খুবসকালে ঘুম ভেঙে যায় মেরিনার। তারপর ঘুম আসে না দু’চোখে। শত চেষ্টা করেও সফল হয় না। শুধু চোখ বুঝে ঘুমের ভান করে থাকে।
এখন সে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। সকাল ৭টার মধ্যে স্কুলে পৌঁছতে হয় তা নাহলে স্কুল গেট বন্ধ হয়ে যায়। সময় মতো স্কুলে না পৌঁছতে পারলে ক্লাসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ১০ মিনিট। তখন সবার চোখ থাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীর প্রতি। লজ্জায় চোখের পানি এসে পড়ে।
কয়েক মাস হলো বিদ্যালয় বন্ধ। খাট থেকে নেমে পড়ে সে। দেখে অন্য রুমে বাবা-মা আর ছোট ভাই ঘুমিয়ে আছে। ছোট ভাই মাহিম এখনো ঘুমে। জেগে থাকলে নিজে নিজে তা, পা দু’দিকে ছুড়ে ছাদের দিকে তাকিয়ে অ অ শব্দ করে খেলা করতে থাকে। তখন মেরিনার খুব ভালো লাগে। মাহিমকে ভাইয়া বলে ডাকলে তার দিকে তাকায় না। তখন মেরিনা মায়ের কাছে নালিশ করে ভায়ের বিরুদ্ধে। মা তার নালিশ শোনে কিছু বলে না।
বারান্দার জানালা কাছে এসে দাঁড়ায় মেরিনা। সূর্যের আলো এখনো ভালোভাবে ফুটে ওঠেনি। হালকা বাতাস গায়ে এসে লাগে। জানালার কাছ থেকে বাইরে যাওয়ার দরজার কাছে চলে আসে সে। সিটকারিতে হাত দিতে ছোট একটা শব্দ করে দরজা খুলে যায়। গোলাপি রঙের চপ্পল পায়ে দিয়ে দু’তলা থেকে নিচে নেমে আসে। দেখে গেটে কোনো লোক নেই। অন্য সময় হলে একজন বুড়ো চাচা থাকেন। তাকে দেখে একটা হাসি দিয়ে বলে, দাদু তুমি কেমন আছ, মনটা ভালো তো? হাসলে তার মুখের ভেতরে ফাঁকা কালো রঙের দাঁতগুলো চোখে পড়ে। তার দাঁতগুলো এমন কেন জানতে পারে পান খাওয়ার জন্য এমন অবস্থা। তাকে কোথাও দেখতে পেল না। গেটের দরজা হালকা ফাঁকা ছিল মেরিনা ডান দিকে একটু থাক্কা দিতে আরেক টু ফাঁকা হয়ে গেল। সে রাস্তা চলে আসে। একেবারে ফাঁকা। একটু ভয় লাগছে। তার পরও সামনে হাঁটতে থাকে।
বড় রাস্তা একদম ফাঁকা। মাঝে মধ্যে দু-একটা গাড়ি শোঁ শোঁ করে চলে যায় পাখির মতো করে। রাস্তার মোড়ে কিছু পুলিশ বসে আছে তারা কেউ গল্প করছে আবার কেউ মোবাইল টিপছে।
সামনের দিকে হাঁটতে থাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করে না। আবার অনেকে তার দিকে তাকায় কিছু বলে না। মেরিনা মুখে মাস্ক পরে আছে। টিভিতে বারবার বলছে, ঘর থেকে বের হলে অবশ্যই মুখে মাস্ক পরবেন।
আনমনাভাবে তার স্কুলের রাস্তায় হাঁটা ধরেছে। বাসা থেকে স্কুলে যেতে রিকশায় লাগে ১০-১৫ মিনিট। সরু রাস্তায় একটু জ্যাম থাকে। তখন গাড়ির হর্ন আর রিকশার বেলের শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে সে দু’হাত দিয়ে দু’কান চেপে ধরেন বাবার পাশে বসে। সরু রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় চলে আসে তখন স্কুলে পৌঁছতে বেশি সময় লাগে না। বড় রাস্তা ধরে গাড়িগুলো শোঁ শোঁ শব্দে চলে যায় দু’পাশ দিয়ে। আজ সে রকম কোনো দৃশ্য চোখ পড়ে না। হাঁটতে হাঁটতে বিশাল কৃষ্ণচূড়া গাছটার কাছাকাছি চলে আসে। কৃষ্ণচূড়া গাছটা স্কুলের ঠিক মেইন গেটের সাথে। সূর্যের আলো কখনো পড়ে না গাছটার নিচে। গরমকালে বেশ ভালো লাগে শীতল থাকে সব সময় জায়গাটা। একটু সমস্যা হয় শীতকালে তখন অনেক ঠাণ্ডা থাকে গাছটার নিচে।
মেরিনা স্কুল গেটের কাছে এসে দাঁড়ায়। বড় লোহার গেট চোখে পড়ে। কেমন যেন অচেনা লাগে এ গেটটি। তার মনে হয় শেওলা জমে গেছে গেটার উপর। অপরিচ্ছন্ন গেট ধরে দাঁড়ায় সে। দেখার চেষ্টা করে রুমগুলো। গেটের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় বিল্ডিংগুলো ঠাঁয় নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রুমগুলো দেখে মনে হয় সৌন্দর্য হারিয়ে বিশ্রিভাবে দাঁড়িয়ে আছে। স্কুল মাঠে ঘাসও জন্মেছে। গাছের পাতা পড়ে জমে আছে অনেক জায়গায়। আজ স্কুলের সব কিছু তার কাছে অচেনা লাগছে। মনে হয় জীবনের সুন্দর আর জাগতিক সুন্দর সব বিলীন হয়ে গেছে কোনো এক অদৃশ্য শত্রুর আগমনে।
মেরিনার চোখে পড়ে গেটের এক কোণে বড় করে সাইনবোর্ড লেখা রয়েছে ‘স্কুল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ’।
কথাটা পড়ে মেরিনার ভীষণ কান্না পায়।