মাত্র কিছুদিন আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাফতরিক চিঠিপত্রে বাংলা বানানে অবহেলা লক্ষ করা গেছে। বিষয়টি দৈনিক খবরের কাগজেও প্রকাশিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাদদেশে ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষার প্রতি এত উদাসিনতা এলো কিভাবে? দেখা যাচ্ছে, খবরটি জনমনে শঙ্কা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা লক্ষ করা গেছে, ব্যাপারটি আবার এমনো নয়। বাংলা ভাষার প্রতি অবহেলা দেখা গেছে রাষ্ট্রের সব দফতরে। ব্যবসায়-বাণিজ্যে। পথে-ঘাটে সাইনবোর্ডে। সর্বত্র। কেন এমন হলো? কেন এমন হচ্ছে? ভাষা নিয়ে কৌতূহলী মানুষ এ সব জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজে ফিরছে অবিরত।
পৃথিবীর সব ভাষারই পরিবর্তন হয়। বাংলা ভাষারও পরিবর্তন হয়েছে, প্রতিনিয়ত হচ্ছে। এমন যুক্তিও অনেকের কাছে রয়েছে। এই যুক্তিতে অনেকে মনে করছে, বাংলা বানান শুদ্ধ কী অশুদ্ধ এ নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। চর্যাপদে যে শব্দের বানান যেভাবে লেখা আছে, এখন সে শব্দও একই রূপে নেই; সে বানানও নেই। শব্দরূপের পরিবর্তন হয়েছে। এখন যে শব্দ যে বানানে লেখা হচ্ছে সেটিও কিছুদিন পর এরূপ থাকবে না; রূপ পাল্টাবে। কেবল ভাষা নয়; পরিবর্তন হয় সবকিছু। অতএব, বাংলা বানানের শুদ্ধ-অশুদ্ধ রূপ নিয়ে মাথা না খাটালেও চলবে। এসব যুক্তিও আজকাল শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে ব্যবসায়-বাণিজ্য ও তথ্যপ্রযুক্তির অঙ্গনে এসব কথার আড়ালে বাংলা ভাষা লজ্জায় মুখ লুকাতে চাচ্ছে।
বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদ। চর্যাপদের বাক্য ও শব্দের সাথে বর্তমান বাংলা শব্দের মিল নেই, এ কথা সত্য। এই সত্যে অবিচল থাকলে বাংলা ভাষার ভেতর যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে সে বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে না। অনেক পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে বাংলা ভাষা এখন প্রমিত রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে। প্রমিত বাংলা কতদিন চলবে কে জানে। তবে বেশি দিন চলতে না পারলে বাঙালি জাতি ও বাংলা ভাষার কপাল পুড়তে পারে।
একটি ভাষার বেঁচে থাকা মরে যাওয়া নির্ভর করে সে ভাষায় কথা বলার ওপরে। যত বেশি মানুষ যে ভাষায় কথা বলবে, সে ভাষা তত বড় ভাষা হিসেবে পরিচিতি পাবে। ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ঠিক রেখে মানুষ যতদিন সে ভাষায় কথা বলবে; লিখবে; ততদিনই সে ভাষা টিকে থাকবে। এখন ভাবতে হবে, ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ধরে রাখার দায়িত্ব কার? কে ঠিক করে দেবে ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা? প্রথমত এ দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তারপর জাতীয়তাবোধের দায়িত্বে নিয়োজিত থাকা সংগঠনের। এ সব সংগঠনকে রাষ্ট্র উৎসাহিত করবে, নিয়ন্ত্রণ করবে। রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে ভাষার অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাও নষ্ট হতে থাকবে। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে সেটাই হচ্ছে। বাংলা ভাষার শৃঙ্খলা ধরে রাখার স্বার্থে রাষ্ট্রের জোরালো কার্যক্রম লক্ষ করা যাচ্ছে না। মূলত রাষ্ট্র তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হওয়ার কারণও রয়েছে। রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তাদের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও দেশপ্রেম কমে গেছে। দেশপ্রেম, ভাষাপ্রেম ও জাতীয়তাবোধ যে কমে গেছে তা বোঝা যাবে কিভাবে? এটি বোঝা খুব সহজ। যেমনÑ দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবোধে অনাগ্রহ থাকলে জাতীয় সম্পদ সংরক্ষণ ও রক্ষার মোহ কমতে থাকবে। বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই মোহ এখন যৎসামান্য। দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করা, মোহ কমে যাওয়ার উদাহরণ হতে পারে। উদাহরণ হতে পারে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অব্যাহতির পর বিদেশে স্থায়ী বসবাস করতে থাকা। দেশের আমলাদের বেশির ভাগেরই চিন্তা থাকে, চাকরি-বাকরি শেষ করে বিদেশের মাটিতে স্থায়ী আবাস গড়ে তোলা। এমপি, মন্ত্রীরা বারবার এমপি-মন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন ছাড়তে চান না। এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারা দেশে থাকছেন ঠিকই কিন্তু তাদের আহল-পরিজনকে বিদেশে রাখতে স্বস্তিবোধ করেন। অন্য দিকে জনসাধারণ বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ন্ত্রক পুঁজিবাদের খপ্পরে পড়ে ঈমান-আমল আখলাক চরিত্র সব হারিয়ে ব্যক্তিস্বার্থের পরিমণ্ডলে ঘুরপাক খাচ্ছেন। ফলে জাতীয়তাবাদের চেতনা নিভে যেতে বসেছে। আর এসব কারণে দেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, ভাষাপ্রেমের মতো জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকার মতো মানুষও কমে গেছে।
দেশের স্বার্থ, জাতীয়তাবোধ, ভাষাপ্রেম নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়ার কথা ছিল বিত্তশালী, আমলা, এমপি-মন্ত্রীদের। দুর্ভাগ্য, আমাদের দেশে সেটা হয়নি সে কথা আগেও উল্লেখ করেছি। বিশেষ করে বাংলা ভাষার ব্যাপারে তাদের উদাসীনতা আরো পরিষ্কার। বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ পরিচ্ছন্ন হোক এ নিয়ে যত চিন্তাভাবনা তা সবই মধ্যবিত্ত ও লেখক-গায়ক-কবি-সাহিত্যিকদের আসরে দেখা গেছে। নিম্নবিত্ত বা খেটে খাওয়া মানুষদেরও এ বিষয়ে তৎপর হতে দেখা যায়নি। এ ধারা আজ নতুন নয়। চর্যাপদের আগ থেকেই প্রভাবশালী বাঙালিদের মধ্যে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদাসীনতা দেখা গেছে। এরপরও বাংলা বাংলা ভাষা টিকে ছিল প্রাকৃতজনদের কারণে। এই প্রাকৃতজনরা স্বজ্ঞানে হোক বা অজ্ঞানেই হোক বাংলা ভাষাকে লালন করেছে।
ফেব্রুয়ারি মাস এলে যত কথাই বলা হোক কিন্তু এ কথা কেউই বলতে চাচ্ছে না যে, বাংলা ভাষাকে টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে প্রভাবশালী বাঙালিদের অবদান নেই বললেই চলে। ইতিহাস খুঁজলে এ কথার অন্যথা হতে পারে না। ভাষা গবেষকরা মনে করেন, বাংলা ভাষার জন্ম হয়েছিল প্রাকৃত থেকে। প্রাকৃত ছিল মাঠেঘাটে কলকারখানায় ঘাম ঝরানো পরিশ্রমী মানুষের মুখের ভাষা। প্রাচীন আর্য যুগে অভিজাতদের সমাজে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চা করা ছিল অপরাধ। বিশেষ করে সেন শাসনের সময় বাংলা ভাষা ছিল উপেক্ষিত। বঙ্গে সেনরা আগমন করলে বাংলা ভাষাকে অচ্ছুতদের ভাষা হিসেবে পরিত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। সেনরা প্রচার করতে ধাকে, সংস্কৃত ব্যতীত বাংলা ভাষায় যারা সাহিত্যচর্চা করবে তারা ‘রৌরব’ নামক নরকে যাবে। সুতরাং সংস্কৃতবাদী প্রভাবশালী বাঙালি বাংলা ভাষার কদর করতে পারেনি। সুলতানি শাসনের সময়ও প্রভাবশালীদের ভাষা ছিল আররি-ফারসি।
