দীর্ঘ দুই বছর পর এবার বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীরা পবিত্র মক্কা-মদিনা নগরীতে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেক হাজী পবিত্র মক্কা নগরীতে উপস্থিত হয়েছেন। এটি আমাদের জন্য খুবই খুশির খবর। আমরা আল্লাহর মেহমান সম্মানিত হাজী সাহেবদের খেদমত করার সুযোগ পেয়েছি। এজন্য আমি মহান আল্লাহপাকের অশেষ শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি, আলহামদুলিল্লাহ। হজ ব্যবস্থাপনাকে সুন্দর ও হজযাত্রী বান্ধব করতে ডিজিটাল ই-হজ সিস্টেম চালুসহ সার্বিক বিষয়ে যার অবদান না বললেই নয় তিনি হলেন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। আমি আমার ব্যক্তিগত ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। বাংলাদেশের সম্মানিত হজযাত্রীদের সার্বিক সুযোগ সুবিধা প্রসারের ক্ষেত্রে ভাতৃপ্রতিম রাজকীয় সৌদি সরকারের আন্তরিক সহযোগিতার জন্য আমি মহামান্য সৌদি বাদশাহ ও মাননীয় হজমন্ত্রী এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সৌদি আরবের মান্যবর রাষ্ট্রদূত ঈসা বিন ইউসুফ আল দুহাইলান ও তাঁর সহকর্মীদের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ হতে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাই।
আপনারা জানেন, একসময় হজযাত্রীদের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পাদন করতে নানা রকম হয়রানির শিকার হতে হতো। বিভিন্ন দফতরে দফতরে ঘুরে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হতো। হজযাত্রীরা এজেন্সি মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতারণার শিকার হতো। কিন্তু সেসবই আজ অতীত। এখন হজযাত্রীরা আর কোনো হয়রানির শিকার হয় না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ই-হজ কার্যক্রম পরিচালনা করায় হজ ব্যবস্থাপনা এখন আরো উন্নত হয়েছে। একই সাথে হজযাত্রীদের যাবতীয় হয়রানি বন্ধ হয়েছে। বিগত ১৩ বছরে হজ ব্যবস্থাপনায় যে উন্নতি সাধিত হয়েছে তা দেশ বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। এ বছরও আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে হজ কার্যক্রম পরিচালনা করছি। জাতীয় হজ ও ওমরাহ আইন-২০২১ এর আলোকে এ বছরের হজ ব্যবস্থাপনার যাবতীয় প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। মহামারী করোনাভাইরাসের কারণে গত দুই বছর বাংলাদেশসহ পৃথিবীর কোনো দেশ হতে হজযাত্রীরা হজে যেতে পারেননি। পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এ বছর সীমিতসংখ্যক হজযাত্রী হজে যেতে পারছেন। এ বছর ৫৭ হাজার ৫৮৫ জন বাংলাদেশী হজযাত্রী হজে যাচ্ছেন। যার মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চার হাজার জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছেন ৫৩ হাজার ৫৮৫ জন। ইতোমধ্যে ৫ জুন, ২০২২ থেকে হজের ফ্লাইট শুরু হয়েছে। আগামী ৩ জুলাই পর্যন্ত হজ ফ্লাইট চলবে। এ বছর বাংলাদেশে থেকে হজে যাওয়া ও আসার জন্য মোট ২৫৬টি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। এর মধ্যে হজে যেতে ১২৮টি ফ্লাইট পরিচালিত হবে। বিমান ৬৫টি, সাউদিয়া ৫১টি ও ফ্লাইনাস ১২টি ফ্লাইটে যাত্রী নিয়ে যাবে। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ৮ জুলাই পবিত্র হজ পালন হবে। হজ শেষে ফিরতি ফ্লাইট ১৪ জুলাই থেকে শুরু হয়ে চলবে ৪ আগস্ট পর্যন্ত।
আপনারা জানেন, ২০১৯ সালে স্বল্পসংখ্যক হজযাত্রীর জন্য সৌদি আরবের প্রি-এরাইভাল ইমিগ্রেশন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। তবে এ বছর ‘রুট টু মক্কা ইনিশিয়েটিভ’ এর আওতায় ঢাকার শতভাগ হজযাত্রীর সৌদি আরবের প্রি-এরাইভাল ইমিগ্রেশন ঢাকায় সম্পন্ন করা হবে। এতে হজযাত্রীদের দীর্ঘভ্রমণ শেষে সৌদি আরবে পৌঁছানোর আর লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে না। এতে তারা অনেক ভোগান্তি থেকে রক্ষা পাচ্ছেন।
