আসাদ চৌধুরী
প্রতিদান দেবো

ক্ষতবিক্ষত পা দিগন্তে ছুঁতে পারেনি।
ছিল অস্পষ্টতা, ভুল বোঝাবুঝি ছিল, অজ্ঞতাও ছিল।
তৃষ্ণা ছিল দিগন্তের, অসীমের।
অসীমের সংজ্ঞার্থ নিয়ে বিজ্ঞানীর মতো আমিও ভেবেছি।

ব্যর্থতা নতুন কিছু নয়, আমার বেশ পরিচিত
আমি ওর স্বভাব-চরিত্র জানি।
এড়াতে চাইলেই কি সব এড়ানো যায়?
দিগন্ত দেখার জন্য আমি ছোটবেলায় পায়ে ফোস্কা নিয়ে
সাত মাইল দূরের নদী দেখতে যাইনি?
কাদা পেরোইনি?- যাকে বলে লোদ বা ভেদর।
আছাড়-পিছাড় খেতে-খেতে আমিও তো তুষার মাড়িয়ে এসেছি।

ব্যর্থতা হয়তো আমাকে একটু বেশি ভালোবাসে,
আমারই প্রতি ওর একতরফা পক্ষপাত আগেও দেখেছি।
দিগন্তকে বুকে নিয়ে আমি তার প্রতিদান দেবো।

 


মাহবুব হাসান
রক্ত ও নদী

পিঠে রোদ নিয়ে খেলা দেখছিলো তারা
হৃদয়ে ফুটছিলো তাদের শ্লোগানের তাপ,
সর্বহারা মানুষ! বলা যেতে পারে গো-হারা!
বেহুঁশ দঙ্গল, আমাদের পরম প্রকৃতির সন্তান
জড়ো হয়েছে প্রতিবাদের মিছিলে, শ্লোগানে,
ঠিক বন্দুকের উল্টো পিঠে যেন মানব বন্ধন!

টগবগে রোদ ফুটছিলো যেন শান্ত বুলেট
আর রক্তনেশায় ঝিম মেরে ঝুলছিলো বন্দুক
ফেরারী আসামির মতোন নিশ্চুপ সময়
ক্যামোফ্লাজ করে ছিলো নিরাপত্তা ছায়ার ভেতরে,
তারপর তামার ফুটো পয়সার মতো
ফুটো করলো জীবনানন্দ স্বাধীনতা মানুষের।

রক্ত আর রোদের এই হোলি জীবনভর
তরতরে ছিপ নাও যেন, পেয়েছিলাম আমরা
রক্তনদী টগবগে ১৯৭১, বিজয়ের
লাল সূর্য রক্তের নদী হয়ে উদিত হলো,
প্রাণের আনন্দ আমাদের নামলো নৌকা বাইচে,
দূরবালক বয়সের সেই জয় কি হলো মিছে?
বিজয় ছিনিয়ে নিয়ে গেলো ছায়ার ভেতরে
লুকিয়ে থাকা প্রেতাত্মা নীরব বন্দুক, তার রোখ
কে থামায়?
বিজয়ের দিগ্বিজয়ী নদী বেয়ে ভেসে যায় অগণিত লাশ

 


মাহমুদ কামাল
কিছুই হলো না

অনেক তো হলো
আসলে কিছুই হলো না
প্রতিটি কার্যকারণের উল্টো পিঠও আছে
আমাদের জীবনগল্পে এই সব
ফোটে বলে সব ফুল দীর্ঘস্থায়ী নয়
মুহূর্তে মুহূর্তে দ্রুত বেলা বেড়ে যায়
অসময়ে নানা প্রশ্ন ভিড় করে
প্রান্তসীমায় এসে মনে হয়
অনেক তো হলো
আসলে কিছুই হলো না।

 


রেজাউদ্দিন স্টালিন
গুরুত্বের সংজ্ঞা

মানুষের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণকে খোঁজা
আসলে কাকে বলে গুরুত্বপূর্ণ
আজ যা গুরুত্ববহ-কাল তা নি®প্রাণ পতঙ্গ
আজ সবুজ পত্রালি-কাল আগুনের আহার
নিভন্ত লণ্ঠনের চেয়ে আলো মূল্যবান
ঠোঁটের চেয়ে চুম্বন
পথের চেয়ে গন্তব্য
স্বপ্নের চেয়ে আকাক্সক্ষা

বয়স ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দেয় যৌবন
নদী হয়ে যায় বালির বন্ধু

একটা দিনের চেয়ে মুহূর্ত মূল্যবান
মন্দিরের চেয়ে প্রার্থনা
এবং অবশ্যই ইতিহাসের চেয়ে কবিতা

