বৎসর! বছর! বর্ষ! সব ক’টিই একার্থবোধক শব্দ। অনেক ক্ষণ বা দিনের সমষ্টি এই বৎসর। তিনশত পঁয়ষট্টি দিন কিংবা বারো মাস কিংবা বায়ান্ন সপ্তাহ এর সমষ্টিতে পূর্ণ হয় এক বৎসর। বঙ্গাব্দ বা খ্রিষ্টাব্দ গণনার পরিক্রমা এমনই। তবে হিজরি অব্দ গণনায় এর ব্যত্যয় রয়েছে। উভয় অব্দে সময়ের পার্থক্য প্রায় এগারো দিন। এর পশ্চাতের মূল কারণটিও আমাদের সবার জানা। বঙ্গাব্দ বা খ্রিষ্টাব্দ গণনার সম্পর্ক সূর্যের আবর্তনের সাথে। আর হিজরি অব্দের গণনার সম্পর্ক চন্দ্রের আবর্তনের সাথে। ফলে খ্রিষ্ট বা বঙ্গ অব্দের মাসগুলো হয় ত্রিশ বা একত্রিশ দিনে। আর হিজরি অব্দের মাস হয় ঊনত্রিশ বা ত্রিশ দিনে।
আর খ্রিষ্ট অব্দের সূচনাকাল বিবেচনা করা হয় ঈসা আ:-এর জন্ম বৎসরকে ধরে। আর হিজরি অব্দের সূচনাকাল বিবেচনা করা হয় মহানবী সা:-এর হিজরতকালকে ধরে। এই হিসাব সামনে রেখে আমরা বুঝতে পারি ঈসা আ: পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন আজ থেকে ২০২১ বৎসর আগে। আর মহানবী সা: মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন আজ থেকে ১৪২৮ সৌর বৎসর আগে কিংবা ১৪৪৩ চন্দ্র বৎসর আগে। তবে সময়ের কিয়ৎ কম-বেশি থাকলেও প্রত্যেক অব্দেই মাসের সংখ্যা বারো। বারো মাসে এক বৎসর এটি সৃষ্টিকর্তা কর্তৃক অমোঘ বিধানের অন্তর্ভুক্ত। যদিও বৎসরের প্রথম মাসের নামে ও সময়ে রয়েছে বিভিন্নতা।
হিজরি অব্দের প্রথম মাস মহররম। খ্রিষ্ট অব্দের প্রথম মাস জানুয়ারি। আর বঙ্গ অব্দের প্রথম মাস বৈশাখ। বৎসরের প্রথম মাস মানেই আনন্দের। শিহরণের। অন্য অর্থে তা জাগরণের। কারণ প্রথম মাস অবশ্যই একটি নতুন বৎসরকে আহ্বান করে। আমন্ত্রণ জানায়। অর্থাৎ প্রথম মাস মানেই নতুন বছর। নতুন দিনের শুভাগমন। নতুন বছরের গণনা কার্যক্রম শুরু হয় প্রথম মাস হতে।
বৎসরের প্রথম মাস নিয়ে সমাজে ও সামাজিকতায় উৎসাহের কোনো কমতি নেই। তেমনি এ নিয়ে কবি-সাহিত্যিকদের মাঝেও আগ্রহের কিঞ্চিত উপেক্ষা প্রবণতা দেখা যায় না। বাংলা সাহিত্যে এমন কবি পাওয়া যায় না যিনি কোনো না কোনোভাবে বৈশাখ নিয়ে কবিতা লিখেননি। রবীন্দ্র, নজরুল, ফররুখ, আল-মাহমুদ সবাই বৈশাখ নিয়ে কবিতা লিখেছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো তার ১৪০০ সাল কবিতা দিয়ে গোটা বাংলাকে মাত করে দিয়েছেন। কী চমৎকার করে বলেছেন-
আজি হতে শতবর্ষ পরে
কে তুমি পড়িছ বসি মোর কবিতাখানি
কৌতূহলভরে...
