বিশ্ব কিডনি দিবস ২০২২-এর প্রতিপাদ্য হলো ‘সুস্থ কিডনি সবার জন্য’ যার লক্ষ্য কিডনিজনিত রোগের লক্ষণগুলো সম্পর্কে শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি এবং তার নিরাময়ের বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে জানানো। এ জন্য এ বছরে কিডনি রোগ থেকে বাঁচার জন্য ছয়টি সেøাগান পানিধানযোগ্য। স্লোগান ছয়টি হলো, রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন, চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ সেবন করুন, পরিমিত শরীরচর্চা করুন, ধূমপান ও মদ্যপান থেকে দূরে থাকুন এবং ফলমূল ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করুন।
প্রতি বছর প্রতি মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিনে বিভিন্ন দেশে কিছু দিবস পালিত হয়। ওই নির্দিষ্ট দিনে অতীতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে স্মরণ করা বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতেই এসব দিবস পালিত হয়। পালনীয় এসব দিবসের মধ্যে একটি হলো বিশ্ব কিডনি দিবস। প্রতি বছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার কিডনিজনিত রোগ প্রতিরোধ এবং এর ঝুঁকি বিষয়ক সচেতনতা সম্পর্কে জনগণকে অধিক সচেতন ও শিক্ষিত করতে বিশ্বজুড়ে কিডনি দিবস পালন করা হয়।
প্রতি বছরই এই দিনটি উদযাপনের জন্য একটি প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয়। যেমন- ২০১৬ সালে এই দিনটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘কিডনিজনিত সমস্যা ও শিশুরা-রোগ প্রতিরোধে দ্রুত চিকিৎসা’। ২০১৭ সালে প্রতিপাদ্য ছিল ‘কিডনিজনিত অসুখ ও স্থূলতা : স্বাস্থ্যকর কিডনির জন্য স্বাস্থ্যকর জীবন ধারা’। ২০১৮ এর প্রতিপাদ্য ছিল ‘কিডনি ও মহিলাদের স্বাস্থ্য : অন্তর্ভুক্তিকরণ, মান নির্ণয় এবং ক্ষমতায়ন’। ২০১৯ ও ২০২০ সালের প্রতিপাদ্য ছিল ‘সর্বত্রই কিডনির সুস্থতা প্রত্যকের জন্য জরুরি’। ২০২১ সালের প্রতিপাদ্য ‘কিডনি রোগে সুস্থ থাকুন’। এই বছর বিশ্ব কিডনি দিবসটি ইন্টারন্যাশনাল সোসাইট অব নেফ্রোলজি এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব কিডনি ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে ২০০৬ সাল থেকে দিবসটি ৬৬টি দেশে পালনের মাধ্যমে বিশ্ব কিডনি দিবস পালনের ধারাবাহিকতার সূচনা করে। বিভিন্ন দেশের স্থানীয় কিডনি সংগঠনের মাধ্যমেও বিশ্ব কিডনি দিবস পালিত হয়ে থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমান বিশ্বে ৮৫ কোটি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত এবং সে হিসাবে প্রতি ১০ জনে একজন কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর ১৭ লাখ মানুষ আকস্মিক কিডনি রোগে মারা যায়। এটা বিশ্বব্যাপী প্রতি বছরে মানুষ মৃত্যুর ছয় নম্বর তালিকায় অবস্থান করছে। সে হিসাবে বিশ্বে প্রতি দিনে ৪,৬৫৭.৫ জন, প্রতি ঘণ্টায় ১৯৪ জন এবং প্রতি মিনিটে ৩.৩ জন।
