একটি গ্রামে একটি বড় নদী ছিল। নদীর পাশেই একটি বড় জলাশয়। নদীর সঙ্গেই জলাশয় সংযুক্ত। সেই জলাশয়ের পানি গভীর, তাই এতে জলজ উদ্ভিদ জন্মে অনেক। শ্যাওলা মাছের প্রিয় খাবার। এমন জায়গা মাছের খুব পছন্দের হলো। সেই জলাশয়েও নদী থেকে অনেক মাছ আসতো। সব মাছ ডিম পাড়ার জন্য জলাশয়ে বাস করতো। লম্বা ঘাস আর ঝোপে ঘেরা থাকার কারণে জলাশয়ের মাছ সহজে দেখা যায় না।
সেখানে তিন শ্রেণীর মাছের আত্মীয়স্বজন বাস করতো। বোয়াল, চিতল ও ভেটকি। তাদের স্বভাব ছিল অন্যরকম। চিতল বিপদের লক্ষণগুলো পাওয়া মাত্রই বিপদ এড়াতে ব্যবস্থা গ্রহণে বিশ্বাসী। চিতল সব সময়ই বলে, বিপদ বুঝলেই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে সবাই।
ভেটকি ভাবলো, বিপদ এড়ানো বা এড়ানোর কথা ভাবা বৃথা, ভাগ্যে যা লেখা আছে তা হবেই।
একদিন সন্ধ্যায় নদীতে মাছ ধরে জেলেরা বাড়ি যাচ্ছিল। তাদের জালে খুব কম মাছ ধরা পড়ে। তাই তাদের মুখে বিষাদ। হঠাৎ তারা দেখলো একঝাঁক মাছ ও বকপাখি ঝোপের উপর দিয়ে যাচ্ছে। সব বকপাখির ঠোঁটে মাছ ধরে রাখা। তারা বিস্মিত হলো। একজন অনুমান করে বললো, ভাইয়েরা! মনে হয় ঝোপের আড়ালে নদীর সাথে সংযুক্ত একটি জলাশয় আছে, সেখানেই এত মাছ আছে।
জেলেরা উল্লসিত হয়ে ঝোপঝাড়ের মধ্য দিয়ে জলাশয়ের পাড়ে এসে মাছের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকালো।
একজন জেলে বললো, আহা! এই জলাশয় মাছে ভরপুর। আজ পর্যন্ত আমরা এই জায়গা সম্পর্কে জানতে পারিনি।
আরেকজন জেলে বললো, আমরা এখানে প্রচুর মাছ পাবো।
তৃতীয়জন বললো, আজ সন্ধ্যা নেমে আসছে। কাল সকালে এখানে এসে জাল ফেলবো।
এভাবে দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি ঠিক করে জেলেরা চলে যায়। তিন মাছ জেলের কথা শুনেছে। চিতল মাছ বললো, বন্ধুরা! তোমরা জেলেদের কথা শুনেছো। এখন আমাদের এখানে থাকা বিপদমুক্ত নয়। আমরা বিপদের খবর পেয়েছি। সময় মতো আমাদের জীবন বাঁচাতে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। আমি এখন এই জলাশয় ছেড়ে খাল হয়ে নদীতে যাচ্ছি। তারপর সকালে জেলেরা এসে জাল ফেলবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি বহু দূরে চলে যেতে পারবো।
বোয়াল মাছ বললো, যেতে চাইলে যাও, আমি আসছি না। এখন বিপদ কোথায়, এত আতঙ্কিত হওয়ার দরকার আছে? সঙ্কট না-ও আসতে পারে। সেই জেলেদের কর্মসূচি বাতিল হতে পারে, রাতে তাদের জাল ইঁদুর কেটে দিতে পারে। তাদের বসতিতে আগুন লাগতে পারে। ভূমিকম্প এসে তাদের গ্রাম ধ্বংস করে দিতে পারে বা রাতে মুষলধারে বৃষ্টি হতে পারে। তাদের গ্রাম বন্যায় ভেসে যেতে পারে। তাই তাদের আগমন নিশ্চিত নয়। তারা যখন আসবে, তখন ভাবা যাবে। আর তারা আসলেও আমি তাদের ফাঁদে পা দেবো না।
ভেটকি তার ভাগ্যের কথা বললো, পলায়ন করে কিছু করার নেই। জেলেরা আসতে চাইলে আসবে। আমরা যদি ফাঁদে পড়তে চাই, তাহলে আমরা ফাঁদে পা দেবো। ভাগ্যে যদি মৃত্যু লেখা না থাকে, তাহলে কি মরা যায়?
চিতল একাই চলে গেলো। ভেটকি ও বোয়াল জলাশয়ে রয়ে গেলো। সকাল হলে জেলেরা জাল নিয়ে জলাশয়ে জাল ফেলে মাছ ধরে। বোয়াল যখন সঙ্কট আসতে দেখে, তখন সে তার জীবন বাঁচানোর উপায় ভাবতে থাকে। তার মন দ্রুত কাজ করতে থাকে। আশপাশে লুকানোর মতো ফাঁপা জায়গাও নেই। হঠাৎ তার মনে পড়লো, একটা মৃত পাঙ্গাশের লাশ জলাশয়ে অনেকক্ষণ ধরে ভেসে আছে। সে তার উদ্ধারে আসতে পারে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই বোয়াল লাশটি খুঁজে পেলো। লাশ পচতে শুরু করেছে। বোয়াল পাঙ্গাশের মৃতদেহের পেটে ঢুকে পচা মৃতদেহকে নিজের গায়ে জড়িয়ে নিলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই একজন জেলের জালে আটকা পড়লো সে। জেলে জাল টেনে তীরে জাল থেকে মাছটিকে উল্টে দিলো। বাকি মাছগুলো কষ্ট পেতে লাগলো, কিন্তু বোয়াল মরা মাছের মতা পড়ে থাকলো। জেলে পচা গন্ধ টের পেয়ে মাছের দিকে তাকাতে লাগলো। নিশ্চল হয়ে পড়ে থাকা বোয়ালকে তুলে নিলো। নাক ছিটকালো, আক থু! এটা অনেক দিনের মরা মাছ। এটা পচা।
বিকৃত বাজে মুখ করে বোয়ালকে জলাশয়ে ফেলে দিলো জেলে। বোয়াল তার বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সঙ্কট থেকে পালাতে সক্ষম হলো। পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই সে ডুব দিয়ে নিরাপদ গভীরতায় পৌঁছে তার জীবন উদযাপন করলো।
ভেটকি অন্য জেলেদের জালে ধরা পড়ল। একটি ঝুড়িতে রাখা হলো তাকে। ভাগ্যের ভরসায় বসে থাকা ভেটকি সেই ঝুড়ির অন্যান্য মাছের মতো যন্ত্রণায় মারা গেলো।
একটি গ্রামে একটি বড় নদী ছিল। নদীর পাশেই একটি বড় জলাশয়। নদীর সঙ্গেই জলাশয় সংযুক্ত। সেই জলাশয়ের পানি গভীর, তাই এতে জলজ উদ্ভিদ জন্মে অনেক।...