আজি হতে শতবর্ষ পরে।।
বাংলা বৎসর নিয়ে এমন কালজয়ী কবিতা কমই নজরে পড়ে। এ কবিতায় কবিগুরু একসাথে বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং বাংলা বর্ষকে চিরন্তন করার প্রয়াস পেয়েছেন। এই একটি কবিতার মাধ্যমে কবি অন্তত একশত বৎসর অমর থাকতে প্রয়াসি হয়েছেন। কবির আবেদন সত্যিই আবেগময়ী। কবির আবেগে সিক্ত হয় আজকের প্রতিটি পাঠকই-
কত অনুরাগে
একদিন শতবর্ষ আগে।
এখন করিছে গান সে কোন নতুন কবি
তোমাদের ঘরে?
আমার বসন্তগান তোমার বসন্তদিনে
ধ্বনিত হউক ক্ষণিকের তরে
হৃদয়স্পন্দনে তব ভ্রমরগুঞ্জনে নব
পল্লবমর্মরে
আজি হতে শতবর্ষ পরে।
হিজরি অব্দের প্রথম মাস মুহাররম। আরবি-সংস্কৃতিতে নববর্ষের চেতনা, আনন্দ-উল্লাস ইত্যাদি ইসলামী শরিয়ত অনুমোদন করে কি না এ নিয়ে বক্তব্যের দীর্ঘসূত্রতা থাকলেও আরবি সংস্কৃতির লালনক্ষেত্র মিসর এ ক্ষেত্রে তার ঔদার্য প্রদর্শনে এগিয়ে এসেছে। আরও প্রায় এক শতক আগে থেকে তারা হিজরি নববর্ষ উদযাপনে সোৎসাহে এগিয়ে এসেছে। বর্ণিল কর্মসূচি ও অনুমোদিত উচ্ছলতায় তারা হিজরি নববর্ষকে সাদরে বরণ করেছে। নতুন জীবনের প্রেরণা নিতে, জাতিকে নব প্রেষণায় উজ্জীবিত করতে বর্ষবরণ সত্যিই এক উপাদেয় সামাজিক আয়োজন বটে। মিসরের জাতীয় কবি, নীলনদের কবি হাফিজ ইবরাহিম হিজরি নববর্ষ উদযাপন আয়োজন নিয়ে এক অনবদ্য কবিতা রচনা করেন। তাহিয়্যাত আল-আম আল-হিজরি বা হিজরি নববর্ষ স্বাগতম তোমায় শিরোনামের কবিতায় নববর্ষকে, আগতব্য বছরকে আরো আনন্দময় ও কর্মময় করার যে সুবিশাল আহ্বান ও আব্দার জানিয়েছেন আরবি সাহিত্যে আজও তা অনুপ্রেরণার উৎস।
খ্রিষ্ট অব্দের প্রথম মাস জানুয়ারি। সাধারণ্যে এ বর্ষ পরিক্রমা ইংরেজি বর্ষ পরিক্রমা হিসেবেই বেশ পরিচিত। যেন ইংরেজি ভাষা ও জাতির সম্পদ এটি। যদিও বিষয়টি ঠিক তেমন নয়। তবে ইংরেজি ভাষার সম্প্রসারণ ও বিস্তৃতির সাথে সাথে ইংরেজি ক্যালেন্ডারের বিস্তৃতি ঘটেছে বিশ^ব্যাপী। সে কারণেই গোটা দুনিয়ার প্রায় সর্বত্র খ্রিষ্ট অব্দের সাড়ম্বর আয়োজন পরিদৃষ্ট হতে দেখা যায়। নতুন বছরকে ঘিরে নানা কর্মসূচি ও আয়োজন হাতে নেয় এ প্রজন্মের সন্তানেরা। সারাবিশ^ জানুয়ারি মাসকে বরণ করতে কেবল আগ্রহী-ই নয় বরং তটস্থ। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে।
