সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব হিসেবে এ পৃথিবীতে আগমন মানুষের। আসা আর যাওয়ার মধ্যবর্তী সময়টিই মানুষের জীবন। বিশ্বাসকে পুঁজি করে সততাকে বুকে ধারণ করলে জীবন হয় আনন্দের। সন্তুষ্টির। কিন্তু আমরা তা করতে কতটা পারছি। আদৌ কি পারছি। বর্তমান যে সময় আমি আমরা পার করছি, তাতে আনন্দ শব্দটি ডুমুরের ফুল হয়ে উঠেছে। একে খুঁজতে হয়। পিছু ছুটতে হয়। তবুও যেন মেলে না এর সাক্ষাৎ। কিন্তু কেন? এ প্রশ্ন নিজেকেই করি। বুকের কোথায় যেন চিনচিন করে ওঠে। আমরা কি পারছি জীবনকে তেমন করে গুছিয়ে নিতে। কিন্তু জানতে হয় কেমন করে গোছাতে হবে জীবন। কি সে পদক্ষেপ যা জীবনকে আনন্দের দুয়ারে নিয়ে যাবে। সন্তুষ্টি ও স্বচ্ছতায় মোড়ানো জীবন হবে ভালোবাসার। ধনী থেকে দরিদ্র প্রত্যেকের কাছেই জীবন অতি গুরুত্বপূর্ণ। অতি গুরুত্বপূর্ণ জীবনকে কেমন করে সাজানো যায়। কেমন করে পথ তৈরি হবে যা শুধুই পরিতৃপ্তির স্বাদ দেবে। বঞ্চনা যন্ত্রণা কষ্ট সবই দূর হবে। জাগতিক এই জীবনে সত্য ও মিথ্যা দুই-ই পাশাপাশি বাস করে। সত্যকে সত্য জেনেও কখনো কখনো পিছু হটতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠে সত্যকে বুকে ধারণ করা ব্যক্তি যখন মিথ্যাকে গ্রহণ করে। এটিই জীবনের পরীক্ষা। কঠিন থেকে কঠিন পরিস্থিতির মোকাবেলায়ও যারা সত্য থেকে এক চুল নড়ে না। কষ্টের মহাসমুদ্রে পতিত হবে জেনেও সত্যকে আঁকড়ে ধরে। তারাই জীবন সমুদ্রে দৃঢ়তায় টিকে থাকে। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি কর্ম তার সততার চিহ্ন প্রকাশ করে। ফলে সমাজের আদর্শ একজন হয়ে উঠতে কোনোরূপ বেগ পেতে হয় না।
কিছু সত্য যা প্রকাশ করাতেও ঘটে বিপত্তি। মন খুলে কথা বলা যায় না। বর্তমান সমাজের দিকে যখন তাকাই কি দেখি। দেখি কেমন করে আমরা নিজেকেই প্রাধান্য দেয়ার চেষ্টায় রত। কাউকেই গণ্য করার প্রয়োজন অনুভব করছি না। কাউকে সম্মান দেয়া থেকে বিরত। আমরা কেন ভুলে যাই আমরা যা কিছুই করি বা করছি সবই নিজের জন্য। আমি যদি আজ আমাকেই সম্মান দেয়ার পথরোধ করি, তাহলে আগামীকাল আমার জন্য কিসের প্রতীক্ষায় রত। মানুষ হিসেবে সৃষ্টিকর্তা আমাদের যে মর্যাদা দান করেছেন তা কি কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি? পারি না। যদি নাই পারি, কেন তবে সাময়িক নিজের কিছু স্বার্থকে বড় করতে গিয়ে নিজেকেই অপমানিত অবহেলিত করি; বরং কঠিন সময়ের শিক্ষা এটিই হওয়া উচিত যে, পরস্পর পরস্পরের কাজে নিবেদিত থাকা। উল্টো চিত্রেরই দেখা মেলে আজকাল। কেউ চোখের সামনেই সমস্যায় জর্জরিত। তবুও পাশ কাটিয়ে চলে যাই। কত সহজেই মনকে বেঁধে রেখে চলা শিখেছি। অন্যের কষ্ট দেখে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সত্যিই কি আমরা ভালো আছি। বেলাশেষে আমাদের হৃদয় কি আনন্দিত হচ্ছে। হচ্ছে না, হতে পারে না। নিজের চিন্তায় মশগুল থাকা মন কখনো পরিতৃপ্তি পায় না। আধুনিক ফারসি কবিতার জনক বলা হয় নিমা ইউশিজকে। তাঁর ‘হে মানুষেরা’ নামক কবিতায় তিনি আক্ষেপ করে বলেন, মানবসন্তানেরা!/হে মানবসন্তানেরা! যারা কিনারায় বসে আছো আনন্দে/অসহায় এক ব্যক্তি জীবন দিচ্ছে/যার হাত, পা ক্রমাগত ঝড়ছে বাঁচার তাগিদে/এই দরিয়া অত্যন্ত গতিসম্পন্ন, অন্ধকার গভীর যা তুমি জানো/তখন তুমি দুশমনকে ধরতে পারবে এ চিন্তায় মত্ত হয়ে আছো/ঐ সময় অতিক্রান্ত হচ্ছে, তুমি ধারণা করে যাচ্ছ, যেখানে চিন্তার কোনো সারমর্ম নেই। অথচ তুমি ধরেছ, ধারণা করেছ অক্ষম, অসমর্থ বিষয়কে তুমি অবলম্বন করেছ/এবং এ চিন্তায়ই কাজটি করছ যে তোমার উত্তম অবস্থা আসবে।’

পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত কিছু চাওয়া থাকে। এই চাওয়াকে ঘিরেই আবর্তিত হয় স্বপ্ন। স্বপ্নরা পাওয়ার তৃষ্ণাকে প্রলুব্ধ করে তোলে। সুখ-সম্পদ-প্রতিষ্ঠা পেতে মানুষকে সংগ্রামী হতে হয়। এখানেই শিক্ষা সততার। প্রয়োজন সঠিক উপলব্ধির। মানুষ আক্ষরিক অর্থে স্বাধীন। কিন্তু আবার নির্দিষ্ট একটি বাঁধনে আবদ্ধ তাদের জীবন। কারণ ধনী থেকে দরিদ্রের পথ একটিই। চাওয়া-পাওয়াগুলো একই সুতোয় বাঁধা। কেউ বেশি বেশি পাচ্ছে। কেউ অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। এই তো জীবন। এই জীবনকে গতিশীল রাখতে সমাজের উল্লেøখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। মানুষের জীবন মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বেড়াজালে আবৃত। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমাজকে ঘিরেই এর অনুবর্তন। উন্নত সমাজের চিত্র আর অধঃপতিত সমাজের প্রতিকৃতি কখনো এক নয়। মানুষকে আশাবাদী হতে হয়। কারণ প্রতিটি পথ এগিয়ে চলে ভবিষ্যতের দিকে। চলতে চলতে মানুষ যেমনটি হয় স্বাপ্নিক। তেমনিই দেখা মেলে লোভী হওয়ার চিত্রও। এই লোভের শক্তি অনেক। কারণ তৃপ্তির সীমারেখা টানা জানতে হয়। না হলে মানুষ থেকে বড় হয়ে উঠে মানুষের লোভ। সুখী হতে সবাই চায়। কিন্তু পথের খোঁজ মেলে না। না পাওয়ার কারণ একটিই। তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে হয়। অল্পে তুষ্টি থাকা শিখতে হয়। প্রতিটি কাজকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করতে হয় এবং কাজের সাথে কথার সমন্বয় রাখতে হয়। সত্যকে সত্য হিসেবে মানতে হয়। তবেই সুখ এসে ধরা দেবে। কতই না সহজ। শুধু নির্লোভ হতে হবে। ব্যাস। এটুকুই পারি না। কেন যে পারি না।

আজ যখন প্রযুক্তিগতভাবে জীবন এগিয়ে যাচ্ছে। সর্বত্র গতিশীলতা দৃষ্টি কাড়ছে। তখন সমাজের অনৈতিকতা সমন্বয়হীনতা দারুণভাবে হতাশ করছে। এ বাতাস যেন সর্বত্র সয়লাব। সব জায়গায় তাদের অবস্থান। রক্তপ্রবাহ যেমন শরীরকে কার্যকর গতিশীল রাখে, তেমনি সততার যে শক্তি তা মানবজীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে। দিকনির্দেশনা দেয়। সঠিক পথের দিশা দেয়। অন্ধকার থেকে টেনে তোলে আলোর শিকায়। সমাজের মানুষের মধ্যে সততার অভাবে জীবন আজ হুমকির সম্মুখীন। সুখ যেন সোনার হরিণ। কারণ বেঁচে থাকলেই তো সুখী হবো। বেঁচে থাকার জন্য চাই খাবার। চাই সুস্থ পরিবেশ। বর্তমান খাবারে ভেজালের যে চিত্র দেখতে পাচ্ছি তা বোধকরি বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমরা লোভের কাছে এতটাই বিক্রি হয়ে পড়েছি যে, ভুলে যাচ্ছি এই খাবার আমাকেও খেতে হচ্ছে। আমার কলিজার টুকরো সন্তানরাও খাচ্ছে। শিশুখাদ্য থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে ভেজালের বিপুল সমারোহ। খুঁজে পেতেও পাওয়া যায় না কোনো বিশুদ্ধ খাবার। ফলে জটিল রোগ বাসা বাঁধছে শরীরে। কর্মে অক্ষম হয়ে পড়ছে অনেকেই। সম্প্রতি আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বেরিয়ে আসে, দেশের প্রায় সব খাবারে মিশে আছে বিষ। ভেজাল খাবারে ছেয়ে গেছে বাজার। বলছে সবাই। দেখছেও। কিন্তু এই পরিস্থিতির প্রতিকার কিভাবে। ভাবনার সময় কোথায়। কে করবে এর প্রতিকার। এই ধ্বংসযজ্ঞ কি এভাবেই চলবে। একে একে নিভে যাবে আশা-আকাক্সক্ষা। কি করতে হবে। কোথায় যেতে হবে। এমন পথ কি কারো জানা আছে। নেই কোথাও কোনো জবাবদিহিতার আয়োজন। বিবেক আজ ঘুমন্ত। অদৃশ্য শক্তির কাছে সবই যেন বন্দী।

