সকাল ৯টা থেকে রাত অবধি অফিসের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ছুটছি। রেস্টুরেন্টের এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে পায়চারি, কখনো টিউশনি ম্যান সেজে বিভিন্ন অলিগলিতে হাঁটাহাঁটি, কখনো ভার্সিটি ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে পার্ট টাইম জবের জন্য ছোটাছুটি, কখনো আবার ডেলিভারি বয় সেজে বাসাবাড়িতে খাবার সরবরাহকারী। দিন শেষে সন্ধ্যায় তুরাগ কিংবা বলাকায় ঝুলে ঝুলে বাসায় ফিরি।
এক নম্বর রোডের গলির শেষ মাথায় ছোট্ট একটা রুম নিয়ে থাকি। আমিসহ মোট তিনজনের ব্যাচেলর একটা বাসা। মাস দুয়েক হলো এখানে উঠেছি। আসতে আসতে রাত হয়ে যায়। তাই বাড়িওয়ালাকে বলে মেইন গেটের একটা চাবি নিজের কাছে রেখে দিয়েছি। বিপদের কথা তো বলা যায় না। বাচেলরদের নিত্য খাবার সঙ্গি ‘ডিম ভাজি’ আর গরম ভাত খেয়েই চুপটি করে বিছানায় গা এলিয়ে শুয়ে পড়লাম। সারা দিনের ক্লান্ত শরীর আর চলতে চায়না; তবুও গরম চায়ের চুমুকে মোবাইলে বই পড়তে ডুব দিলাম।
প্রতিদিন বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যাই। সিরিয়াস কোনো চরিত্র পড়ে মাঝে মধ্যেই কেঁদে ফেলি। আজো তাই হলোÑ
রাতের গভীরে চোখের জল গড়িয়েছে বালিশের গায়ে। চোখ বেয়ে পড়েছে নোনা জল। ভাবিনি এভাবে কেঁদে ফেলব। কখনো মনের অজান্তেই অশ্রু ঝরে দু’চোখ বেয়ে। ক্ষণিকের এই কান্না হয়তো কিছুক্ষণ পরে শুকিয়েও যায়। দিন শেষে এই কান্নাকে জড়িয়েই বাঁচতে হয় আমাদের। মোবাইলের স্ক্রিন লাইটে চোখ আটকা পড়ে আছে দীর্ঘক্ষণ। পাশের দু’জনের নাক ডাকার বিরক্তিকর শব্দ ছেড়ে ছেড়ে ক্রমশই বাড়ছে। দিনের বেলা বললে কোনোভাবেই তাদের বিশ্বাস করানো যায় না যে, তারা দু’জন বাঘের গর্জনে নাক ডাকে। একটা মশা এসে আরামে বসেছে কপালে। কোনো রকম শব্দ ছাড়াই মশাটিকে মৃত্যুদণ্ড দিতে চেয়ে ব্যর্থ হলাম। আমাকে ফাঁকি দিয়ে নাকের ডগা দিয়ে উড়ে গেল। বাইশ ইঞ্চির এই চার দেয়ালের ঘরে পালাবে কোথায়? খুঁজে বের করেই ছাড়ব। আমাকে বোকা বানানো এত সহজ নয়।
চোখের জল শুকিয়ে চোখের নিচে একটা প্রলেপ পড়েছে। কেমন যেন একটা পাতলা ভাঁজ। মশারি থেকে বেরিয়ে ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে পানি ছিটিয়ে এলাম। চোখটা খানিক লাল হয়েছে। বিকেলে সামান্য বৃষ্টি হওয়ায় একটু ঠাণ্ডা ভাব মনে হচ্ছে। বাথরুমের ছোট জানালাটা আটকাতেও ভুলে গিয়েছি। শোঁ শোঁ করে বাতাস আসছে। থাইটা আস্তে লাগাতে গিয়ে জোরে শব্দ হয়ে গেল। বাইরে বোধহয় হিম বাতাস বইছে। গলাটাও শুকিয়ে এসেছে। বোতলের তলায় একটু পানি যেন জমে আছে। গলাটা ভিজবে আরকি। এত ঠাণ্ডা পানি গলা দিয়ে নামবে বলে মনে হয় না।