এবারের ২০২২ খ্রিষ্ট অব্দের জানুয়ারি মাস নানা কারণে গুরুত্ববহ ও আনন্দবাহী হয়ে উঠেছে। কারণ ২০২১ খ্রিষ্ট অব্দের পুরোটাজুড়ে এ জাতি পালন করেছে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী। আর ১৬ ডিসেম্বর-এ উদযাপন করেছে স্বাধীনতার গোল্ডেন জুবিলি বা পঞ্চাশ বছর পূর্তি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর মাত্র এক পক্ষ পরেই আমাদের সামনে এসেছে খ্রিষ্টীয় নববর্ষের সওগাত। প্রকৃতই এ আনন্দের এবং মহা আনন্দের।
নববর্ষ মানেই নতুন বছরের শুভ অভ্যুদয়। নতুন উদ্যমের শুভ বারতা। খ্রিষ্টীয় অব্দের জানুয়ারি মাস আমাদের জীবনকে নতুন করে সাজাবার, জাতিকে নতুন করে গড়বার, বিশ^কে নতুন আলোয় ভরিয়ে দেয়ার মহান বারতায় শিহরিত করে। জাগরিত করে। তাই আমরা মনে করি জানুয়ারি মাস নিতান্তই বছরের প্রথম মাস নয়। কেবলই তা নতুন বছরের গণনা শুরুর মাস নয়। বরং জানুয়ারি মাস হলো জীবনকে বদলে দেয়ার মাস। নব প্রেরণা ও উদ্দীপনায় পূর্ণ করে তুলবার মাস। যাবতীয় প্রাচীন ও জীর্ণতা থেকে গাত্র ঝেড়ে উঠবার মাস। কবিগুরুর বৈশাখকে যদি জানুয়ারির সাথে তুলনা করি তাহলে তা জ¦রা, অশুচি থেকে পরিচ্ছন্ন হবার মাস। কবি গুরুর ভাষায়-
মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ¦রা
অগ্নি স্নানে শুচি হোক ধরা।।
খ্রিষ্ট অব্দের জানুয়ারি মাস যদি কবি ফররুখের বৈশাখের সাথে প্রতিতুল্য হয় তবে তা পরিবর্তনের মাস। বিপ্লবের মাস। অন্যায় অবদমন করে ন্যায়কে প্রতিস্থাপনের মাস। শীতের বাতাবরণে আগমন করা জানুয়ারি তাই শীতের ভয়কে জয় করার মাস। আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যক্ষভাবে বিশ^াস করি- নতুন মানেই পুরাতনের অপসারণ। নতুন মানেই জীর্ণতার অবসায়ন। অন্য অর্থে যা ব্যবহৃত হয়ে জীর্ণ হয়েছে, সেকেলে হয়েছে, ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়েছে তদস্থলে নতুনের অধিষ্ঠান নিশ্চিত করণই হচ্ছে নতুনত্বের মূল কথা। নতুন বছর আমাদেরকে সে আহ্বানেরই হাতছানি দেয়। বিগত দিনের তথা বছরের ভ্রান্তি, ভেদাভেদ, বিদ্বেষ সরিয়ে তদস্থলে শান্তি ও অহিংসকে জায়গা করিয়ে দেয়ার উদার আহ্বান জানায়।
তাই নতুন বছরকে আমরা কেবলই পোশাকি আয়োজন, প্রদর্শনেচ্ছা মনস্ক কর্মসূচি, রঙিন র্যালি, তাৎক্ষণিক বিনোদনদায়ী বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক মহড়া, দীর্ঘ কলেবরের ফ্যাশনেবল ও চাকচিক্যশোভিত দৃষ্টিনন্দন কসরত, কুচকাওয়াজ কিংবা প্রচারাভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। আমরা এটিকে ছড়িয়ে দিতে চাই প্রাণ-হতে প্রাণান্তরে, বিশ^ মানবতার অন্তরে অন্তরে। লোক দেখানো, চোখ ধাঁধানো আয়োজনই মাত্র নয়- প্রতিটি আয়োজন করতে চাই প্রাণবন্ত, প্রাণোচ্ছল এবং সঞ্জীবিত। কোনো মৃত, অর্ধমৃত সংস্কৃতি নয় জাগ্রত করতে চাই জীবন্ত সংস্কৃতির। পরিপূর্ণ সংস্কৃতির।