বিশ্ব আজ কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। চারিদিকে অসন্তোষের হাহাকার। মানুষের কষ্ট আজ সর্বত্র। বেঁচে থাকার তাগিদে সামান্য প্রয়োজন পূরণে দিশেহারা। এ কোন সময়ে আজ আমরা দাঁড়িয়ে। এ কেমন অস্থিরতা। চাকরি থেকে ব্যবসায়- কোনো জায়গায়ই অবশিষ্ট নেই। বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি। মানসিক ভারসাম্যহীনতাও দেখা যাচ্ছে। আয়ের উৎসগুলো ক্রমান্বয়ে কমে আসছে। আশার কোনো আলো চোখে পড়ছে না। এ নিয়ে ভাবনার এবং কিছু করার সময় এখনই। করোনাকালীন বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলা করে আজ যখন শান্তির নিঃশ্বাস নেয়ার সময় তখনই চারিদিকের অনিয়ম-দুর্নীতি মানুষকে নিষ্পেষিত করে তুলছে। জিনিসপত্রের ঊর্ধ্বগামী মানুষকে অসহায় করে তুলছে। থাকছে না কোনো বাধানিষেধ। কেউ মানছে না কোনো আইন। বেঁচে থাকার যুদ্ধে ক্লান্ত সবাই। হাঁপিয়ে উঠেছে জীবনের প্রয়োজনে। অপর দিকে, প্রযুক্তির ব্যবহারিক উপকারিতা আমরা কতটা নিতে পারছি; বরং আরো বেশি মিথ্যার কাছে নত হচ্ছি। এই সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও উন্নত জীবনের তরে সত্য গ্রহণ অপরিহার্য। সত্য চিরকালই সত্য। ন্যায়ের অবস্থানও তাই। অনিয়ম-উচ্ছৃঙ্খল জীবনে অভ্যস্ত ব্যক্তিরাও সত্যের মাহাত্ম্য স্বীকার করে নেয় নির্দ্বিধায়। মানবজীবনের সর্বোচ্চ ধাপ এটি। একে অস্বীকার করা যায় না। এটি সত্য এ পথের সংখ্যা অনেক কম। কিন্তু তাতে করে সত্য কোনোভাবেই মিথ্যা হয়ে যাবে না। সত্য অবধারিত সত্যই থেকে যাবে। এই পথই নিয়ে যায় সাফল্যের দুয়ারে।

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। এটি সবাই জানি। পড়েছি। কিন্তু এখন এটি শুধুই একটি বাক্য। এক জায়গায় থেকেও বলছি নেই। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্রই চলছে স্ক্রিন টাইম পাস। শিশুরা মুখস্থনির্ভর জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। অনায়াসে মিথ্যা বলছে। একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে নেই বাস্তবজীবন-নির্ভর অভিজ্ঞতা। সময় অসময়ে শুধুই স্ক্রিন-নির্ভর জীবন চালনা করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভয়াবহ বার্তা। আগামীর ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে। সমাজের এই চিত্র নতুন কিছু নয়। এটি যুগের নিয়ম। এ থেকে নতুন প্রাণসঞ্চারই হচ্ছে সৃষ্টিশীল মানুষের কাজ। সজীব বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। একটি উন্নয়নশীল জাতি পেতে হলে যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপের বিকল্প নেই। সময় বড় কঠিন। সে কারো জন্যই থেমে থাকে না। কারো কথা মানে না। বয়ে চলাই তার রীতি। তাই সময়কে মূল্যায়ন করা জরুরি। আল্লামা ইকবাল সবসময়ই যুবকদের উৎসাহিত করেছেন। বলেছেন, একমাত্র যুবসম্প্রদায়ই পারে একটি জাতি একটি দেশকে উন্নতির শিখরে পৌঁছে দিতে। সমাজের বিশৃঙ্খলতা দূর করতে যুবসমাজই এগিয়ে আসতে পারে। আমরা অনেক সহজেই মানুষের গোলামি করি। সাময়িক প্রাপ্তির লোভে অন্ধ হয়ে যাই। প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠতে পারি না। অথচ একজন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর জন্য গোলামি পরিহার করা একান্ত প্রয়োজন। আল্লøামা ইকবাল তাঁর কবিতায় গোলামি পরিহার করে যুবকদের উৎসাহিত করে বলেন, ‘মানুষ অজ্ঞতাবশত মানুষের গোলামি করে/মূল্যবান রতœভাণ্ডার ছিল কিন্তু তা বাদশাহ জামশিদ ও কায়কোবাদের কাছে সঁপে দিয়েছে/অর্থাৎ গোলামি স্বভাবের কারণে কুকুরের চেয়ে নিকৃষ্টতরে উপনীত হয়েছে/আমি দেখিনি একটি কুকুরকে অপর একটি কুকুরের কাছে মাথা নত করতে।’