করোনার আগের সময়ে হজ শুরু হওয়ার সাত-আট মাস আগে দ্বিপাক্ষিক হজচুক্তি অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু এ বছর মাত্র দেড় মাস আগে হজচুক্তি অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু চুক্তির পরও সৌদি সরকারের হজের ব্যয় ঘোষণায় দেরি হচ্ছিল। এ কারণে স্বল্পসময়ে হজকার্যক্রম পরিচালনা করতে গিয়ে বাংলাদেশে যাতে কার্যক্রম এগিয়ে রাখা যায় সেজন্য সৌদি আরব হতে জনপ্রতি প্রকৃত খরচের বিবরণী না পাওয়ার আগেই ধর্ম মন্ত্রণালয় সরকারি ব্যবস্থাপনায় গত ১১ মে দু’টি প্রস্তাবিত হজ প্যাকেজ ঘোষণা করে। এতে হজযাত্রীর বিমান ভাড়া, সৌদি আরবের বাড়ি ভাড়া, সার্ভিস চার্জ, মুয়াল্লিম ফি, জমজমের পানি, খাবার খরচ এবং অন্যান্য ফি হিসেব করে প্যাকেজ-১ এ পাঁচ লাখ ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা এবং প্যাকেজ-২ এ চার লাখ ৬২ হাজার ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। বেসরকারি ব্যবস্থাপনার এজেন্সিগুলোর জন্য হাব সর্বনি¤œ পাঁচ লাখ ২২ হাজার ৭৪৪ টাকার একটি প্যাকেজের ঘোষণা করে। প্রস্তাবিত প্যাকেজ ঘোষণাকালে বলা হয়, প্যাকেজ ঘোষণার পর রাজকীয় সৌদি সরকার কর্তৃক অতিরিক্ত কোনো চার্জ আরোপ করা হলে তা প্যাকেজ মূল্য হিসেবে গণ্য হবে এবং হজযাত্রীকে পরিশোধ করতে হবে। কোনো অর্থ অব্যয়িত থাকলে তা হাজীদের ফেরত প্রদান করা হবে।
এরপর গত ২৫ মে ২০২২ সালে সৌদি কর্তৃপক্ষ মিনায় অবস্থান স্থলের ভিত্তিতে ৪ ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করে চার ধাপের ব্যয়ের বিবরণ নির্ধারণ করে। এর মধ্যে সর্বনি¤œ ব্যয়ের ধাপ ডি ও সি প্রকাশ করে। উক্ত তথ্য অনুযায়ী মোয়াল্লেম ফি ‘সি’ অনুসারে আট হাজার ৬৪০ সৌদি রিয়াল এবং ‘ডি’ অনুসারে সাত হাজার ৪৯০ সৌদি রিয়াল ধার্য করে। এতে মোয়াল্লিম ফি ‘সি’ অনুসারে এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৯৭ টাকা এবং মোয়াল্লিম ফি ‘ডি’ অনুসারে ৭৪ হাজার ৫০০ টাকা বৃদ্ধি পায়। সৌদি রিয়ালের দাম বেড়ে যাওয়া, সৌদি আরব পর্বে সব খাতের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট, সার্ভিস চার্জ, কর অন্তর্ভুক্ত করা, মোয়াচ্ছাছা এর খরচ দ্বিগুণ হওয়া ও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি হওয়ায় প্যাকেজ মূল্য বৃদ্ধির জন্য দায়ী। কিন্তু বাংলাদেশের হজযাত্রীদের আর্থসামাজিক অবস্থা ও হজযাত্রীদের প্রতি বর্তমান সরকারের সহানুভূতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় আমরা উভয় প্যাকেজে সৌদি আরবে আবশ্যকীয় ব্যয় ৫৯ হাজার টাকা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। যা ২৬ মে ঘোষণা করা হয়। এতে হজের খরচ প্যাকেজ-১ হয় পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার ৩৪০ টাকা এবং প্যাকেজ-২ এ হয় পাঁচ লাখ ২১ হাজার ১৫০ টাকা হয়। এর বাইরে হজযাত্রীকে প্যাকেজ মূল্যের অতিরিক্ত ৮১০ সৌদি রিয়ালের সমপরিমাণ ১৯ হাজার ৬৮০ টাকা সাথে নিতে হয়েছে।
আপনারা জানেন, হজ ব্যবস্থাপনা একটি দ্বি-পাক্ষিক বিষয়। এটি একটি বহুমাত্রিক ও সময়াবত ব্যবস্থাপনা। এখানে বাংলাদেশ ও রাজকীয় সৌদি সরকারের ব্যবস্থাপনা জড়িত। দেশের মধ্যে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় সমন্বয়কারী হিসেবে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সাথে অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে থাকে। বৈশ্বিক মহামারী-উত্তর বিশেষ পরিস্থিতিতে অত্যন্ত স্বল্প সময়ে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার মাঝে কেবল সবার সহযোগিতার কারণেই সুষ্ঠু ও সুন্দর হজ ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশের বিরাট সংখ্যক হজযাত্রী ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুমোদিত হজ এজেন্সির মাধ্যমে হজ পালন করে থাকেন। বেসরকারি হজ এজেন্সিগুলো ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে কাজ করে থাকে। হজ এজেন্সিগুলোর সমন্বিত সংগঠন ‘হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ তথা (হাব) আমাদের হজ ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এ জন্য আমি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
পরিশেষে বলব, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে বিগত বছরগুলোর ন্যায় এবারো আমরা হজ ব্যবস্থাপনাকে সুষ্ঠু ও সুন্দর করতে যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আশা করি, এ বছরও সবার সহযোগিতায় জাতিকে একটি নিরাপদ ও সুন্দর হজ ব্যবস্থাপনা উপহার দিতে পারব, ইনশাআল্লাহ। পরম করুণাময়। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সব সম্মানিত হজযাত্রীকে হজে মাবরুর নসিব করুন। আমিন।
দীর্ঘ দুই বছর পর এবার বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীরা পবিত্র মক্কা-মদিনা নগরীতে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনেক হাজী পবিত্র মক্কা নগরীতে উপস্থিত হয়েছেন। এটি আমাদের জন্য খুবই খুশির...
