মাহবুব হাসান
আমি সেই অন্ধ

আমি সেই অন্ধ
যাকে তুমি দেখো প্রতিদিন রাস্তার কোণায়!
সেখানে কোনোই ভিড় নেই;
দাতা নেই, কেবল শূন্যতা বাওকুডানির মতো
আমাকেই ঘিরে রাখো ;
আমি দেখি
তারা দৃষ্টিহীনতাকে পুঁজি করে
আয় করে গৌরব, করে নরক গুলজার ।
আমি কী তোমাদের কেউ নই হে মানব !
আমি সেই অন্ধ
চারদিকে এতো অন্ধকার, তবু
দেখি মানুষের চুরিচামারি,লুচ্চামি,
ফেরেব্বাজির ঘূর্ণি দিয়ে তারা বুনে চলে
আত্মপ্রবঞ্চনার ধারালো খিল, সেই
কিলক একটার পর একটা গেঁথে যাচ্ছে
আত্মার আলোকমালায়, আর নচ্ছার বাতাস
পুঁজিপতির ঘোরেল চিন্তায়
পাক খাচ্ছে সমুদ্রের চোরস্রোতের সঙ্গীতে !
হে আমার মাধবীলতার ভোর
তুমি কি দেখতে পাও আর!
আমি সেই অন্ধ
যার চোখে আলো নেই, কিন্তু আছে নক্ষত্রের
জ্যোৎস্না-ধোয়া ভালোবাসা।

 

জাফরুল আহসান
দেখে নিও

ভিক্ষা চাইনি, দাবি আদায়ে সোচ্চার যখন,
তখনি দয়ার কথা বলছো।
আমি কি দয়া করেছি? কিংবা তুমি?
ভিক্ষার থালা হাতে করুণা ঘোরে দ্বারে দ্বারে
বিরান শস্যক্ষেত কৃষকের- নোনা জলে ভাসে
করুণা কিংবা কৃপা চাহে না কৃষক;
নোলক পরা বধূয়ার বুকে দয়ার সাগর
ক্ষুধা ও দরিদ্র পীড়িত কিষাণীর চোখে
মারি ও মন্বন্তরে বেঁচে থাকে বিশ্বাস ও শ্রম
দয়ার কথা বলছো কেনো?
সর্বংসহা মৃত্তিকার কাছে দাসখত দেয়নি কৃষক
দেখে নিও তুমি।
লাঙ্গলের ফলায় চৌচির হবে শস্যক্ষেত
কৃষাণীর নোলকে হাসবে নবান্ন
জেগে উঠবে ধরণী।
দেখে নিও
জেগে উঠবে ধরণী আর
পিছিয়ে পড়া আমার মতো মানুষেরা।

 

জাহাঙ্গীর ফিরোজ
ফিরে যেতে চায়

ডুবে আছি সুরে, ঝিম ধরে,
কাঁদে বাঁশি অন্তঃপুরে
আরশি নগরের ঐ পারে
ঝুলন্ত সবুজ বাঁশঝাড়ে
ফিরে যেতে চায় ;
হায় বাঁশি! যাবে কোন সুদূরের পারে?
দশটি আঙুলে তুমি ঘুরেফিরে
আটটি ফুটোয় কাঁদো সাত সুরে

বাঁশি বাজে অন্তঃপুরে,
বসে আছি সুরে ঝিমধরে।
চাঁদ এসে বসে বাঁশঝাড়ে,
বাঁশি ফিরে যেতে চায় ঘরে।

 

মোশাররফ হোসেন খান
মানবাতঙ্ক

আমার ভেতরে এখন এতটাই মানবাতঙ্ক,
যে যখন তখন কেঁপে উঠছে
আমার খাট -পালঙ্ক!
ইদানীং মানবাতঙ্কে রাতে
আদৌ ঘুমোতে পারি না।
হিংস্র হায়েনা থেকে নিরাপদে থাকা যায়
সকল হিংস্র প্রাণী থেকেও দূরে থাকা যায়
কিন্তু হিংস্র মানুষ থেকে পালিয়ে
আশ্রয় নেয়া যায় কোথায়?
বোধসম্পন্নরা জানে,
দ্বিপদ হিংস্রতার কাছে
চতুষ্পদ হিংস্রতাও হার মানে!
মানুষ, মানুষ বলে তোমরা যে চিৎকার করো,
আসলে ‘মানুষ’ কোথায়?

আমি তো দেখি তিন ভাগ
ভরা কার্তিকের বীভৎস সারমেয়,
আর এক ভাগ ‘মানুষ’।
তুমিই বলো,
উতল কার্তিকের হিংস্র সারমেয়কে
মানুষ বলে কেউ?
দোহাই--
সারমেয়কে মানুষ ভেবে
‘মানুষকে’ আর করো না হেয়!...

 

 

 


সায়ীদ আবু বকর
পৃথিবী হঠাৎ স্বর্গ স্বর্গ লাগে

আলোর পাপড়িগুলো ঝিরঝির করে
ঝরে ঝরে পড়তে লাগল দৃষ্টির উপর;
আমার দুচোখ বুঁদ হয়ে গেল সেই রূপে।
তুমুল বৃষ্টির মতো ঝরে ঝরে পড়তে লাগল
পুষ্পের নিঃশ্বাস:
আমার নাসিকা মূর্ছা গেল সেই ঘ্রাণে।
কোকিলের কুহু, দোয়েলের শিস আর নাইটিঙ্গেলের সঙ্গীতের ঝড়
আছড়ে আছড়ে পড়তে লাগল আমার শ্রবণেন্দ্রিয়ের উপর;
আমার হৃদয় নাচতে লাগল সেই সুরে।
আমি ভাবতে লাগলাম, আমি কি এখন মর্ত্যে আছি,
নাকি স্বর্গলোকে?
ঘাড় ফেরাতেই দেখি আমার পশ্চাতে তুমি, প্রিয়তমা;
তাই ভাবি, পৃথিবী হঠাৎ কেন স্বর্গ স্বর্গ লাগে!

 

 

গোলাম সরোয়ার
মহুয়া

যদি এসো আজ বহুদিন পর
তোমার মাধুরী দেখব দু’চোখজুড়ে
বিনিদ্র রজনী কাটে তোমার কথা ভেবে
মনের কথাগুলো কেন আজ বুকে জমা রবে?
সাজিয়ে রেখেছি গোলাপ বাগান
সাজিয়ে রেখেছি জুঁই চামেলি
ফুলেরাও তোমাকে করবে কুর্নিশ!
এখনি তোমার আসার বেলা
জানালা আমার রেখেছি খোলা
এসো উদ্দাম চুল আর তীব্র চোখ নিয়ে
সুন্দরী তুমি এসো আজ ছায়াবীথি তলে
এসো নির্জন মহুয়ার বনে।