সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে এ দেশের শিক্ষা বিস্তারে এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়। গুটি কয়েক কালো তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের কথা বাদ দিলে দেশের অধিকাংশ বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ই শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। নিয়মনীতির ছকে আনতে পারলে বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়েরর প্রতি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদেরও আস্থা ও ভরসা আরো বাড়বে।
সাম্প্রতিক সময়ের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আর এই তথ্য খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে উচ্চশিক্ষায় বিদেশ নির্ভরতা কমবে বলে মনে করছেন তারা। একই সাথে শিক্ষার মান বাড়লে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আরো বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে পারবে বলেও মনে করছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা ।
ইউজিসির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০১৭ সালে দেশে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী ৯০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল তিন লাখ ৫৪ হাজার ৩৩৩। সেখান থেকে বেড়ে ২০১৮ সালে ৯১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দাঁড়ায় তিন লাখ ৬১ হাজার ৭৯২। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে সাত হাজার ৪৫৯। একই সাথে গত দুই বা তিন বছরেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা সমানতালেই বেড়েছে।
বেসরকারি বিশ^বিদ্যালগুলোর মান উন্নয়ন ও শিক্ষার্থী ভর্তির হার বৃদ্ধি পাওয়া প্রসঙ্গে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. কাজী শহীদুল্লাহ বছরের শুরুতে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বৃদ্ধির বিষয়টি ইতিবাচক। তার মতে এক সময় বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেত। এখন দেশে বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে পারলে এ সংখ্যা আরো বাড়বে।
ইউজিসির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৬ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে এই সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ ছাড়ায়। এরপর ২০১৬ সালে এ ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়ে। এরপর আবার পরের বছরগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমে বেড়েছে।
বাংলাদেশ থেকে বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখন আরো কমছে। উচ্চতর গবেষণা ছাড়া বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত পড়াশোনা করতে যাওয়া শিক্ষার্থী এখন আগের তুুলনায় নেই বললেই চলে। তবে গত কয়েক বছর আগেও এই হার ছিল বেশি। বিশেষ করে নব্বই দশকের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় পড়াশুনার জন্য যেত। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। তবে এখন যারা বিদেশে যান তাদের অধিকাংশই যাচ্ছেন গবেষণামূলক কাজের জন্যই। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যুগের চাহিদাসম্পন্ন সাবজেক্ট অনুমোদন দেয়া হলে দেশেই বিভিন্ন সেক্টরের দক্ষ মানবশক্তি তৈরি হবে ও বিপুল পরিমাণ অর্থও নিশ্চিতভাবেই সাশ্রয় হবে।
এ ছাড়া বিশ্বায়নের এ যুগে তথ্যপ্রযুক্তির আকাশচুম্বী সফলতা, বিজ্ঞান, গবেষণা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি, চিকিৎসাবিজ্ঞান, যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের আন্তর্জাতিক প্রচার ও প্রসার সবকিছুর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে উচ্চ শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও উচ্চশিক্ষার মান উন্নয়নে বাংলাদেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অসংখ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ও সফলতার সাথে অবদান রেখে আসছে। দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উৎপাদন শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞান ও গবেষণা চর্চামূলক প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবলের চাহিদা পূরণের লক্ষে দেশের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানও অনস্বীকার্য।
অন্যদিকে একটি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ করা উচিত বলে শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট মহলের অভিমত। কিন্তু বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে জিডিপির হার এখনো ২ শতাংশের ঘরেই ঘুরপাক খাচ্ছে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ব্যয় হয় জিডিপির হার চার শতাংশ আর পাকিস্তানেও তিন শতাংশের কাছাকাছি। দেশের ২৫ থেকে ৪০ বছর বয়সি বিপুল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে হলে শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের পক্ষ থেকেও শিক্ষা নিয়ে আরো পরিসরে মেগা প্রকল্প নেয়ার বিষয়ে একটি কথা বেশ জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে আগামী দিনে শিক্ষাই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প। এবারের বাজেট ঘোষণার পর শিক্ষামন্ত্রী এ বিষয়ে একাধিকবারই বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন, শিক্ষায় বিনিয়োগ জিডিপির ছয় ভাগে নিয়ে যেতে হবে আমাদের। কারণ বড় বড় মেগা প্রকল্পগুলো শেষ হলে শিক্ষাই হবে সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প।
বাজেটে শিক্ষাখাতের বরাদ্দ বাড়ানোর বিষয়েও তিনি মতামত দিয়েছেন। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষায় বিনিয়োগ জিডিপির ছয় ভাগে নিয়ে যেতে হবে, বর্তমানে আমরা তিন ভাগে আছি। তিনি আরো বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি, বড় বড় যেসব মেগা প্রকল্প হচ্ছে, সেগুলো যেমন আমাদের যোগাযোগের জন্য, দেশের এগিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার; তেমনি পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন শিক্ষা এবং সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প।