বাংলাদেশ সরকারের হিসাব মতে দেশের দুই কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে কিডনি রোগে আক্রান্ত। প্রতি বছর চার লাখ করে মানুষ নতুন করে কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। মহামারীর মতোই প্রতিদিনই বাড়ছে এই কিডনি রোগীর সংখ্যা। অন্য একটি পরিসংখানে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রতি সাতজনে একজন কিডনি রোগী। অথচ প্রতি ২৫ লাখ লোকের জন্য একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। বাংলাদেশে প্রতি বছর ডায়ালাইসিস জাতীয় কিডনি জটিলতায় মারা যায় ৪০ হাজার। বাংলাদেশে সে হিসাবে প্রতি দিন ১১০ জন এবং প্রতি ঘণ্টায় চারজন ডায়ালাইসিস জাতীয় কিডনি জটিলতায় মারা যায়।
বাংলাদেশে ষোল লাখ আছে ডায়ালাইসিস যোগ্য রোগী। এর মধ্যে ১০% ডায়ালাইসিস যোগ্য রোগী নিজ খরচে ডায়ালাইসিস চালাতে পারে। এর মধ্যে ছয় মাসের মধ্যে টাকার অভাবে ডায়ালাইসিস বন্ধ করে দেয় শতকরা ৭৫ ভাগ লোক।
শতকরা ৮৫ ভাগ রোগীরা কিডনি নষ্ট হওয়ার আগে বুঝতে পারে না যে তারা কিডনিজনিত রোগে আক্রান্ত। নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রস্রাবজনিত সমস্যায় আমাদের দেশে শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ লোকের কিডনি ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রতি সাতজনের মধ্যে একজন কিডনি রোগে আক্রান্ত।
ডায়াবেটিস রোগীর ৩০-৪০ শতাংশ আর উচ্চ রক্তচাপে যারা ভুগছেন তাদের ১৮-২০ শতাংশ ক্রনিক কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। স্বাস্থ্য খাতের ২ থেকে ৩ শতাংশ বরাদ্দ এ রোগের জন্য ব্যয় হয়ে থাকে।
বাস্তবতা হচ্ছে, নিম্ন আয়ের দেশে শতকরা ৮০ ভাগ কিডনি রোগী কিডনি ডায়ালাইসিস ও কিডনি সংযোজন থেকে বঞ্চিত।
অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা এবং পুষ্টিহীন-অবৈজ্ঞানিক খাদ্যাভাসসহ অনেক কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিডনির সাথে সম্পর্কিত অসুস্থতার সংখ্যা মহামারী আকারে বেড়ে গেছে।
কিডনি আসলে কি?
কিডনি হলো রক্ত পরিশোধনের শোধনাগার যা রক্ত পরিষ্কার করার কর্মীর মতো কাজ করে। খাদ্য গ্রহণ ও কাজ করার ফলে শরীরের যে অসংখ্য ক্রিয়া-বিক্রিয়া ঘটে তার ফলে অনেক ধরনের বর্জ্য পদার্থ শরীরে তৈরি হয়। আর বেঁচে থাকার তাগিদে অপ্রয়োজনীয় অংশ শরীর থেকে বের করে দিতেই হবে। মানুষের শরীর থেকে এসব বর্জ্য পদার্থ বের করার মাধ্যম হলো চারটি। কিডনি, রেস্পিরেটরি সিস্টেম, চামড়া এবং মুখ-খাদ্যনালী-পায়ুপথ। কিডনি তার প্রত্যেক কিডনিতে থাকা ১০ লাখ রক্ত ছাঁকুনি বা নেফ্রন দিয়ে ছেঁকে প্রয়োজনীয় পদার্থ রেখে দেয় এবং প্রোটিন মেটাবলিজমের কারণে তৈরি নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্য পদার্থ যেমন- ইউরিয়া, ইউরিক এসিড, ক্রিয়েটিনিন ও অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় পদার্থ প্রস্রাবের সাথে শরীর থেকে বের করে দেয়।