 


মুস্তফা হাবীব
অধিকার

ভোরের কা কা শব্দের ব্যঞ্জনায় কালো কাকগুলো
রোজ মানুষকে বিব্রত করে, তৈরি আইনের ফাঁদে ফেলে
দখলে রাখতে চায় জমকালো বিছানা।

পচা জলাশয়ে জন্ম নিয়ে পদ্মফোটা জলের কীর্তন গায়
সকাল-সন্ধ্যায় স্বেচ্ছাচারী-বিপথগামীদের
তর্জন গর্জন শুনে মানুষ শঙ্কিত, বাকরুদ্ধ- বিমূঢ়।

ওরা বিরাম চিহ্নের সত্যতা অস্বীকার করে,
চিরপতনের অগ্রিম সুর-সংকেত শুনেও অসত্য ধারায়
অবিশ্রাম উত্থানের ফানুস উড়ায় অনীল আকাশে।

মানুষ বুঝে গেছে এসবই ভেলকিবাজ,তখতে তাউস;
এখন একটাই নিঃশর্ত বাসনা
আঠারো উত্তীর্ণ প্রতিটি মানুষ প্রতিষ্ঠা করবে অধিকার;
মানুষ চায়, মাটির নির্যাসে সমান অংশীদারিত্ব
ফুলের বাগান থেকে তাড়াতে বিষাক্ত জলফড়িং।

আমিও চাই, সত্য ও সুন্দরের অনির্বাণ আভায়
আকাশ থেকে সরে যাক ভয়াল কালো অজগর।
আমিও চাই জনমানুষের নিরঙ্কুশ বিজয়ে স্বাধীন স্বদেশ।

 


মোশাররফ হোসেন খান
পান্থ

পথে পথে কেটে গেছে কত শত তমসিত রাত
নিগূঢ় আঁধার চিরে কেন যে আসেনি সূর্যালোক
নিঝুম অরণ্যে একা, হয়নি তো দেখা পূর্বালোক
অসীমে তাকিয়ে আছি, হয়তোবা আসবে প্রভাত।

সুদীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি ভুলে অবিরাম হেঁটে চলি
আঁধার বিদীর্ণ করে, হেঁটে যাই তৃষিত পথিক
সশঙ্ক হৃদয়ে নয়, শঙ্কাহীন, শৌর্যের অধিক
সঘন নিঃশ্বাস, তবু তপ্ত মরুভূমি পায়ে দলি।

ধুলোট পৃথিবী, মেঘাচ্ছন্ন নীলাকাশ, দ্যুতিহীন
মানুষ যাচ্ছে কোথায়? চোখ রাখি অনন্তের দিকে
ধসে যাচ্ছে কিভাবে পৃথিবী, ক্রমান্বয়ে হচ্ছে ফিকে
অথৈ শূন্যতার মাঝে ধূধূ বালিয়াড়ি, সীমাহীন।

পথ চলে যায় পথের ভেতরে তবু ক্রমাগত
নতুন পথের সন্ধানে হাঁটতে থাকি অবিশ্রান্ত।

 


শাশ্বত হাসান
গ্রহণ

কফিনের এক মাথায় ধরো
আমি এখানেই
আমাকে গ্রহণ করো হে মাটি
আমাকে নবায়ন করো
প্রিয়তমা।

কিছুদূর বহুদূর
বিরতিহীন।

 


আবু হেনা আবদুল আউয়াল
খেলা হবে

খেলা হবে
হুড়মুড় করে নামবে খেলায়
একে একে ক্যাপ্টেন রেফারি কোচ আর
ঝানু ঝানু খেলোয়াড় সব, খেলায় খেলায়
বেলা বয়ে যাবে রাতের গভীরে-
খেলা চলবে, চলতে থাকবে বেলা-অবেলায়
এ খেলার শেষ কোথায় কে জানে

খেলা হবে ঘরে ঘরে- ঘরের বাইরে
খেলা হবে পাড়া-মহল্লায় মাঠে-ময়দানে
খেলা হবে পথে পথে আল-পথে নারাক্ষেতে
খেলা হবে দশ দিগন্তের প্রতিটি প্রান্তরে
খেলা হবে ডানে বামে উত্তরে দক্ষিণে
খেলা হবে জলে স্থলে অন্তরীক্ষে
খেলা হবে তলে অতলে বিতলে রসাতলে
খেলা হবে সমতলে দুর্গম পাহাড়ে ঝর্ণাতলে

