একদা এক বনে বাঘ আর সিংহের মধ্যে ছিল গভীর বন্ধুত্ব। শক্তিতে দু’জন সমান। তারা মিলেমিশে বন শাসন করত। যেন এক রাজ্যে দুই রাজা। বনে ছিল সুখ শান্তি। কিন্তু এই শান্তি বেশি দিন টিকল না। পাশের বনে ছিল খাদ্যের অভাব। তাই তারা বুদ্ধি খুঁজল কিভাবে এই বনের খাবার লুট করা যায়। তারা কৌশল করল। তারা বাঘ সিংহের বন্ধুত্ব নষ্ট করতে বাঘের কাছে এক সুন্দরী বাঘিনী পাঠাল। কারণ বাঘ সিংহের ঐক্যের শক্তিকে সবাই ভয় করত। কেউ এ বনে এসে শিকার করার সাহস পেত না। বাঘ সিংহের ঐক্যের শক্তির কাছে সবাই ছিল পরাজিত। তাই পাশের বন থেকে এই বাঘিনী এলো বাঘের কাছে। সে বাঘকে প্রেম নিবেদন করল। বাঘ খুশি, পাশের বনের রাজকুমারী বাঘিনী। বাঘ বাঘিনীর বিয়ে হলো মহা ধুমধামে। বাঘের বিয়েতে সিংহও মহাখুশি।
কিছু দিন না যেতেই বাঘিনী বাঘকে বনের অর্ধেক রাজা বলে অবজ্ঞা করতে শুরু করল। অর্ধেক রাজা কথাটি শুনতে বাঘের ভালো লাগত না। দিনে দিনে তার মনে লোভ দানা বাঁধতে শুরু করে। অর্ধেক রাজা নয়। সে পুরো রাজত্ব চায়। কিন্তু সিংহের কী হবে? সে তার প্রাণের বন্ধু, তাছাড়া সে শক্তিশালীও। বাঘিনী সিংহকে বধের পরামর্শ দিলো। বলল, সিংহ মরে গেলে তুমি হবে বনের একমাত্র রাজা। বাঘ পড়ল চিন্তায়, তার মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু মহারাজ হওয়ার চিন্তা তাকে অস্থির করে তুলল। অবশেষে অতিলোভে বাঘের নৈতিক পরাজয় হলো। বাঘ একটি ভোজের আয়োজন করল। বন্ধুর নিমন্ত্রণ পেয়ে সিংহ তো ভারি খুশি। বাঘ কিভাবে বন্ধু সিংহকে বধ করবে সে চিন্তায় মগ্ন। সাহায্য করল বাঘিনী। বিষাক্ত ভোজে শেষ হলো রাজা সিংহের জীবন। বাঘ হলো বনের একমাত্র রাজা। বাঘের শাসনকালে শুরু হলো অস্থিরতা। জীবনের নিরাপত্তা বলে কিছুই রইল না। বাঘ বাহিনী যাকে সামনে পায় তাকেই চিবিয়ে খায়। শত্রুদের পদচারণায় ভারী হলো বন।
সমস্যা সমাধানে শিয়ালের বাসায় বসল গোপন সভা। স্বার্থপর, অত্যাচারী বাঘকে করতে হবে ক্ষমতাচ্যুত। এভাবে চললে একে একে বাঘের পেটে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই। খরগোশ বলল তার কাছে সমাধান আছে। এই বাঘের দলকে তাড়াতে হবে। কিন্তু কিভাবে? সবাই চিন্তায় পড়ল। কাঠবিড়ালি বসে ছিল এক কোণে। সে বলল একটা প্রস্তাব আছে। তবে কাজ হবে কিনা জানি না। শিয়াল বলল, বলেই দেখো। কাজে লাগতেও পারে। কাঠবিড়ালি বলল, এত শক্তিধর বাঘদের শায়েস্তা করা আমাদের মতো পুঁচকেদের কাজ নয়। তারা ক্ষমতাশালী রাজা ও রাজার সৈন্য। কৌশলে তাদের তাড়াতে হবে। বানর বিরক্ত হয়ে বলল, ওহ ভূমিকা ছাড়। কাজের কথায় আসো। কাঠবিড়ালি বলল, মহামারী। বাঘেদের মধ্যে মহামারী ছড়াতে হবে। সবাই হো হো করে হেসে উঠল। মহামারী কী হাতের মোয়া চাইলেই কারো মধ্যে ছড়ানো যাবে। নাকি তুমি তার ক্ষমতা রাখো। টিটকারি করল সবাই। কাঠবিড়ালি মন খারাপ করল না। বলল, তোমরা আমাকে কথাই বলতে দিচ্ছ না। শিয়াল থামাল সবাইকে। থামো সবে, প্রস্তাব ভালো উপায়ও তার জানা আছে নিশ্চয়ই।