তাই প্রত্যাশা করি জানুয়ারি আসুক আমাদের মাঝে বিপ্লবের বার্তা নিয়ে। মিথ্যার ফানুসকে দূর করে সত্যের আহ্বান নিয়ে। জানুয়ারি আসুক ঝঞ্ঝা হয়ে পুঞ্জীভূত সব দুরাশা, ভ্রান্তি, ক্লেদ, ক্লেশকে উৎপাটিত করতে। জানুয়ারি আসুক নির্মাতা হয়ে সমাজকে নতুন করে গড়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে। জানুয়ারি আসুক বুনন শীল্পির মতো- আমাদের এই অনাবিল সৌন্দর্যে ভরা পৃথিবীর প্রান্তে-প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা সত্য ও শুভকে এক সুতোয় মালা গেঁথে দেবার সাহসী প্রত্যয়ে।
নববর্ষ তো নববর্ষই। তা যে অব্দেরই হোক। বঙ্গাব্দ কিংবা খ্রিষ্টাব্দ। কিংবা হিজরি অব্দ। প্রতিটি নববর্ষই আমাদেরকে উদ্দীপিত করুক নবচেতনায়। নবভাবনায়। কবি ফররুখের বৈশাখ চেতনায়- সূচিত হোক ২০২২-এর জানুয়ারিও। বছরের প্রথম মাসকে তাই চির সংগ্রামী, দুর্নিবার, অন্যায়ের প্রতিরোধে অদম্য ঘোষণা করতে চান। সত্যের উদ্বোধনে তিনি এতটুকু দেরি করতে চান না। তাই কবির উদাত্ত আহ্বান-
মৃত্যু-ঘন অন্ধকারে জ¦ালায়ে বিদ্যুৎ-ক্ষীণ দীপ্ত জুলফিকার
নববর্ষ শুরু হয়, নতুন বৎসর আসে সংগ্রামের পথে দুর্নিবার,
সৃষ্টি ও ধ্বংসের মাঝে, শ্রম সাধনার পথে অপূর্ব উল্লাসে
খোশ আমদেদ ধ্বনি সকল দিগন্ত হতে আজ ভেসে আসে,
ব্যর্থতার যত গ্লানি মিশে যায় দূরান্তরে পলাতক বলাকার ঝাঁক,
তাই আমরাও জানুয়ারিকে ভাবি বৈশাখের মতোই প্রমত্ত, উদ্দীপ্ত, দৃপ্ত, অসাধ্য-সাধন-পটিয়সি। নববর্ষের এই ক্ষণে আমাদেরও একান্ত আবেদন-
ঘুচে যাক যুদ্ধের তৃষা
মুক্তি পাক রক্তের নেশা
গাঢ় হোক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি
সন্বিষ্ট হোক সাম্য-ঐক্য-মৈত্রী
লয় হোক, শূন্য হোক আছে যত আড়ি!!
তোমারই আগমনে, শুভাগমনে ২০২২-এর জানুয়ারি!!
২০২২ সালের জানুয়ারি মাসের এই শুভ প্রত্যুষে বিশে^র নির্যাতিত, অনির্যাতিত, নিষ্পেষিত, অনিষ্পেষিত, শিশু-কিশোর-যুবক-পৌঢ়-বৃদ্ধ, বেকার কর্মজীবী, দুঃখী কিংবা সুখি সব মানুষের জন্যই কেবলই সুখ কামনা। নববর্ষের আশীর্বাদ ও উন্নয়ন প্রেষণায় উজ্জীবিত হোক মানবসমাজের প্রতিটি সভ্য। কল্যাণ আর মঙ্গলে পূর্ণ হোক পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চল, সময়ের প্রতিটি প্রহর সে প্রত্যাশায়।