ঢাকা শহরে একতলা বাড়ি পাওয়াও মুশকিল। বাধ্য হয়েই পাঁচতলার সিঁড়ি বেয়ে ঘামে শার্ট ভিজিয়ে প্রতিদিন ওঠানামা করতে হয়। রেললাইনের ধারে বস্তিগুলোই আমার কাছে একতলা মনে হয়। ঘরে ফিরে প্রতিদিনের সেই ডিম ভাজি আর আলুভর্তা খেতে খেতে হাপিত্যেশ হয়ে উঠেছি। স্বল্প ব্যয় আর স্বল্প খরছে এর চেয়ে ভালো কিছু আশা করাও বোকামি। ভালো কিছু খেতে গেলেও টাকার প্রয়োজন। এমনিতেই বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে। আগে যদিও পাঁচজনে একটা রুম শেয়ার করতাম। কিন্তু করোনার প্লাবণ ওদেরকে ভাসিয়ে গ্রামে নিয়ে ছেড়েছে। সেই থেকে আমি হয়ে গেলাম একা। এখন অবশ্য দু’জন সঙ্গী পেয়েছি। ফেরার পথে রাস্তার ধারে হোটেল-রেস্তোরাঁগুলো দেখেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে আসার চেষ্টা করি; কিন্তু বাতাসের লাগাম তো আর আমার হাতে না। বিভিন্ন খাবারের ঘ্রাণ নিয়ে নাকের ওপর চেপে বসে। ভেবেছি সামনে শুক্রবারে একবার গিয়ে দামটা জিজ্ঞেস করে আসব ; হাতের নাগালে হলে ভেবে দেখব। ইদানীং পকেটে বড় কোনো নোট হাতে বাঝে না। কয়েনের ওজনেই পকেট ভারী হয়ে থাকে। কাউকে দিলে নিতেও চায় না। বলে এসব নাকি বেশি চলে না। ইচ্ছেগুলো এখন আর ডালা মেলে ওড়ে না। কদাচিৎ জাগলেও দমিয়ে দিই নিজের মধ্যে। ইচ্ছের পিছে ছোটা বন্ধ করে দিয়েছি অনেক আগে। যেদিন শুনেছি টাকার পেছনে দৌড়ানো ছাড়া দুনিয়াতে চলা মুশকিল।
আমি যে কোন আশায় ঢাকায় পড়ে আছি তা নিজেও জানি না। না থেকেই বা উপায় কী! গ্রামের মধ্যবিত্ত একটা পরিবারের ছেলে আমি। বাবার পেনশনের টাকায় কোনো রকমভাবে খেয়ে দেয়ে সংসারটা চলছে। এর মধ্যে যদি আমি গিয়ে হাজির হই তাহলে ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’-এর অবস্থা হবে। বোঝা বহনের কষ্টটা এবার আমি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। কম তো আর হলো না, এবার না হয় বাবাকে একটু স্বস্তি দিই। এ মাসে বোধহয় বাসাটা ছেড়ে দিতে হবে। শেষমেশ বস্তিতে গিয়েই উঠতে হয় কি-না! এসব ভাবতে ভাবতেই পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। মা ফোন করেছে। ‘কীরে বাবা কেমন আছিস? সব ঠিকঠাক চলছে তো’? গলাটা চেপে শুধু মা’র কথার উত্তর দিলাম, বাড়তি কোনো কথা বলার অবকাশ পেলাম না।
বাংলাদেশের ৭০ পার্সেন্ট তরুণ যুবকদের এই গ্লানিটা টানতে হয় প্রতিনিয়ত। ব্যাচেলর বলে বাড়ি ভাড়াও দিতে চায় না কেউ। আর এমন রুটিনের জীবন চলা ছেলের সাথে কেই বা মেয়ে বিয়ে দিয়ে ব্যাচেলর জীবন থেকে মুক্তি দেবে !
বয়সটা বেড়ে এখন আটাশে পৌঁছেছে। এত দিনের গ্লানি শেষে শেষমেশ একটা ভালো চাকরি পেয়েছিলাম। একটু আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। জীবনকে নিয়ে একটু ভাবতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু আমাদের মতো ছেলেদের ভাবতেও বারণ। দূর থেকে একটা বাতাস এসে আশার আলোটা নিভিয়ে দিল। চাকরিটা আমার চলে গেল। অদৃশ্য এক শক্তির কাছে আমার স্বপ্নগুলো হার মানতে বাধ্য হলো। ব্যাচেলরদের স্বপ্নগুলো এভাবেই হারিয়ে যায় বাতাসে। যাকে হাজারো চেষ্টা করেও ছোঁয়া যায় না কখনো। আমি সেই আগের মতো আবারো অলিগলিতে ভিড় করি। পথেঘাটে ব্যস্ত রাস্তায় অচেনা পথিক হয়ে ঘুরি।
সকাল ৯টা থেকে রাত অবধি অফিসের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ছুটছি। রেস্টুরেন্টের এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে পায়চারি, কখনো টিউশনি ম্যান সেজে বিভিন্ন অলিগলিতে হাঁটাহাঁটি, কখনো...