একজন মানুষের শরীরে মোট রক্তের পরিমাণ ৫-৬ লিটার। মানব শরীরের হার্ট থেকে যত রক্ত সারা শরীরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য পাম্প হয়, তার ২৫% রক্তই কিডনির ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। দুই কিডনিতে থাকা ২০ লাখ নেফ্রন বা ছাঁকুনি দিয়ে প্রতি দিনে গড়ে সর্বোচ্চ ১৮০ লিটার এবং প্রতি মিনিটে ১২০-১২৫ মিলিলিটার রক্ত ফিলট্রেট হয়। শরীরের সমস্ত রক্ত প্রতি ৩০ মিনিটে একবার করে নেফ্রন দিয়ে ফিলট্রেট হতে হয়। এইভাবে পুরো রক্ত নেফ্রনের ভেতর দিয়ে প্রতি ২৪ ঘণ্টায় ৫০ বার ফিল্টার হয়। কিন্তু এই ফিলট্রেশনের মাত্র ১% দিয়ে প্রস্রাব তৈরি হয়, বাকি ৯৯% শরীর তার নিজের প্রয়োজনে পুনরায় শরীরে ঢুকিয়ে নেয়।
একজন ব্যক্তির শরীরে প্রতি এক মিনিটে প্রস্রাব তৈরি হয় গড়ে এক মিলিলিটার, ঘণ্টায় ৬০ মিলিলিটার, ২৪ ঘণ্টায় ১.৫ লিটার, মাসে ৪৫ লিটার এবং বছরে ৫৪০ লিটার। কিন্তু প্রস্রাব তৈরির এই প্রক্রিয়া ছেলের হাতের মোয়া নয় যে নেফ্রন দিয়ে ফিলটারিং হয়ে কিডনির ভেতরে ঢুকল আর খুব সহজেই প্রস্রাব তৈরি হয়ে গেল। কিডনির ভেতরে যে ছাঁকুনি বা নেফ্রন থাকে তার মাধ্যমে চারটি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রস্রাব তৈরি হয়ে থাকে। এই চারটি প্রক্রিয়া হলো- ফিলট্রেশন, রি-এবজরপশন, সিক্রেশন এবং এক্সক্রেশন।
কিডনি হলো ভার্টিব্রাল কলামের দুই দিকে পেটের পেছনের দিকে বসানো গড়ে ১৫০ গ্রাম ওজনের রক্ত ফিল্টারিং অর্গান যার কাজ মূলত প্রস্রাব তৈরি করার মাধ্যমে নাইট্রোজেন ঘটিত বর্জ্য পদার্থ বের করে দেয়া, শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ও পানি রেখে দেয়া, রক্তের পিএইচ, ইলেকট্রোলাইট ও এসিড বেজ ব্যালেন্স রক্ষা করা এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা ইত্যাদি। এ ছাড়াও দেখতে ছোট এই দু’টি কিডনি আরো বহুমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।
যেমন- ইরাইথ্রুপয়েটিন, রেনিন, কাইনিন প্রডাকশন এবং ভিটামিন-ডি একটিভেশন, অনেক টক্সিক সাবস্ট্যান্স ডিটক্সিফিকেশন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি ও এসিড শরীর থেকে বের করে দেয়া। শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এই অঙ্গ শরীরের অন্যতম অবহেলিত অঙ্গ হিসেবে যেন আমরা ব্যঙ্গ করেই চলছি। পরিতাপের বিষয় হলো- নিয়মিত কিডনি এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য খুব কমসংখ্যক লোকই স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসে।

কিডনি রোগ
আমরা জানি, মানুষ দুই ধরনের রোগ দ্বারা আক্রান্ত হয়। একটি হলো সংক্রামক এবং অন্যটি হলো অসংক্রামক। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কিডনি অসংক্রামক রোগ দ্বারাই বেশি আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। কিডনির বিভিন্ন ধরনের রোগ রয়েছে যেমন কিডনিতে আঘাত, ক্রনিক কিডনি রোগ (সিকেডি) রেনাল স্টোনস, নেফ্রোটিক সিন্ড্রোম, গ্লোমারিউলোনেফ্রিটিস, রেনাল সেল কারসিনোমা, মূত্রনালীর সংক্রমণ, উত্তরাধিকার সূত্রে বা জন্মগত আসা কিডনি রোগ ইত্যাদি।

কিডনি কেন বিকল হয়?
