ঈদ বাংলাদেশের জাতীয় উৎসব। আবহমান কাল ধরে এই জনপদে মহানন্দে ঈদ উদযাপিত হয়ে আসছে। শহর, নগর, গ্রাম-গঞ্জে এ ঈদ আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। নাড়ির টানে লক্ষ কোটি মানুষ ঈদ উপলক্ষে নিজ নিজ আত্মীয়স্বজনের কাছে ফিরে যায়। ঈদ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও ঐক্যকে সুদৃঢ় করে।
ঈদ মানে খুশি বা আনন্দ। ফিতর অর্থ ভঙ্গ। ঈদুল ফিতর অর্থ রোজা ভঙ্গের আনন্দ। আল্লাহর নির্দেশে বিশ্বের কোটি কোটি মুসলিম নর-নারী, শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণী পরম উৎসাহে উপবাসব্রত পালন করে। শাওয়ালের চাঁদ দেখে এই উপবাসের অবসান হয়। মানুষ নব-আনন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে।
ঈদুল ফিতর বা রোজা শেষের উৎসব বিভিন্ন দেশের ভাষায় বিভিন্ন নামে পরিচিত। মজার আর বাহারি সেসব নাম। যেমন : বাংলা ভাষায় রোজার ঈদ- ঈদুল ফিতরও বলা হয়; আরবি ভাষায় ঈদ-আল ফিতর; ইন্দোনেশীয় ভাষায় ঈদুল ফিতরি, হারি লেবারান; মালয় ভাষায় হারি রায়া আইদিল ফিতরি, হারি রায়া পুয়াসা, হারি লেবারান; ভারতের তামিল ভাষায় নোনবু পেরুনাল; জাভা ভাষায় নগাইদুল ফিতরি; সুদানি ভাষায় বোবোরান সিয়াম; আজারবাইজানে রামাজান বায়রামি, ওরুকুক বায়রামি; তাতার ভাষায় উরাজা বায়রাম; কিরগিজ ভাষায় ওরোজো মায়রাম; তুর্কি ভাষায় রামাজান বায়রামি; চীনের উইঘুর ভাষায় রোজি হেইত; সেনেগালের ভাষায় কোরিটে; ফারসি ভাষায় ঈদ-এ-সাঈদ-এ ফিতর; উর্দু ভাষায় ছোটি ঈদ, মিঠি ঈদ; সিন্ধি ভাষায় ঈদ নিমাজ; মালায়ালম ভাষায় চেরিয়া পেরুনাল; আলবেনীয় ভাষায় বাজরাম; সোমালি ভাষায় চিদ ইয়ার; বসনিয়ান ভাষায় রামাজানস্কি বাজরাম; স্প্যানিশ ভাষায় ফিয়েস্তা ডি লা রুপতুরা ডেল আইছুনো; ইথিওপিয়ান ভাষায় ঈদ আল-ফাতের; ডাচ ভাষায় সুইকারফিস্ট, চীনা ভাষায় কাইঝাই ডি শেনজিয়ান ইত্যাদি আরো কত কত নাম। তবে নাম ভিন্ন ভিন্ন হলেও উদ্দেশ্য অভিন্ন- আনন্দ আর খুশির বন্যায় ভেসে যাওয়া। সমাজের দুস্থ-দরিদ্র-অসহায়দের সেই আনন্দে শরিক করার চেষ্টা করা।
আমাদের দেশে কেউ কেউ একে ফিতরার ঈদও বলে। রোজাদারের জন্য ফিতরা প্রদান ওয়াজিব। পরিবারের প্রধান সব সদস্যের ফিতরা ঈদের নামাজের আগেই গরিব-দুস্থদের মাঝে বিতরণ করেন। ফলে প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি মহল্লøায়, প্রতিটি জনপদে গরিব-দুঃখীরা ফিতরার সাহায্য পেয়ে অনেক খুশি হন। সাময়িকভাবে তাদের অভাব কিছুটা হলেও দূর হয়। তারাও সবার সাথে আনন্দে শরিক হন। ঈদুল ফিতরের এটি এক বিশেষ তাৎপর্য। সবার দুয়ারে আনন্দের অনুষঙ্গ পৌঁছে দেয়া ইসলামের এটি এক মহান শিক্ষা।
