই ঢাকাতে অবস্থিত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ফলে শিক্ষার্থীদের এক বিরাট অংশ দেশের মধ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেছে। এটি সার্বিক বিবেচনায় দেশের জন্য মঙ্গলকর। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক পরিবেশ ও শিক্ষার মান নিয়েও আলোচনা-সমালোচনার অন্ত নেই। এ কথা ঠিক যে, কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকার্যক্রম ও শিক্ষার মান সন্তোষজনক হলেও, আবার কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের হালচাল মোটেও ভালো নয়। তরুণ শিক্ষকের অভাব না হলেও, প্রবীণ, অভিজ্ঞ ও পূর্ণকালীন শিক্ষকের অভাব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর এক বড় সমস্যা। তা ছাড়া মনোরম পরিবেশে স্থায়ী ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার শর্ত আমার জানামতে মাত্র কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ই পূরণ করতে পেরেছে। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শর্ট কার্ট’ পদ্ধতিতে ডিগ্রি দেয়ার কথাও শোনা যায়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন আছে কিন্তু তার প্রয়োগ আমরা কতটুকু করতে পেরেছি? আজ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় এক শ’র কাছাকাছি। ঢাকা শহরে ভাড়া বাড়িতে দূষিত পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিক্ষার মান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কোয়ালিটি এডুকেশন বলতে যা বুঝায় তা এখানে দু®প্রাপ্য। ভালো শিক্ষক তথা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেধাবী ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন শিক্ষক নেই বললেই চলে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন অভিজ্ঞ ও বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগে অনেক ট্রাস্টি বোর্ডের অনীহা পরিলক্ষিত হয়। কারণ তাদের সম্মানীর হার অপেক্ষাকৃত বেশি। টাকা বাঁচানোর জন্য অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকদের নিয়ে শিক্ষা দেয়া হয়। অতএব মানসম্মত শিক্ষা প্রদান এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে এক দুরূহ ব্যাপার। আমি সারাজীবন বলে এসেছিÑ ভালো শিক্ষক ছাড়া ভালো লেখাপড়া হয় না। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে অন্যতম প্রধান শর্ত হলো প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত, যোগ্যতাসম্পন্ন, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক নিয়োগ ও উন্নত লাইব্রেরি। সর্বোপরি শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সে সব শর্ত আদৌ পূরণ করতে পেরেছে? এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি তা পূরণে আদৌ তোয়াক্কা করে? এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের মানসম্পন্ন শিক্ষা দানের ক্ষেত্রে কোনো মাথাব্যথা আছে? প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি প্রধান সমস্যা হলোÑ ঢাকা শহরে এগুলো ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়েছে। এখানে উচ্চশিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। লেখাপড়ার নামে ফাঁকি ঝুঁকি দিয়ে কোনোরকমে সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে। এ অভিযোগগুলো ভালো করে তদন্ত করার সময় এসেছে। আড়াই দশক আগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনের একজন প্রবক্তা হিসেবে আমি যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, আমার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
তা ছাড়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে (এমনকি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও) দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অধঃস্তন শ্রেণীর শিক্ষালাভের সুযোগ কি অত্যন্ত সীমিত নয়? গাঁয়ের ওই যে রাখাল বালক, তারও মেধা কম ছিল না। কিন্তু আমরা এমন এক সমাজ ব্যবস্থার মধ্যে বাস করি যেখানে সে তরুণ স্কুল-কলেজের দ্বার পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারেনি। আমাদের মতো শ্রেণিবিভক্ত সমাজে গরিব মেধাবী তরুণদের শিক্ষা লাভের সুযোগ প্রদানের বিষয়টি গুরুত্ব¡ সহকারে বিবেচনার দাবি রাখে। সর্বোপরি আমাদের উচ্চশিক্ষা যদি শিক্ষার্থীকে দেশের মাটি ও মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে, আর তার অর্জিত জ্ঞান দেশের জনমানুষের তথা বৃহত্তর সমাজের কল্যাণে ব্যবহৃত না হয়, তাহলে সে শিক্ষা আমার কাছে অর্থহীন বলে মনে হয়। এসব কারণেই বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা আজ নানা সমস্যায় জর্জরিত।
তবে এতে হতাশ হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি মনে করি, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ সব সমস্যা অতিক্রম করা সম্ভবÑ
