সরকারের হিসাবে দেশে দুই কোটি কিডনি রোগী আছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র ডায়ালাইসিস যোগ্য কিডনি রোগী আছে ১৬ লাখ। তার মধ্যে ৪০ হাজার মারা যায় প্রতি বছর। প্রতিদিন প্রায় ১১০ জন, প্রতি ঘণ্টায় চার-পাঁচজন। এর মধ্যে আমরা মাত্র ১০% লোককে আমরা ডায়ালাইসিস দিতে পারি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে ছয় মাসের মধ্যেই টাকার অভাবে ডায়ালাইসিস বন্ধ করে দেয় ৭৫ ভাগ লোক।
দু’টি কিডনি স্থায়ীভাবে বিকল হওয়া ক্রনিক কিডনি ডিজিজ (সিকেডি) রোগীর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এর থেকে বেঁচে থাকার চিকিৎসা হয় কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন অথবা ডায়ালাইসিস।
ক্রনিক কিডনি রোগীর চিকিৎসা
আমাদের দেশে মোটামোটি চারটির যেকোনো একটি প্রক্রিয়ায় স্থায়ীভাবে বিকল হওয়া কিডনি রোগীর চিকিৎসা করা হয়। এই চিকিৎসাগুলোর মধ্যে আছে কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্ট, হাসপাতাল ভিত্তিক হিমোডায়ালাইসিস, হোমভিত্তিক পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস এবং রেনাল ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন। এর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম এবং মোটামোটি স্থায়ী চিকিৎসা হলো ট্রান্সপ্ল্যান্টেশন। কিন্তু ভালো প্রচারণা, সচেতনতার অভাব এবং এককালীন বেশি খরচের কারণে আমাদের দেশে ট্রান্সপ্ল্যান্টেশনের মতো এত সুন্দর সার্ভিসটি ভুক্তভোগীরা পাচ্ছে না।
সিএপিডি-একটি সহজ ডায়ালাইসিস পদ্ধতি
আমাদের দেশে সিকেডি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস আবার দুই রকমভাবে হয়। একটি হলো হিমোডায়ালাইসিস, আরেকটি হলো পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস। পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসকে ঘরে বসেও করা যায় বিধায় একে হোম ডায়ালাইসিসও বলে। এখানে রক্ত পরিশোধনের জন্য পেরিটোনিয়াল ক্যাভিটি নামক তলপেটের জায়গা ব্যবহার করে। পেটের ভেতর ছোট্ট একটা ক্যাথেটার ঢুকিয়ে দেয়া হয় যেটার মধ্য দিয়ে দুই লিটার সিএপিডি ফ্লুইড ১০ মিনিট সময়ের মধ্যে পেটে ঢুকিয়ে দিয়ে ৬-৮ ঘণ্টা রেখে দেয়া হয়। রোগী এই সময় ফ্লুইড পেটে রেখেই সব ধরনের স্বাভাবিক কাজকর্ম চালিয়ে যেতে পারে। ৬-৮ ঘণ্টা পর আবার ডায়ালাইসিসের প্রয়োজনে আগে পেটের ভেতর রাখা ফ্লুইড ২০ মিনিটের মধ্যে বের করে ফেলা হয়। তারপর আবার ১০ মিনিটের মধ্যে ২ লিটার সিএপিডি ফ্লুইড পেটে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এর মাধ্যমে শরীরের ভেতরে থাকা বর্জ্য পদার্থ পেরিটোনিয়াল মেমব্রেন ছিদ্র পথে বাইরে বের হয়ে আসে। এই প্রক্রিয়া আবার দুইভাবে সম্পন্ন হয়ে থাকে। একটি হলো কন্টিনিউয়াস এম্বুলেটরি পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (সিএপিডি) যেটা হস্তচালিত। আরেকটি হলো অটোমেটেড পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (এপিডি) যেটা একটি মেশিনের সাহায্যে করা হয় যেখানে মেশিনের সাথে পেটে লাগানো ক্যাথেটারের কানেকশন দিয়ে রোগী ঘুমিয়ে থাকে এবং সারা রাত অটোমেটিক ডায়ালাইসিস হতে থাকে। দিনের বেলা মেশিন থেকে নিজকে বিযুক্ত করে নিজস্ব কাজে বাইরে বের হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু অধিকাংশ রোগী সিএপিডি বেশি পছন্দ করে। কারণ সিএপিডি একটি সহজ এবং অপেক্ষাকৃত কম খরচের একটি পদ্ধতি এবং দিনে দুই থেকে তিনবার করতে হয়।
পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো- বাড়িতে বসেই ডায়ালাইসিস করা যায়। সপ্তাহে দুই-তিনবার হাসপাতালে যাবার প্রয়োজন নাই। নিজের সুবিধা মতো সময়ে ডায়ালাইসি করা যায়। রক্ত বাড়ানোর জন্য হিমোডায়ালাইসিস রোগীদের তুলনায় পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসি রোগীদের কম পরিমাণে ইরাইথ্রোপয়েটিন ইনজেকশন লাগে। কোনো সুঁচ ফোটানোর দরকার হয় না। এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি বা হেপাটাইটিস-সি তে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নেই। হাসপাতাল থেকে পাওয়া কোনো সংক্রমণ ঝুঁকি নেই। একই হিমোডায়ালাইসিস মেশিনে অনেক রোগীদের ডায়ালাইসিস করার কারণে ডায়ালাইসিস করতে এসে বরং উল্টো হেপাটাইটিস-বি অথবা হেপাটাইটিস-সি বা এইচআইভি রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। কিন্তু পিডি (পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস) সিস্টেমে এই ধরনের কোনো ঝুঁকিই থাকে না। অনেক হার্ট এবং ডায়াবেটিস রোগী, বেশি বয়স্ক এবং শিশুদের জন্য সিএপিডি বেশি উপযোগী। গবেষণায় দেখা গেছে যারা ট্রান্সপ্ল্যান্ট করতে চান তাদের জন্যও পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস উত্তম। পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসের অসুবিধা হলো এটি প্রতিদিন দুই-তিনবার করতে হয়। একটি স্থায়ী ক্যাথেটার পেটের মধ্যে রেখে দিতে হয় এবং তাতে সংক্রমণের ঝুঁকিও থেকে যায়। হিমোডায়ালাইসিস রোগীদের খাবারের কঠিন শর্ত মেনে চলতে হয় বিশেষ করে যে দিনগুলোতে হিমোডায়ালাইসিস হয় না। কিন্তু পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসে খাবারের এত কঠিন শর্ত মানার দরকার হয় না। যারা বাসা থেকে বাইরে বের হয়ে ডায়ালাইসিস করতে আগ্রহী নন কিংবা যারা এমন রিমোট এরিয়াতে বসবাস করেন যে তাদের কাছাকাছি কোনো হিমোডায়ালাইসিস সেন্টার নেই তাদের জন্য সিএপিডির বিকল্প নেই। শুধু ফ্লুইড প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারলে বা ফ্লুইড সাথে নিয়ে যেতে পারলে এবং উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে রোগী যেখানে ইচ্ছা সেখানে ভ্রমণও করতে পারে। পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসের ফ্লুইডের দামে সরকার ভর্তুকি দিলে হিমোডায়ালাইসিসের চেয়ে কম খরচ হবে। ফলে এর জনপ্রিয়তাও বেড়ে যাবে। এই দুই ধরনের ডায়ালাইসিস চিকিৎসা খরচ প্রায় কাছাকাছি। তবে হিমোডায়ালাইসিস করতে হলে রোগীকে সপ্তাহে দুই-তিন দিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে হাসপাতালে গিয়ে ডায়ালাইসিস করিয়ে নিতে হয়। নিজ বাড়িতে বা বাসায় বসে সম্ভব নয়।
সব পদ্ধতির কিডনি চিকিৎসাতেই সুবিধা-অসুবিধা আছে। পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিসের অসুবিধা হলো এটি প্রতিদিন দুই-তিনবার করতে হয়। একটি স্থায়ী ক্যাথেটার পেটের মধ্যে রেখে দিতে হয় এবং তাতে সংক্রমণের ঝুঁকিও থেকে যায়।