কিডনি বিকলতার নানাবিধ কারণের মধ্যে কিডনি টিস্যুর প্রদাহ, নিয়ন্ত্রণহীন দীর্ঘমেয়াদি ডায়াবেটিস, নিয়ন্ত্রণহীন দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান ও মাদকদ্রব্যে আশক্তি, অনিয়ন্ত্রিত লাইফ স্টাইল, জন্মগত ত্রুটি, জেনেটিক এবং পারিবারিক ধারার অসুখগুলো দায়ী।

ক্রনিক কিডনি ডিজিজ
ক্রনিক কিডনি ডিজিজ একটি স্থায়ী এবং প্রগ্রেসিভ ডিজিজ। কিডনিতে একবার ড্যামেজ প্রক্রিয়া শুরু হলে তা ধীরে ধীরে এবং অব্যাহতভাবে আমৃত্যু চলতেই থাকবে। ওষুধ বা অন্য কোনো উপায়ে এই ড্যামেজ প্রক্রিয়া একেবারে বন্ধ করে দেয়ার কোনো উপায় নেই। তবে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা-পরামর্শে ড্যামেজ প্রক্রিয়া ধীর করা যায়।
যেকোনো কারণে ক্রমাগত তিন মাস গ্লোমারুলার ফিল্ট্রেশন রেট ৬০ মিলিলিটার/মিনিট/১.৭৩ স্কয়ার মিটার সারফেস এরিয়া এর চেয়ে কম হলে তাকেই ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বলে।
কিডনি ডিজিজ আউটকাম কোয়ালিটি ইনিসিয়েটিভ গ্লোলামারুলার ফিল্ট্রেশন রেটের ওপর ভিত্তি করে ক্রনিক কিডনি ডিজিজকে পাঁচটি স্টেজে ভাগ করেছেন। সাধারণত গ্লোমারুলার ফিলট্রেশন রেট বা জিএফআর এর মান ৬০-১২৫ মিলিলিটার/মিনিট/১.৭৩ স্কয়ার মিটার বডি সারফেস এরিয়া।
ক্রনিক কিডনি ডিজিজকে চিকিৎসা করা, পর্যবেক্ষণে রাখা এবং ডায়ালাইসিস লাগবে কী লাগবে না এর ওপর ভিত্তি করে তিনটি ধাপে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
প্রথমত, ক্রনিক কিডনি ডিজিজের চিকিৎসার ক্ষেত্রে জিএফআর যখন ১২৫-৬০ মিলিলিটার/মিনিট- এই রেঞ্জের মধ্যে থাকে অথচ রোগীর কোনো উপসর্গ না থাকা।
দ্বিতীয়ত, স্টেজ ২-৪ : জিএফআর ৮৯-১৫ মিলিলিটার/মিনিট। সতর্ক অবস্থানে থেকে চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। একপর্যায়ে চিকিৎসকের পরামর্শমাফিক স্টেজ-৩ বা স্টেজ-৪ এ আসার পরপরই বাম হাতের ফিসচুলা করে ফেলতে হবে। কিন্তু ডায়ালাইসিস এই স্টেজে সাধারণত শুরু করার প্রয়োজন হয় না। এই চতুর্থ ধাপে জিএফআর ৫৯-১৫ মিলিলিটার/মিনিট থাকে।
তৃতীয়ত, এ ধাপটিকে মূলত এন্ড স্টেজ রেনাল ডিজিজ বা ইএসআরডি বলে। এখানে এসে ডায়ালাইসিস ছাড়া রোগীর জীবন চলে না।
স্টেজ-১ থেকে স্টেজ-৩ পর্যন্ত সাধারণত রোগীর কোনো উপসর্গ থাকে না। গ্লোমারুলার ফিল্ট্রেশন রেট অনুসারে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ রোগীদের ৫টি ভাগে ভাগ করা হয়।
