বেলারুশ রোডের মাথায় বিশাল মার্কেট। রকমারি সব দোকানপাট। মার্কেটের ঠিক পূর্ব পাশে চাকচিক্যময় পাখির দোকান। নানা প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। বেচাকেনা হয়। সবার পরিচিত দোকান। সুনাম রয়েছে বেশ। কেউ সরাসরি এসে পোষার জন্য পাখি ক্রয় করে আবার কেউ কেউ অনলাইনে পাখি অর্ডার করে বাসায় ডেলিভারি নেয়। মানসম্মত সুযোগ-সুবিধা।
আরো ছোট ছোট ব্যবসিকগণ মহাজনের কাছ থেকে নিয়ে পাখি ফেরি করে। নির্দিষ্টসংখ্যক পাখি নিয়ে বিভিন্ন শহর ও মহল্লায় বিক্রয় করে। প্রতিদিনের মতো এক পাখিয়াল চার খাঁচায় আট জোড়া পাখি নেন ব্যবসার জন্য।


সেখানে রয়েছে পৌষ্য পাখি- টিয়া, মুনিয়া, ময়না, তোতা, শালিক ও কবুতর। রাতে বাসায় এসে খুব সুন্দর করে বাড়ির গিন্নি তাদের বিভিন্ন ধরনের খাবার আপ্যায়ন করে। খাবার খায় আর সবাই কিচিরমিচির আওয়াজ তোলে। হঠাৎ আজকের স্থানটা এতটা ভিন্ন। খাবারের পাত্রগুলো এত ছোট ও সুন্দর। মা টিয়া পাখির বুঝতে বেগ পেতে হলো। এটি সেই দোকানের খাঁচা নয় খাঁচাটাও ছোট; পা যেন আটকে আটকে যায়।
কেমন ভয় ভয় অনুভূতি আসে, আলোগুলোও ভিন্ন। সাথে তাদের স্বজাতীয় ভাইবোন সবাই ভয়ে কান্না করে। কিন্তু মা টিয়া পাখি তাদের সাহস দিয়ে কোনো রকম কান্না থামালেন। সকাল হলো পাখিয়াল খাঁচা নিয়ে বের হলেন। খাঁচাগুলো কাছাকাছি হওয়ায় পাখিগুলো কথা আদান-প্রদান করতে লাগল। বলল সবাই জায়গাটা অচেনা। লোকটাও কেমন যেন অপরিচিত। পাখিয়ালের হাঁকডাক শোনে বুঝতে বাকি রইল না। অন্যত্রে বিক্রয়ের জন্য আনা হয়েছে। কী আর করা; তাদের তো এটিই জীবন! আজ এই দোকান তো কাল অন্যের বা কারো পৌষ্যে খাঁচায় আবদ্ধ জীবন। খাঁচা থেকে দূরে দেখে খোলা আকাশে দোয়েল, শালিক, কবুতর, টিয়া, চিল কত পাখি উড়ে যায়। তাদেরও ইচ্ছে জাগে মুক্ত আকাশে পাখা মেলতে। বদ্ধ জীবন যেন বেদনাময় প্রচণ্ড যন্ত্রণার। কিন্তু কাকে বলবে? দুপুর গড়ায় গড়ায়, খাঁচায় মা টিয়া, শালিক ও মুনিয়া তিন জোড়া পাখি আছে। বাকিগুলো বিক্রি হয়ে গেছে। হয়তো সন্ধ্যা হতে হতে আমাদেরও বিক্রি করে দেবে। এ সময় মা টিয়ার খুব করে মনে পড়ছে তার প্রিয় পাখিটির কথা। কী করে থাকবে একা! এ যেন খোলা আকাশে মুক্ত হয়ে ডানা মেলার চেয়েও ভয়ঙ্কর কষ্ট। একা এ জগতে জীবনের কোনো মূল্য নেই। একা কথাটা ভাবতেই কেন যেন হৃদয়ে ভয়ের কম্পন শুরু হচ্ছে।


এতক্ষণ সবাইকে সাহস জোগাল এখন সে নিজেই হু হু করে বুক জাপটে ধরে কান্না করছে। তার কান্নায় আকাশ বাতাস প্রকম্পিত করছে। পাখিয়ালও অবাক হঠাৎ কী হলো পাখির ডাক এহেন পরিবর্তন। কিছুক্ষণ বসে পড়ে পার্কের এক কোণে। ওখান থেকে ডাক পাড়তে লাগল এই যে পাখি নিয়ে যান, পাখি নিয়ে যান, রঙ বাহারি পাখি আছে, টিয়া আছে মুনিয়া আছে তোতা আছে পোষার জন্য ভালো হবে। সহজে পোষ মানবে, পোষ্য পাখি। বাসায় ছোট খোকাখুকির অবসরে খেলার বন্ধু হবে। নিয়ে যান। অনেকে খাঁচার নিকট আসলেন দামে না হওয়ায় কিনলেন না। পার্কের ভেতর থেকে দু’জন আগন্তুক হেঁটে এলেন। এমন খাঁচা বন্দী পাখিগুলো দেখে কষ্ট পেলেন। পাখিয়ালকে বিভিন্নভাবে বোঝাতে লাগল। ছেড়ে দেয়ার পরমর্শ দেন। বন্য প্রাণী। খাঁচায় মানায় না। খাঁচা বন্দী রাখলে একসময় পাখির সঙ্কট হবে। বিলুপ্ত ঘটবে। পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। পাখি আমাদের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে, পরিবেশে গাছ রোপণ করে, পরাগায়ন ঘটায়। বিভিন্ন জলাশয়ে মাছ চাষ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পাখি উপকারী বন্ধু। পাখিয়াল বিষয়টি বুঝতে পারে তিনিও ছেড়ে দেয়ার জন্য উদ্যত হন কিন্তু পারলেন না। পরিবারের দিকে তাকিয়ে তা করতে পারলেন না।
পাখিগুলো পাখিয়াল ও দুই আগন্তুক দুই হাতে ধরে উড়িয়ে দিলেন। বললেন যা ওড়ে, আজ হতে মুক্ত পৃথিবীর আকাশ তোদের। মা পাখিটা মনে মনে বলল, এমন মানুষের জন্য হয়তো পৃথিবীটা আজো সুন্দর। পরোক্ষণে তার চোখ জলে টলোমলো করে! প্রিয়জন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া কী যে ব্যথা! ব্যথা বুকে চেপে নিয়ে সে রাতেই বেলারুশের রোডে চলে আসে। সেই চিরচেনা শিমুল গাছে মা পাখিটা নির্বাক হয়ে বসে রয়েছে। কখন জানি কোন পাখিয়াল নিয়ে যাবে। কোন প্রকৃত পাখিপ্রেমী দুই আগন্তুকের মতো তার প্রিয়জনকেও মুক্ত করবে সে আশায় এখনো শিমুল গাছে অপেক্ষায় থাকে রোজ।