কন্টিনিউতয়াস এম্বুলেটরি পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (সিএপিডি) নামক ডায়ালাইসিসের বিকল্প পদ্ধতিটি বর্তমানে আমদের দেশে অনেক সরকারি হাসপাতালে ও বেসরকারিভাবে চলমান রয়েছে। কিন্তু ফু¬ুইডটি আমদানিনির্ভর হওয়ার কারণে কিছুটা ব্যয়বহুল। ব্যবহারের সুবিধার জন্য কন্টিনিউতয়াস এম্বুলেটরি পেরিটোনিয়াল ডায়ালাইসিস (সিএপিডি) পদ্ধতির ডায়ালাইসিস থাইল্যান্ড, হংকং, মেক্সিকো ও চীনসহ অনেক দেশেই এখন বেশ জনপ্রিয়। সিএপিডি সিস্টেমে হিমোডায়ালাইসিসের মতো সপ্তাহে দুই-তিনবার ডায়ালাইসিস না করে বরং দিনে দুই-তিনবার যার যার বাড়িতে বসেই করতে হয়। যে সমস্ত ডায়ালাইসিস যোগ্য রোগী দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাস করে এবং নিকটস্থ হাসপাতালে হিমোডায়ালাইসিস সুবিধা নাই, যারা সপ্তাহে দুই-তিনবার হাসপাতালে হিমোডায়ালাইসিস না করে বাড়িতে বসেই সিএপিডি করতে আগ্রহী এবং হার্টের রোগীদেরকে সিএপিডির মাধ্যমেই ডায়ালাসিস করে বেঁচে থাকতে হয়। এই প্রক্রিয়ার আরেকটি সুবিধা হলো হাসপাতালে একবার ছোট একটা অপারেশন করে ক্যাথেটার পেটের মধ্যে স্থায়ীভাবে ঢুকিয়ে ডায়ালাইসিস চালিয়ে যাওয়া যায় এবং নিয়মিত হাসপাতাল যেতে হয় না। তবে সর্বদাই চিকিৎসকের পরামর্শের অধীনে থাকা চাই। শেরেবাংলা নগরস্থ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউতট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি হাসপাতালে সরকারি সুযোগ-সুবিধায় এই ক্যাথেটার পড়ানোর সার্ভিস বর্তমানে চলমান আছে। এখানে বিনা খরচে পেটে ক্যাথেটার ইমপ্লান্ট করানোর সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে। সিএপিডির এই সার্ভিসটি ঢাকার অন্য সব সরকারি টারসিরিয়ারি লেভেলের হাসপাতাল যেমন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ইত্যাদিতে চলমান আছে। এ ছাড়াও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বারডেম হাসপাতাল, মিরপুরস্থ কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, কম্বাইন্ড মিলিটারি হাসপাতাল, এভার কেয়ার হাসপাতাল, ইবনে সিনা হাসপাতাল, উত্তরা আধুনিক হাসপাতাল, বিআরবি হাসপাতাল, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, পপুলার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকার বাইরে চট্টগ্রামের বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে সিএপিডির জন্য ক্যাথেটার ইমপ্লান্টেশনের এই সার্ভিসটি চালু আছে।
একবার পেটে ক্যাথেটার ইমপ্লান্ট করা হয়ে গেলে সিএপিডি করতে খরচ বলতে লাগে শুধু এক বিশেষ ধরনের সিএপিডি ফ্লুইড যা পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। রোগীদের নিরাপদ ব্যবহারের জন্য কাওরানবাজারের ন্যাশনাল ট্রডিং সিন্ডিকেট লিমিটেড আমেরিকার বিশ্ব বিখ্যাত ব্যাক্সটার কোম্পানির সিএপিডি ফ্লুইড আমদানি করে থাকে। এসব রোগীদের সার্ভিস নিশ্চিত করার জন্য ওই কোম্পানির একটি সার্ভিস টিম সব সময় সক্রিয় আছে। রোগীদের এ জন্য মাসে খরচ হয় ২৫ হাজার টাকার মতো। আমদানিনির্ভর, অত্যাবশ্যকীয় ও জীবন রক্ষাকারী এই ফ্লুইডের ওপর এমনিতেই কোনো ভ্যাট-ট্যাক্স নেই। তার পরও আমদানি নির্ভর হওয়ার কারণে সরকার এর ওপর ভর্তুকি দিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোতে যথাযথ সাপ্লাইয়ের ব্যবস্থা নিশিত করতে পারলে রোগীদের হিমোডায়ালাইসিস ও হাসপাতাল নির্ভরতা কমে আসত।