ঝিকরগাছা বিলে বক ও মাছরাঙার প্রথম দেখা হয়। দু’জন নানা ধরনের গল্প করে। খুব অল্প সময়ে তাদের মাঝে বন্ধুত্ব তৈরি হয়। যখন যেখানে যায় একসাথে। বক মাঝে মধ্যে বিভিন্ন ফসলের মাঠে গিয়ে পোকামাকড় খায়। মাছরাঙাও খায়। তার এখন এসব আনন্দের। সময়গুলো হাসিখুশিতে যাচ্ছে ভালো। বেশ কয়েক দিন থেকে বক পোকামাকড় খায় না। শুধু মাছ ধরে আর খায়। মাছ তার প্রিয় খাবার। এতেই চলে যায় দিন। পোকামাকড়ের আর প্রয়োজন হয় না। এ দিকে মাছরাঙা শুধু পুকুরে ডোবা নালায় মাছ, জলজ পোকা খোঁজ করত। বকের সাথে বন্ধুত্ব হওয়ার পর সেও যেন পুকুরের মাছের প্রতি তার টান হয় না। বক যেখানে যায় বকের সাথে উড়ে আর বকের সাথে গান গায়, খেলে, পাখা মেলে আকাশে উড়ে। দু’জন খুব মজা করে। কোথাও যেন তাদের বাধা দেয়ার কেউ নেই।
দূর-দূরান্তে ছুটে চলে। মাছ সন্ধান করে। তাদের যেন নিত্যদিনের কাজ।
একদিন বক ও মাছরাঙা উড়ে এসে গাছের ডালে বসল। নতুন এক পুকুর আবিষ্কার করল। এখানে আগে কত এসেছে- গেছে কিন্তু কখনো চোখে পড়েনি। অনেক বড় পুকুরটি ঠিক বিলের মতো দেখতে। ঝুম ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আশপাশে অনেক গাছগাছালি পুকুরের চার দিকে ঘেরা কী অপরূপ! কী সুন্দর! নান্দনিকতায় ভরপুর প্রকৃতি। যেন এখানেই তারা থেকে যায়। ঝুম বৃষ্টিতে পুকুর ভরা মাছ থৈ থৈ করছে! লাফাচ্ছে হরদম। তা দেখে যারপরনাই খুশি। এমন সুন্দর কবে দেখেছে মনে পড়ছে না। এক এক করে দু’জন অনেক মাছ ধরে খায়। ক্ষুধা নিবারণ করে। মাছগুলো বড্ড সুস্বাদু। তা ভেবে, মাছরাঙার লোভ তৈরি হলো। মনে বিভিন্ন রকম ফন্দিফিকির করে। বক যদি না থাকত তাহলে একাই খেতাম। ওহ! কী শান্তি পেতাম! সে আনমনা হয়ে স্বপ্ন বিভোর; দেখছে একা একা খাচ্ছে। আর ভিতর ভিতর খুব খুব মন্দ চিন্তা করছে। কিভাবে বককে দূরে সরানো যায়। বক বিষয়টি বুঝতে পারে। মাছরাঙা তার উপস্থিতিতে রাগান্বিত হচ্ছে। বক আফসোস করে বলে কিছুক্ষণ আগে আমরা কতই না সুন্দর বন্ধু ছিলাম! এখন কেন জানি আর ভালো লাগছে না। মাছরাঙা বন্ধুত্বের অমর্যাদা করছে। সে চলে যেতে চাইল কিন্তু যদি যায় বাসায় মাছ না নিয়ে গেলে বাচ্চারা উপস থাকবে। ওমনি মাছরাঙা বলল, বন্ধু শোন, তুমি এই অংশটার আর আমি ওই পাড়ের অংশটার মাছ ধরব। ভাগ করে নিলো। এভাবে কিছু দিন চলল। বক লক্ষ করল ধীরে ধীরে তাদের মাঝে বন্ধুত্বে ফাটল ধরছে। হঠাৎ মাছরাঙা একদিন মাছ ধরা নিয়ে বাগি¦তণ্ডা করে