সুলতানি আমলে সুলতানরা কমবেশি বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করলেও রাজদরবারের ভাষা ছিল আরবি-ফারসি। বাঙালি সমাজে প্রভাব বিস্তারকারী পরিবার, রাজদরবারে উচ্চমর্যাদা পাওয়ার আশায় বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে আরবি-ফারসি ভাষার তোয়াজ করেছে। এ সময়ও নি¤œ শ্রেণীর জনগণ কথা বলেছে বাংলা ভাষাতে; তারা ফারসি শেখার চেষ্টা করেনি। অভিজাতরা আরবি-ফারসি বর্জন করতে পারেনি স্বার্থের কারণে। মুঘল রাজত্বের সময়ও ফারসিকে রাষ্ট্রভাষা করা হয়েছিল। অভিজাত বাঙালিরা তখন মুঘল নিয়ন্ত্রিত রাজদরবারে উচ্চ মাইনের চাকরির জন্য ফারসি ভাষাটা আয়ত্ত করেছিল। কিন্তু এ সময়ও বঙ্গের প্রাকৃতজনরা বাংলা ভাষা বদলাতে চেষ্টা করেনি। এসব মানুষ অন্য কোনো ভাষা শিখতে না পেরেই বাংলা ভাষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। অভিজাতদের মতো যদি তাদেরও অর্থসম্পদ ও শিক্ষা-দীক্ষা-জ্ঞান-বুদ্ধি এবং রাজনীতির চর্চা থাকত, তাহলে তারাও হয়তো বাংলা ভাষাকে অভিজাতদের মতো করে জ্ঞান করতে পারত। পলাশী বিজয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকার ভারতবর্ষের অধিবাসীদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারকে তাদের দায়িত্ব মনে করতে না পারলেও ইংরেজি ভাষা শিক্ষা দেয়ার প্রচেষ্টাকে তারা অব্যাহত রাখতে পেরেছে। উপমহাদেশে শ্রীরামপুর মিশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হতে থাকে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলোÑ রাজা রামমোহন রায়ও ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব বাতিল চেয়ে গভর্নর বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন। ১৮৩৫ সালে লর্ড মেকলে ইংরেজি শিক্ষাসংক্রান্ত নথিপত্র তৈরি করে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিকের অনুমোদন করিয়ে নেন। ‘দ্য ফ্রিডম অব প্রেস অ্যাক্ট-১৮৩৫’ আইন তৈরি করে ইংরেজি ভাষায় বই মুদ্রণ, প্রকাশনা ও প্রাপ্যতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে এ জন্য যে, এতে ইংরেজি ভাষা প্রসার লাভ করতে পারবে। কয়েক বছর পর সরকারি কাগজপত্রের ভাষা হিসেবে ফারসি ভাষাকে বিলুপ্ত করা হলো এবং এর স্থলে ইংরেজি ভাষা জায়গা করে নিলো। ১৮৪৪ সালে ১০ অক্টোবর লর্ড হার্ডিঞ্জ ঘোষণা করলেন, সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে ইংরেজি ভাষার জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে। এ ঘোষণা ভারতবর্ষে ইংরেজি ভাষার চাহিদাকে বেগবান করে তুলল এবং অভিজাত হিন্দুরা ইংরেজি ভাষা শেখার জন্য লাইন দিতে থাকল। প্যারীচাঁদ মিত্রের লেখা ‘আলালের ঘরের দুলাল’ উপন্যাসটি পড়লে অভিজাত শ্রেণীর সামাজিক পরিবর্তনটা সহজে আঁচ করা যায়। দেশ ভাগের পর পাকিস্তান সৃষ্টি হলে এবার উর্দু ভাষার কদর বাড়তে থাকল এবং অভিজাতদের মধ্যে একটি অংশ উর্দু ভাষা শেখার জন্য তৎপর হয়ে পড়ল। অবশ্য উর্দু শেখাটা বেশি দিন স্থায়ী হতে পারেনি। এভাবেই এদেশে অভিজাত দাবি করা শিক্ষিত প্রভাবশালী বাঙালিরা সম্মান ও মর্যাদার প্রেমে পড়ে বাংলাপ্রীতিটা সময়ের ব্যবধানে বারবার বদল করে নিয়েছে। এসব বিচারে বলা যায়, বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনটা ছিল নিছক রাজনৈতিক। এই আন্দোলনের মধ্যেই অভিজাতরা স্বপ্ন দেখেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। বাংলা ভাষাকে আন্দোলনের জুজুবুড়ি বানিয়ে দেশ স্বাধীন হলো ঠিকই কিন্তু অভিজাতরা সেই বাংলা ভাষাকে পাশ কাটিয়ে যেতে খুব বেশি সময় আর নেয়নি। অল্প দিনের মধ্যেই শ্রীরামপুর মিশনের আদলে দেশে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার স্কুল স্থাপন করা হলো অভিজাতদের ছেলেমেয়েদের জন্য। এখন রাষ্ট্র ও অভিজাত মিলেমিশে একাকার হয়ে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে নিজেদের সম্ভ্রম রক্ষা করে যাচ্ছে আর ফেব্রুয়ারি এলে বাংলা ভাষার জন্য সম্বিত ফিরে পাচ্ছে । হ
মাত্র কিছুদিন আগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দাফতরিক চিঠিপত্রে বাংলা বানানে অবহেলা লক্ষ করা গেছে। বিষয়টি দৈনিক খবরের কাগজেও প্রকাশিত হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাদদেশে ভাষা...