স্টেজ-১ : বাহ্যিকভাবে রোগীর কাছে তেমন কোনো অসুস্থতা বা উপসর্গ থাকে না। তবে ল্যাবরেটরিতে প্রস্রাব পরীক্ষা করে মাইক্রোএলবুমিনোরিয়া অথবা প্রোটিনুরিয়া (প্রস্রাবের সাথে অতিরিক্ত প্রোটিন অর্থাৎ এলবুমিন বের হয়ে যাওয়া)। রেনাল বায়োপসি করে দেখা যাবে রোগীর কিডনিতে হিস্টোলজিক পরিবর্তন আছে। কিন্তু রোগীর গ্লোমারুলার ফিল্ট্রেশন রেট বা (জিএফআর) নরমাল। এমনকি সিরাম ক্রিয়েটিনিন লেভেলও নরমাল। এখানে প্রস্রাব বা হিস্টোলজিকাল রিপোর্টে পরিবর্তন কিন্তু জিএফআর লেভেল ৬০ মিলিলিটার/মিনিটের ওপর থাকবে। ব্লাড ইউরিয়া নাইট্রোজেন এবং সিরাম ক্রিয়েটিনিন লেভেলেও কোনো পরিবর্তন নেই। এ অবস্থায় রোগীকে বুঝতে হবে তার কিডনির ড্যামেজ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে এবং সর্বদা নেফ্রোলজিস্টের তত্ত্বাবধানে তাকে থাকতে হবে।
স্টেজ-২ : জিএফআর সামান্য কমে যাবে যার লেভেল হবে ৮৯-৬০ মিলিলিটার/মিনিট। বাহ্যিক কোনো উপসর্গ এখানেও না থাকতে পারে।
স্টেজ-৩ : মডারেট ফেইলিউর। জিএফআর ৫৯-৩০ মিলিটার/মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।
স্টেজ-৪ : সিভিয়ার ফেইলিউর। জিএফআর ২৯-১৫ মিলিলিটার/মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
স্টেজ-৫ : এন্ড স্টেজ রেনাল ডিজিজ বা ইএসআরডি। জিএফআর ১৫ মিলিলিটার/মিনিটের চেয়েও কম।
আপনি কখন বুঝবেন যে ক্রনিক কিডনি ডিজিজের প্রাথমিক পর্যায়ে অবস্থান করছেন :
- যখন কিডনি ড্যামেজ প্রক্রিয়া একনাগাড়ে তিন মাসের বেশি অব্যাহত থাকবে জিএফআর নরমাল থেকে বা লেভেল তার চেয়ে সামান্য নিচে নেমে গিয়ে।
- যখন দেখবেন আপনার জিএফআর বা সিরাম ক্রিয়েটিনিন লেভেল নরমাল কিন্তু বায়োপসি টেস্টে হিস্টোলজিক অ্যাবনরমালিটি তথা কিডনির ড্যামেজ প্রক্রিয়া ধরা পড়েছে।
- যখন দেখবেন জিএফআর লেভেল ৬০ মিলিলিটার/মিনিট এর নিচে অব্যাহতভাবে তিন মাস থাকবে অথচ বায়োপসি টেস্টে কোনো হিস্টোলজিক অ্যাবনরমালিটি নেই।
ক্রনিক কিডনি ডিজিজ একটি ধীরে ধীরে কিন্তু স্থায়ীভাবে দুটো কিডনিই একসাথে বিকল হওয়া রোগ যাকে আমরা বলি প্রগ্রেসিভ ডিজিজ। যার বিকল প্রক্রিয়া একবার শুরু হলে সম্পূর্ণ বিকল না হওয়া পর্যন্ত কোনো ওষুধ দিয়েও থামানো যায় না। তবে এ রোগের চিকিৎসায় কিডনি বিকল হওয়ার গতি কমিয়ে আনা যায় কিন্তু বিকল হওয়া একেবারে থামিয়ে দেয়া যায় না। এর কারণ হলো আমাদের প্রতি কিডনিতে যে অন্তত ১০ লাখ নেফ্রন তথা ছাঁকুনি থাকে তা একবার স্থায়ী ড্যামেজ প্রক্রিয়ায় মরে গেলে পড়ে তা আর জীবিত হয় না বরং এগুলো পাশে থাকা অন্য নেফ্রনগুলোকেও ক্রমাগতভাবে ধীরে ধীরে ড্যামেজ প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসে।