বক যেন তার বন্ধু না। সামান্য লোভের মোহে সব ভুলে গেছে! গায়ে পড়ে খুব ঝগড়া করে। বক খুব সাদাসিধে তর্ক করে না। তার কথায় মুচকি মুচকি হাসে। যতটুকু সম্ভব বোঝানোর চেষ্টা করে। বক বাসার পথে আসতে মাছরাঙার কথা ভাবছে আর কষ্ট পাচ্ছে যেন বুকটা ফেটে চৌচির হচ্ছে। সামান্য মাছের লোভে তাদের সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যাবে। ছিঃ! লোভ কী জঘন্য জিনিস। বক বলল, সব কিছু তার বন্ধুকে দিয়ে আসবে। আর কখনো সে পুকুরে যাবে না। মনস্থির করল, সকাল গিয়ে দেখে মাছরাঙা আসেনি। তাকে না পেয়ে সেদিন মাছ না ধরে ক্ষুধার্ত অবস্থায় চলে এলো। দুপুরে আবার গেল। তবুও দেখা পেল না। এবার বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতে করতে রাত হয়ে গেল বক না খেয়ে কিছু মাছ সংগ্রহ করে বাসায় ফিরে এলো। পরের দিন খুব ভোরে গেল তবুও তার বন্ধুর দেখা মেলে না। হতাশ হয়ে গেল! কী হলো তার চিন্তা করতে লাগল। আল্লাহ কোন শিকারি ধরে ফেলল নাকি? কান্না করে দিলো বক। আর বিড় বিড় করে আওড়াতে লাগল- সে আমার বন্ধু থাক। তার সাথে ঝগড়াঝাটি তবুও সে আমার বন্ধু। বলে, চুপ করে মাথা নিচু হয়ে বসে রইল। সিদ্ধান্ত নিলো তার বাসায় যাবে কিন্তু বক তো চেনে না। তবুও কল্পনা করল কোথা থেকে আসে সে বলেছিল তমাল দীঘির পাড় থেকে। তার মনে পড়ল। অনুমানে পথ চলতে লাগল। পথি মধ্যে শালিক পাখির সাথে দেখা হয়ে গেল। শালিক বলল, তুমি না মাছরাঙার বন্ধু। বলল, হুম, কী হয়েছে? আর বলো না দুদিন আগে সে মাছ নিয়ে ফিরছিল আর এক শিকারির ফাঁদে আটকা পড়ে কোনো রকম পালিয়ে বাঁচে। পায়ে চোট পেয়েছে। খুব জ্বর গায়ে। বকের যেন কষ্ট বেড়ে যাচ্ছে। সে চিন্তা করল বন্ধুকে দেখতে খালি হাতে কিভাবে যায়। আবার বাসায় ফিরে। কিছু মজার পুষ্টিকর খাবার নিলো, সাথে নানা রকম জলপোকা জলজ ব্যাঙ মাছরাঙার প্রিয় এবং ওই পুকুর থেকে সুস্বাদু মাছগুলো ধরে নিয়ে বন্ধুর বাসায় গেল।
মাছরাঙা দেখে আশ্চর্যান্বিত হলো! কিভাবে সম্ভব! আমি তো তোমার হক নষ্ট করেছি। তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। ঝগড়া করেছি এমনকি ফাঁদ তৈরি করেছিলাম যেন তুমি চলে যাও। তার পরও আমাকে দেখতে এলে! বক বলল, থাক না ওসব! বন্ধুর এ অবস্থা জেনে না এসে কী থাকা যায়। অপরাধী হয়ে যাবো। মাছরাঙা অতীতের কথাগুলো মনে করে করে অশ্রুশিক্ত ও অনুতপ্ত হলো। আবার সব ভুলে আরো গাঢ় হয় তাদের বন্ধুত্ব।
