জমজমাট বড় বাজার। রোজ বিকেলে মাহিন ও সাদাফ বাজারে আসে। দু’জনই বন্ধু, পড়ে একই স্কুলে। বাড়িও একই পাড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে বাজারে আসে, হাঁটার অজুহাতে। আজকেও এসেছে। প্রতিদিনের অভ্যাস হিসেবে রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়েছে। এখানে-ওখানে জিনিসের দাম জিজ্ঞাসা করতে থাকে। তাদের কিছু কিনতে হয় না, তবুও, তারা সস্তায় কিছু পাবে এই আশায়। কিছু ডিলারের সাথে দরকষাকষি করে। কেউ কেউ বলে ‘দরদাম’। এই দরদাম করে সাদাফ ও মাহিন দু’জনের মনকে চাঙ্গা রাখে রোজ।
দুই বন্ধু রাস্তার পাশে বসা দোকানদার, হাতকাটা ভিক্ষুক, রিকশাওয়ালাদের কাজকর্ম দেখে। একটি বড় শোরুম, শপিংমলে গেঞ্জির দামের ট্যাগ দেখেই দু’জন দমে যায়। পকেটে বিশ টাকার খুচরা নোটটাকে চেপে ধরে, গলা খাকারি দিয়ে গেঞ্জিটা পছন্দ হয়নি- এমন স্টাইলে দু’জনই বেরিয়ে আসে দোকান থেকে।
একটি লিচুর ভ্যানের কাছে দাঁড়াল মাহিন ও সাদাফ। জিজ্ঞেস না করেই লিচুর ঝুড়ি থেকে একটা লিচু তুলে নিয়ে খেতে লাগল। খাওয়ার সময় উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করল, কী রকম দাম লিচুর?
৫০০ টাকা কেজি। কত কেজি নেবে?
প্রশ্ন করেন লিচুওয়ালা।
সাদাফ বলল, কেজিতে লিচু বিক্রি! প্রথম শুনলাম। আচ্ছা আড়াই শ’ গ্রাম দিন।
সারা শহরে কেজিতেই লিচু বিক্রি হয় এখন।
লিচুওয়ালা ওজন করা শুরু করল। মাহিন দেখল, সে লিচুর সাথে ডাঁটা ও পাতা ওজন করছে। মাহিন আর সাদাফ রাগ করে বলল, এটি কী? আপনি লিচুর সাথে ডালপালা ও পাতা ওজন করছেন!
লিচুওয়ালা নরম গলায় বললেন, খোকারা, সারা শহরে এভাবেই লিচু বিক্রি হয়।
লিচুওয়ালা জবাব বারবার একভাবে দিচ্ছেন, কিন্তু মাহিন আর সাদাফ রেগে গিয়ে বলল, থাক আপনার লিচু আমরা চাই না।
এ কথা শুনে লিচুওয়ালা লোকটি রেগে গিয়ে খানিকটা জোরে গলায় বলল, লিচু যখন নিতে চাও না, তখন ওজন করালে কেন?
ব্যাপারটা খারাপ হতে দেখে মাহিন তাকে টাকা দিয়ে বলল, নিন, যত পারেন লিচু বিক্রি করেন।
সাদাফ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল, কারণ সে অনুভব করল যে, লিচু লোকটি তার তথাকথিত অহঙ্কারে পা রেখেছে। সাদাফ লিচু নিলো, কিন্তু যেতে যেতে অবজ্ঞার সাথে উচ্চস্বরে বলল, একটু কৌশলে আপনার ক্রেতাদের সাথে সুন্দরভাবে কথা বলুন। না হলে আপনি সারাজীবন এ রাস্তাতেই থাকবেন। কোনো দিন অগ্রগতি হবে না। আপনি সারাজীবন এই রাস্তায় চলতে থাকবেন।
রাগ করে লিচুওয়ালাকে আরো কিছু বলল সাদাফ। ভিড়ের কিছু লোক তাদের দিকে তাকাতে লাগল। লিচু লোকটা বড় বড় চোখ করে স্তব্ধ হয়েছে দাঁড়িয়েছে সাদাফের দিকে তাকিয়ে আছে। সম্ভবত লিচুওয়ালা ভাবছে, এইটুকুন পুঁচকে ছেলে তাকে জ্ঞান দিচ্ছে।
মাহিন জোর করে সাদাফকে সরিয়ে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটছে। পথে সাদাফের ভালো লাগছে না, মেজাজ বিগড়ে গেছে তার। সেই লিচু লোকটির আচরণ বারবার মনে পড়ছে।
বাড়িতে এসে মাকে সব বলল। মনের মধ্যে কী ঘুরপাক খেতে লাগল জানে না। বাবার দিকে তাকাতেই মনে হলো বাবা তাকে বলছেন, সাদাফ তুমি ভুল করেছো।
সাদাফ যখন আবার প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকাল, বাবা তাকে সমাধান দিয়েছেন বলে সে হাসল।
পরের দিন সাদাফ আবার সেই জায়গায় গেল যেখানে লিচু লোকটি দাঁড়িয়েছে আছে। ঘামে গোসল করা লোকটি, প্রখর রোদে তার লিচুতে পানি ঢালছে। সাদাফের মুখ মাস্ক দিয়ে ঢাকা। সে দাম জিজ্ঞেস না করেই বলল, ভাইয়া আধ কেজি লিচু দিন।
লিচুওয়ালা আবার ডাঁটা ও পাতাসহ আধ কেজি লিচু ওজন করে। সাদাফ তাকে ২৫০ টাকা দিয়ে মুখের মাস্ক খুলে ফেলল। টাকা দেয়ার সময় বলল, মাফ করবেন ভাইয়া! কাল আমি আপনার সাথে যা করেছি তা ভুল ছিল, তার জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।
এ কথা শুনে লিচু লোকটি এবার অবাক চোখে সাদাফের দিকে তাকাল। সাদাফ মৃদু হেসে কানের কাছে হাত রেখে আবার মাফ চাইল। এবার লিচু লোকটি মায়াভরা চোখে হাসতে লাগল।
সাদাফ তার দুই চাকার সাইকেলের হুকে লিচু ঝুলিয়ে রাখল। সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দিলো। মনে হচ্ছে যেন কয়েক কিলো ওজন তার মনের ওপর থেকে নেমে এসেছে। সে একটি গভীর মিষ্টি নিঃশ্বাস ফেলে, সাইকেলটাকে সেখান থেকে উড়িয়ে নিয়ে গেল।
জমজমাট বড় বাজার। রোজ বিকেলে মাহিন ও সাদাফ বাজারে আসে। দু’জনই বন্ধু, পড়ে একই স্কুলে। বাড়িও একই পাড়ায়। হাঁটতে হাঁটতে বাজারে আসে, হাঁটার অজুহাতে। আজকেও...