প্রথমত, উচ্চশিক্ষার মান বৃদ্ধিকল্পে আমাদেরকে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার ওপর গুরুত্ব¡ দিতে হবে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকেই ইংরেজি শিক্ষা চালু করতে হবে। বিভিন্ন শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে বলা হয়েছে, তৃতীয় শ্রেণী থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা বিদেশী ভাষা শিখতে (গ্রহণ করতে) পারে। তাই আমি মনে করি, প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায় থেকে ইংরেজি শিক্ষা দেয়া করলে এবং মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে ইংরেজি ভাষার পঠন-পাঠন ও চর্চা অব্যাহত রাখলে (বৃদ্ধি পেলে) ছাত্র-ছাত্রীরা ইংরেজি ভাষা জ্ঞানে সমৃদ্ধ হবে। অতএব, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইংরেজি পাঠ্যপুস্তক ও সহায়ক গ্রন্থ থেকে জ্ঞান আহরণ সহজতর হবে। পাশাপাশি আমাদেরকে ইংরেজি পাঠ্যবই ও সহায়ক গ্রন্থের অনুবাদ এবং বাংলা ভাষায় বই রচনায় ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, উচ্চ শিক্ষাঙ্গণকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। ছাত্রদের রাজনীতি করার অধিকার আছে কিন্তু শিক্ষাঙ্গনকে সন্ত্রাসী রাজনীতির প্রভাব থেকে মুক্ত রাখতে হবে। অর্থাৎ আমি বলতে চাচ্ছি, জাতীয় বা ছাত্ররাজনীতি কোনোভাবেই শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট করবে না। ছাত্ররা এমন কোনো সহিংস এবং হীন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে না যা শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট ও কলুষিত করে। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে, তারা হীন রাজনৈতিক স্বার্থে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র-ছাত্রীদের ব্যবহার করবে না। যখন তখন রাজনৈতিক কর্মসূচি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে অচল করে দেবে না। তাহলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সন্ত্রাসমুক্ত হবে।
তৃতীয়ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাভাবিক শিক্ষাকার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারলে সেশনজট দূরীভূত হবে। এ ব্যাপারে শিক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে তথা জাতীয় স্বার্থে অতিরিক্ত পরিশ্রম করে সেশনজট দূর করতে হবে।
চতুর্থত, ছাত্রছাত্রী ভর্তির ক্ষেত্রে মেধাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণী নির্বিশেষে মেধাই হবে উচ্চশিক্ষা লাভের মূল শর্ত। কোটা সিস্টেম বা অন্য কোনো কারণে যোগ্যতা শিথিল করা যাবে না। তবে মেধাবী অথচ গরিব শিক্ষার্থীর শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
পঞ্চমত, শিক্ষক নির্বাচনের ক্ষেত্রেও যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাদের অ্যাকাডেমিক অর্জন, গবেষণা কর্ম, নিরলস চর্চা ও একাগ্রতার মূল্যায়ন করতে হবে। এর সাথে উচ্চশিক্ষার মান প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।শিক্ষকতার মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকদের অবশ্যই গবেষণাকর্মে যুক্ত থাকতে হবে। শিক্ষকের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের অবশ্যই নিয়মিতভাবে গবেষণা কাজে লিপ্ত থাকতে হবে। কারণ গবেষণা ব্যতীত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি ও শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়।
ষষ্ঠত, আধুনিক শিক্ষা উপকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে হবে। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্রন্থাগার ও ল্যাবরেটরিগুলোকে যুগোপযোগী, আধুনিক ও সমৃদ্ধ করতে হবে।
সপ্তমত, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের পাঠ্যসূচি (শিক্ষাক্রম) হবে আধুনিক, আন্তর্জাতিক ও সমকালীন। একদিকে যেমন দেশেরও জাতীয় চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করা দরকার, অন্য দিকে আধুনিক, আন্তর্জাতিক বিশ্বজনীন পাঠ্যসূচি বা শিক্ষাক্রমের সাথে সঙ্গতি রেখে সিলেবাস তৈরি করতে হবে। শিক্ষাক্রম এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন শিক্ষার্থীর অর্জিত জ্ঞান মানুষ ও সমাজের কল্যাণে ব্যবহার করা যায়।
অষ্টমত, পাঠ্যসূচি হতে হবে এমন যেন তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত করতে পারে, মাটি ও মানুষের প্রতি মমত্মবোধ সৃষ্টি করতে পারে এবং শিক্ষার্থীকে সৎ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক হলে আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা প্রসারে ও এর মানোন্নয়নের রয়েছে এক অমিত সম্ভাবনা। উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে আমাদের উল্লিøখিত সুপারিশমালা বিবেচনা করা যেতে পারে। যতদিন পর্যন্ত আমরা উচ্চশিক্ষার সুনির্দিষ্ট মান অর্জন করতে না পারি তত দিন দেশের সরকার এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় সামর্থ্য ও সম্পদের সরবরাহ রাখবে এবং সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিকতার সাথে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করবেন। আমি আশা করি, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষাকার্যক্রমের গতিবেগ সৃষ্টি করে এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্ঞান সাধনা এবং জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে আমরা আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষার উচ্চমান অর্জন করতে সক্ষম হবো। হ