প্রায়ই প্রাথমিক পর্যায়ে এমনকি দুই কিডনির কার্যক্ষমতা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার পরেও মানুষ বুঝতে পারে না যে তার কত বড় সর্বনাশ হয়ে গেছে। লক্ষণ দৃশ্যমান না হওয়ার অন্যতম কারণ হলো কিডনির অভিযোজন ক্ষমতা বা রিজার্ভ পাওয়ার অনেক বেশি। সাধারণত কিডনির কার্যক্ষমতা ৫০-৬০ শতাংশ না কমা পর্যন্ত রক্ত পরীক্ষায় সিরাম ক্রিয়েটিনিন লেভেল উচ্চ দেখায় না। আবার সাধারণত সিরাম ক্রিয়েটিনিন লেভেল দুই না হওয়া পর্যন্ত আল্ট্রাসনগ্রাফিতেও ভালো মতো বোঝা যায় না যে ব্যক্তির ক্রনিক কিডনি ডিজিজ হয়েছে। পরবর্তী পর্যায়ে, কিডনিতে ক্ষতি যখন অপরিবর্তনীয় হয়ে যায় তখন রোগীরাও বেশ কয়েকটি লক্ষণ অনুভব করতে পারেন, যেমন- গোড়ালি ও পা ফোলা, ওজন হ্রাস, ক্ষুধা মন্দা, রক্তশূন্যতা হয়ে ফ্যাকাসে দেখানো, শারীরিক দুর্বলতা, প্রস্রাবে সমস্যা প্রভৃতি।
সুতরাং সিকেডি একটি মানব নীরব ঘাতক রোগ, যা ক্যান্সারের চেয়েও ভয়াবহ। কারণ অনেক ক্যান্সারই সময়মতো চিকিৎসায় ভালো হয় কিন্তু সিকেডি রোগটি শুরু হয় অনেকটাই নীরবে এবং যার শেষ রক্ষা হিসেবে করতে হয় ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি ট্রান্সপ্লান্টেশন এবং পরে শেষ পরিণতি মৃত্যু। অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও অনেকটাই অকার্যকর এ চিকিৎসা। এ রোগ নির্ণয়ের একটি সহজ উপায় হলো সিরাম ক্রিয়েটিনিন করে কিডনি বিকল হয়েছে কি না অনেকটাই প্রাথমিকভাবে বোঝা যায় কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের কিডনির রিজার্ভ পাওয়ার অনেক বেশি হওয়ায় কিডনি ফাংকশন ৫০-৬০ শতাংশ লস না হওয়া পর্যন্ত সিরাম ক্রিয়েটিনিন পরীক্ষা করলেও রিপোর্ট নরমাল দেখাবে। এ জন্যই এটিকে নীরব ঘাতক রোগ বলা হয়; অর্থাৎ আপনার বুঝে ওঠার আগেই রোগ ধরা পড়া যখন তেমন কিছুই করার থাকে না।
সাধারণত ক্রমাগতভাবে উচ্চ রক্তচাপ ১০-১৫ বছর এবং ডায়াবেটিস ৫-১০ বছর আনকন্ট্রোল থাকলে কিডনি বিকল হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় এবং একবার শুরু হয়ে গেলে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত থামে না। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ এবং সিকেডি-আপন ভাইয়ের মতো যারা হাত ধরাধরি করে চলে।
সুতরাং এ মরণঘাতী রোগ থেকে বাচার মূল ভিত্তি রোগের চিকিৎসা করার চাইতে রোগ যাতে না হতে পারে সে ব্যবস্থা করা। যদি কেউ এমন কোনো লক্ষণ অনুভব করেন যা কিডনির রোগের ইঙ্গিত দেয় তবে তাদের তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।
কোনো পরীক্ষা না করেও আপনি কিডনি রোগে ভুগছেন কি না সন্দেহ করুন নিম্নলিখিত উপসর্গ লক্ষ্য করে : প্রস্রাবের সাথে রক্ত বের হওয়া, বিশেষ করে রাতে অল্প পরিমাণে কিন্তু বারবার প্রস্রাব হওয়া, কোনো কারণ ছাড়াই কিছুটা দুর্বল লাগতে থাকা, শরীরের চামড়া শুকনা খসখসে হতে থাকা, ফেনা ফেনা প্রস্রাব হওয়া, চোখের পাতা এবং পায়ের গোড়ালি ফুলে যাওয়া, ক্ষুধা মন্দা চলে আসা এবং মাংসপেশিতে কামড়ানো অনুভব করা।