আমাদের অনেকের অতিরিক্ত জামা-কাপড় ঘরে এমনিতেই পড়ে থাকে। আবার ঈদের সময়ও বাবা-মা আত্মীয়স্বজন আমাদের অনেক জামা-কাপড় উপহার দেন। অথচ আমার পাশেই একজনের একটি জামাও নেই। আমার অনেকগুলো জামা থেকে যদি তাকে একটি জামা উপহার দিই, তাতে তো আমার কমবেই না। বরং ওই একটি জামা পেয়ে ছেলেটি বা মেয়েটির মন আকাশ-সমান আনন্দে ভরে উঠবে। আমাদের বাসায় যে ছেলেটি, মেয়েটি বা কাজের বুয়া কাজ করে তাদেরও ঈদের পোশাক কিনে দেয়া উচিত।
ঈদ শুধু আনন্দের নয়। ঈদে নিজের বৃদ্ধা মা, বিয়ে দেয়া বোন, ফুফু, খালা ও আত্মীয়স্বজনের খবর নেয়া একান্ত উচিত। তারা দীর্ঘ প্রতীক্ষায় চেয়ে থাকে, হাজার ব্যস্ততায় সারা বছর কাজে ডুবে থাকলেও অন্তত ঈদের সময় আমাদের দেখতে আসবে। সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করেন মা। তাদের বসবাস পল্লী গ্রামে। শহর থেকে অনেক দূরে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক কত সুন্দরভাবেইনা বলেছেন-
‘ঈদের কথা যেই পড়েছে মনে/অমনি এলো মায়ের কথা স্মরণে/অমনি এলো লতায় পাতায় ভরা/ছোট্ট সবুজ গাঁয়ের কথা স্মরণে। ..... মায়ের স্মৃতি গাঁয়ের স্মৃতিরা/অশেষ ব্যথা অশেষ প্রীতিরা/কান্না হাসির অমর রীতিরা/রইলো মিশে অনেক অন্তঃকরণে।’
ঈদ উপলক্ষে আমাদের দেশে অসংখ্য পত্রপত্রিকা ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে। এতে আমাদের জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য ফুটে ওঠার কথা; কিন্তু দুঃখজনক যে, ওইসব ঢাউস সাইজের ঈদ সংখ্যাগুলোতে প্রায় ক্ষেত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না ঈদের শিক্ষা, আমাদের জাতীয় পরিচয়; আমাদের জাতির আশা ও আকাক্সক্ষার কথা। নয়া দিগন্ত, দৈনিক সংগ্রাম, মাসিক দ্বীন-দুনিয়া ও শিশু-কিশোর দ্বীন-দুনিয়া, কিশোর পাতা, নতুন কিশোরকণ্ঠসহ স্বল্পসংখ্যক পত্রপত্রিকায় ঈদের শিক্ষা, জাতির আশা-আকাক্সক্ষা ও ভালো হওয়ার ভালো কথা প্রকাশিত হয়। ওইসব অশ্লীল পত্রপত্রিকা ও ম্যাগাজিনের ঈদ সংখ্যার গল্প-প্রবন্ধ-নিবন্ধগুলো না পড়াই উত্তম। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মুসলিম-জাতির উন্নতি ও সমৃদ্ধির দিকে তাকিয়ে আমাদের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে ঢেলে সাজাতে হবে। তরুণ শিক্ষার্থীদের নব আবিষ্কারের পথে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সৃজনশীলতার অনুশীলন তরুণ প্রজন্মকে বড় হওয়ার পথ দেখাবে।
আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ঈদুল ফিতরের ওপর এমন এক শাশ্বত গান রচনা করে কিংবদন্তি হয়ে আছেন, যদি ঈদে সে গানটি না শোনা হয়, মনে হয় ঈদ-ই হয়নি। অপূর্ণতা থেকে যায় ঈদ উদ্যাপনে। আর তা হলো-
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে
এল খুশির ঈদ।
তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে
শোন আসমানী তাকিদ ॥’
এ গানটির প্রতিটি স্তবকে ঈদুল ফিতরের শিক্ষা নিহিত।
শান্তি ও সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। আমরা যখন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ঈদ উদ্যাপন করছি, তখন পৃথিবীর দেশে দেশে ইহুদি-খ্রিস্টান ও ব্রাহ্মণ-বৌদ্ধ উগ্রবাদীদের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দ্বারা মুসলমানরা চরমভাবে নির্যাতনের শিকার। ফিলিস্তিন, সিরিয়া, আফগানিস্তান, কাশ্মির, চীনের উইঘুর, শ্রীলঙ্কা ও আরাকানের মুসলমানরা কোথায় ঈদ করবে? যখন প্রতিটি মুহূর্তে তারা মৃত্যুর প্রহর গুনছে। তাদের শিশুরা, বৃদ্ধরা, তরুণরা কোথায় পাবে একটু আশ্রয়? একটু নিরাপত্তা। এই ঈদে ওই মজলুম মুসলমানদের মুক্তির জন্য আমাদেরকে প্রাণ খুলে দোয়া করতে হবে, যেন মহান আল্লাহ তাদের সীমাহীন দুঃখের অবসান ঘটান।
ঈদ আমাদের জন্য এই অপার আনন্দ নিয়ে হাজির হয় প্রতি বছর। জাগরণের কবি ফররুখ আহমদ যথার্থই বলেছেন-
‘থোকায় থোকায় কুঁড়ি যেমন/একটা ডালে ফোটে তেমন/ঈদ জামাতে এক হ’ল মন/সব মানুষের এক সাথে।
কেউ যাবে না কারেও ফেলে/কেউ যাবে না কারেও ঠেলে/অন্যে যদি দুঃখ পায়/খুশির কিছু নেই তাতে।
জামাত ছেড়ে থাকবে যে/ঘরের কোণে রইবে সে/রইবে হয়ে একপেশে/একলা থাকায় দুঃখ তাই।’
ঈদগাহ ছেড়ে বাড়ির পথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়, কোলাকুলি হয় পাড়া-প্রতিবেশীদের সাথে। প্রতিটা ঘর থেকে এ দিন সেমাই, শিরনি, ফিরনি, কোরমা-পোলাওর ম ম সুগন্ধ ভেসে আসে। যে যার সাধ্যমতো মেহমানদারি করার জন্য উঠে পড়ে লাগে। এতে এক বেহেশতি আনন্দ ও ভালোবাসার গোলাপ ফোটে প্রতি হৃদয়ে।
ঈদের দিন যাদের মা-বাবা, দাদা-দাদী, নানা-নানী, আত্মীয়স্বজন দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে, তারা পরম ভক্তিতে মুরব্বিদের কবর জিয়ারত করে। আত্মার মাগফিরাত কামনা করে। এই জিয়ারতের মাধ্যমে লাভ করা যায় সীমাহীন মানসিক প্রশান্তি।
আমরা মুসলমান। এক জাতি, এক বিশ্ব। আমরা বৃহৎ মুসলিম জাতিরই অংশ। বাংলাদেশ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এ দেশের মাটিতে আমাদের জন্ম। এ দেশের আলো-বাতাসে আমরা বেড়ে উঠেছি। আমরা আমাদের মাকে যেমন ভালোবাসি, আমাদের দেশকেও প্রাণের চেয়ে বেশি ভালোবাসি। পবিত্র ঈদুল ফিতরে আমরা আমাদের দেশের সব মানুষের প্রতি প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। মহান আল্লাহ আমাদের দেশকে একটি সুখী ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলুন। অদৃশ্য গজব করোনা মহামারী থেকে আমাদের সবাইকে রক্ষা করুন। আমাদের সব শিক্ষার্থীকে জ্ঞানগরিমায় মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠার তৌফিক দিন। আমিন।