কাঠবিড়ালি বলল, মহামারী ছড়ানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। কিন্তু গুজব ছড়ানোর ক্ষমতা আছে। সভার সবাই এবার মনোযোগ দিলো কথায়। কাঠবিড়ালি বলল, আমরা সবাই মিলে বনে গুজব ছড়াব যে, বাঘেদের এক অসুখ এসেছে। যে অসুখে ধরলে নিশ্চিত মৃত্যু। এটা ছোঁয়াচে, একজন থেকে অন্যজনে ছড়াবে। সভার কেউ কেউ হো হো করে হেসে উঠল।
বানর টিটকারি করে বলল, কাঠবিড়ালি ভায়া, তুমি বলবে আর ওরা সেটা বিশ্বাস করবে। হাসালে তুমি বড্ড হাসালে। বাঘেরা কি এতই গাধা একটা অসুখের কথা শুনে রাজত্ব ছেড়ে পালাবে। কাঠবিড়ালি নিজেও এবার সুযোগ নিলো। বলল, তোমাদের মাথায় বুদ্ধি এত কম দেখলে বুঝাই যায় না। কাঠবিড়ালির এমন কথায় সবার মুখ গম্ভীর হয়।
কাঠবিড়ালি বলল, আমরা গুজব ছড়ানোর সাথে সাথে কিছু কাজও করব। ইঁদুর ভাইয়েরা রাতের আঁধারে কিছু বাঘের গোঁফ ও ঘাড়ের লোম কেটে দিবে। এতেই হবে কাজ, আমরা সবাই মিলে প্রচার করব মহামারীর কথা। তারা যখন এটা শুনবে এবং কারো কারো গোঁফ লোম খোয়া যাবে তখন আর বিশ্বাস না করেই পারবে না।
শিয়াল বলল, বাহ দারুণ বুদ্ধি। কাজ হবে কিনা জানি না তবে চেষ্টা করতে পারি। বানর বলল, সত্যিই তোমার ছোট্ট মাথায় অনেক বুদ্ধি। কাজ হলে কাঠবিড়ালির জন্য সিংহের মন্ত্রিসভায় পদ নির্ধারিত। তবে ইঁদুররা কি পারবে? ইঁদুর বলল, সবার ভালোর জন্য এই ঝুঁকি আমরা নিতেই পারি। শিয়ালের সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্তই গৃহীত হলো। সেদিন রাতেই ইঁদুররা তাদের প্রথম কাজ করল। সকালে বাঘেদের কেউ কেউ দেখল তাদের গোঁফ নেই, ঘাড়ের লোম নেই। শুরু হলো উত্তেজনা। বনের পশুপাখিরা সুযোগ নিলো। সবাই মিলে প্রচার শুরু করল বাঘেদের নতুন মহামারীর কথা। শিয়ালতো বনের রাজা বাঘের কাছে গিয়ে বলল, জাঁহাপনা এটা এক মহামারী। এই রোগ একবার ধরলে আর নিস্তার নেই। এটা বড্ড ছোঁয়াচে, একজন থেকে অন্য জনে ছড়ায়।
বাঘ বলল, তবেতো বনের সবাই বিপদে। কী করা যায় বলো তো শিয়াল। শিয়াল বলল, জাঁহাপনা, এই রোগ শুধুই বাঘেদের হয়। অন্য কারো নয়।
বাঘেদের চোখে ঘুম নেই। সদা মৃত্যুর ভয়। প্রতিদিনই কারো গোঁফ কারো লোম গায়েব হচ্ছে। এভাবে দু-তিন দিন যাওয়ার পর দেখা গেলে অনেকেরই গোঁফ নেই। তখন সুস্থ বাঘেরা রাতের আঁধারে বন ছেড়ে পালাল। বাঁচার ইচ্ছায় লোম হারানো বাঘেরাও পালাল যে যেদিকে পারে। তিন চার দিনের মাথায় বনে না আছে মহারাজ বাঘ, না তার শক্তিশালী বাহিনী। অনেক দিন পর বনে আবার শান্তি ফিরে এলো।