কিডনি রোগ থেকে পরিত্রাণের সহজ উপায় : চারটি স্তরে কিডনি রোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

প্রথম স্তর : কিডনি রোগ সম্পর্কে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে গণসচেতনতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয় বাড়াতে হবে।

দ্বিতীয় স্তর : কিডনি রোগের রিস্ক ফ্যাক্টর নিয়ন্ত্রণ।
ক্রনিক কিডনি ডিজিজের রিস্ক ফ্যাক্টর অর্থাৎ যেসব ফ্যাক্টরের উপস্থিতির কারণে ক্রনিক কিডনি ডিজিজ বা সিকেডির প্রগ্রেসিভ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়, এসব ফ্যাক্টর সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে।
মডিফায়েবল : একধরনের ফ্যাক্টর যাদের মানুষ ইচ্ছা করলে কম বেশি মডিফাই করতে পারে। যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, এলোমেলো ব্লাড লিপিড লেভেল, স্থূলতা, ধূমপান, মদ্যপান, প্রয়োজন এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া ইত্যাদি।
মডিফায়েবল এসব ফ্যাক্টর থেকে বেঁচে থাকতে আমাদেরকে যথেষ্ট সাবধানী হতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ।
- পরিমিত ন্যাচারাল ফলমূল, শাকসবজি ও ভিটামিন সমৃদ্ধ পুষ্টিকর এবং বিশেষ করে বাসায় তৈরি খাবারে অভ্যস্ত হওয়া।
- মানবসৃষ্ট অতিরিক্ত প্রসেজড খাবার যেমন, পিজা, বার্গার, হটডগ, ডোনাটস, ফ্রাইড চিকেন ইত্যাদি পরিহার করা।
- সকল ধরনের অতিরিক্ত লবণ ও সুগার এবং ফ্যাট থেকে আহরিত ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার অথচ যথেষ্ট ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ নয়। চিনিযুক্ত, সফট ড্রিংকস, কোকিজ, আইস্ক্রিম, চকোলেট, মিষ্টি আচার, ফুটপাথে যেখানে সেখানে তৈরি করা খাবার ইত্যাদি খাবার থেকে দূরে থাকা।
- সব ধরনের ব্যাকিং খাবার, ব্রেড, ডেজার্ট, ক্যান্ডি, পাইস, চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, গ্রিল করা খাবার তালিকা থেকে বাদ দেয়া।
- অতিরিক্ত প্রসেজড করা প্যাকেটজাত খাবারও বাদ।
- পাতে অতিরিক্ত লবণ পরিহার করতে হবে প্রচুর পরিমাণে পানি খাওয়া।
- পরিশ্রম, হালকা থেকে মাঝারি ধরনের নিয়মিত ব্যায়াম যেমন যখন যতটা পারা যায় হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতারকাটা, সাইকেল চালনা ইত্যাদিতে অভ্যস্ত হওয়া।
- ধূমপান-মাদক-নেশাদ্রব্য পুরোপুরি পরিহার করা।
- পর্যাপ্ত ঘুম হওয়া, পরিমিত বিশ্রাম ও চিন্তামুক্ত জীবনযাপনকে অভ্যাসে পরিণত করা।
- সর্বোপরি ভালো চিন্তা করা, সৎ ও ধর্মীয় জীবন পরিচালনা, হিংসা-বিদ্বেষ, পরশ্রীকাতরতা, লোভ-লালসা পরিহার করা এবং ক্রোধ দমন করা কারণ এসব জিনিসই স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
এককথায়, কায়িক পরিশ্রম ও নিয়মিত শরীর চর্চা, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, সুপ্ত উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা, পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান, ধূমপান ও মদ্যপান থেকে বিরত থাকা, ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ সেবন না করা এবং নিয়মিত কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষা করা এবং পরিচ্ছন্ন জীবন পরিচারলনা।
নন-মডিফায়েবল রিস্ক ফ্যাক্টর : জেনেটিক্যালি যারা কিডনি রোগের রোগী বা বাহক হওয়া, বিশেষ জাতির মধ্যে বিশেষ ধরনের কিডনি রোগের প্রকোপ বেশি হওয়া, বয়সের সাথে সাথে নেফ্রন বা ছাঁকুনির পরিমাণ কমে যাওয়ার ফলে জিএফআর কমে যাওয়া, কিডনি রোগের পারিবারিক ইতিহাস, কিডনি জটিলতা নিয়েই জন্মগ্রহণ বা জন্মগত ত্রুটি নিয়েই দুনিয়ায় আগমনসহ এব ফ্যাক্টর যা থাকা-না-থাকা মানুষের নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই নেই।

তৃতীয় স্তর : সেকেন্ডারি প্রতিরোধ অর্থাৎ রোগ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ ও রোগের প্রথম অবস্থায় চিকিৎসা করা। বর্তমানে ডায়াবেটিসের জন্য ব্যবহৃত একটি ওষুধ সোডিয়াম-গ্লুকোজ কো-ট্রান্সপোর্টার-২ ইনহিবিটর কিডনি রোগের ক্রমবর্ধমান ক্ষতিকে কমিয়ে থাকে।
এ ছাড়াও ভেসোপ্রেসিন রিসেপ্টর এন্টাগনিস্ট ওষুধ জন্মগত কিডনি রোগীর পলিসিস্টিক কিডনি রোগের ক্ষতি কমিয়ে দিতে পারে।
কিডনি রোগ নির্ণয়ের জন্য দু’টি পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ- এর মধ্যে একটি প্রস্রাবের মধ্যে প্রোটিন বা অ্যালবুমিন আছে কি না তা প্রস্রাব পরীক্ষা করে দেখা। দ্বিতীয়টি রক্তের সিরাম ক্রিয়েটিনিন ও একই সাথে এস্টিমেটেড গ্লোমারুলার ফিলট্রেশন রেট (ই-জিএফআর) পরীক্ষা করা।
যারা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, বংশগত কিডনি রোগ, কিডনির ক্ষতিকারক ওষুধ, হারবাল ওষুধ, নেশার জন্য ওষুধ, স্থানীয় কবিরাজি ওষুধ গ্রহণ করে এবং যাদের স্বাস্থ্য ইতিহাসে কিডনি অকেজো হয়েছিল এবং যাদের বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে- তাদের কিডনি রোগ পরীক্ষা করা।

চতুর্থ স্তর : টারশিয়ারি প্রতিরোধ হলো যখন রোগী কিডনি রোগে আক্রান্ত; সেক্ষেত্রে কিডনি রোগের জটিলতা থেকে প্রতিকার পাওয়ার জন্য চিকিৎসা প্রদান। ডায়ালাইসিস এবং ট্রান্সপ্লান্টেশন চিকিৎসাব্যবস্থা অব্যাহত রেখে আমরা জটিল কিডনি রোগের বিপর্যয়কর পরিস্থতির হাত থেকে বাঁচতে পারি।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ডিপার্টমেন্ট অব হিস্টোপ্যাথলজি, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজি, শের-ই-বাংলা নগর, ঢাকা।