নিম্নচাপ ঘূর্র্ণিঝড়ে রূপ নিতে
হয়তো তেমন দেরি নেই, উত্তাল সাগর এসে
আছড়ে পড়বে কূলে-উপকূলে, অতঃপর
নিমিষেই খেলা শুরু হবে-
আতঙ্ক আশঙ্কা মনে সে খেলা কখন কী ঘটায়
এ কি খেলা? এ কী খেলা

 


নূরুল হক
পান করে মৃত্যুর আরক

এখন পড়ন্ত বেলা। ফিরে দেখি পেছনের দিন
মৃত্যু মৃত্যু খেলা আঁখি পটে ভাসে স্মৃতির কঙ্কাল
যারা ছিল খুব কাছে তারা আজ অতি অর্বাচীন
ছেড়ে যাব সবকিছু পড়ে রবে সুপ্ত মহাকাল।

তোমাকে কখনো আর ডাকিব না ইশারা ইঙ্গিতে
বিজয় নিশান আর উড়াব না সমরে সম্মুখে
হিমের আগুন বুঝি বহিবে না আসন্ন এ শীতে
যৌবনের কল্লোলিত ঢেউগুলো ভাঙ্গবে না বুকে।

আমার অর্জন বলে কিছু নেই শূন্যতায় ভরা
লেখাজোখা কল্প কথা অকর্মণ্য বাহক ধারক
ছিল না বসন্ত কভু। সারাবেলা সাহারার খরা
তবুও প্রসন্ন আছি। পান করে মৃত্যুর আরক
চলে যাব বেলা শেষে হাস্যোজ্জ্বল প্রভুর হুকুমে
প্রত্যাশা করিনা কোন দিনক্ষণ যদি থাকি ঘুমে

 


দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
স্মৃতি-গোলাপ

বিজয় দিবস এলে আমার শুধু শরণার্থী ক্যাম্পের
স্মৃতি গোলাপ মনে পড়ে।
আমি শুধু মনে মনে ভাবি
সেই উল্লøাসমুখর রাত্রির কথা।
সেদিন জেগেছিল সবাই- কেউ ঘুমায়নি।
সে এক অবাক রাত্রি-
আনন্দের সমারোহে পাড়াটা
গভীর রাত পর্যন্ত শান্তই হয়নি।
কোথাও সেøাগান জেগেছে উঁচু স্বরে
কোথাও ফুটেছে আলোর বাজি।
সে এক খোদাই করা রাত্রি
বুক থেকে মুছতে পারি না।
খবরটা শোনার সাথে সাথে
সবাই বেপরোয়া
যেন ছিঁড়ে আনবে এখুনি আকাশের তারা
হয়তো সেদিন ঝরেও পড়েছিল বহু তারা।
সে এক সুখের রাত্রি ছিল-
দিকে দিকে সুখ উড়ছিল ।
সেই সুখের প্রজাপতিগুলো আজো ওড়ে।

 


জামসেদ ওয়াজেদ
জল জাল তত্ত্ব

স্বদেশ তোমার জন্য বীরদের এই আগমন
এখন হেমন্ত ক্ষণে আমি শুনি ডাহুকের গান
কুয়াশা চাদরে ঢাকা আমাদের সবুজ বাগান
শহীদের এ বলয়ে মিশে আছে কত প্রিয়জন

অজানা কতক লোক চারপাশে করে ঘোরাঘুরি
আহারের আয়োজনে ব্যস্ততম শ্রমের বাজার
এ তথ্য উপাত্তহীনে বসবাস প্রজা ও রাজার
মেঘের সান্নিধ্য চেয়ে আমি তাই নীলাকাশে উড়ি

মাছের সাঁতার দেখে জেলে শিখে জল জাল তত্ত্ব
কৃষক নবান্ন ঘরে নেই আজ সেই উৎসব
অজাতি হারিয়ে ফেলে শুধু তার নিজস্ব গৌরব
নদীর গভীরে খোঁজে প্রিয় মাছ জলের মহত্ত্ব

স্মৃতির সকাল জুড়ে ফিরে আসে প্রিয় স্বাধীনতা
একদিন রয়ে যাবে ইতিহাসে আমাদের কথা

 


সৈয়দ রনো
আমার কবিতা

আমার কবিতা সীমান্তরক্ষী
বাংলাদেশের প্রতীক
আমার কবিতা ঝঞ্ঝা তুফানে
পথচলা এক পথিক।
আমার কবিতা ভুখানাঙ্গাদের
মুখে তুলে দেয় ভাত
আমার কবিতা লাখো শহীদের
মুষ্টিবদ্ধ হাত।
আমার কবিতা বিশ্বায়নের
স্বপ্নে তোলা ঝড়
আমার কবিতা দেশাত্মবোধে
ভীষণ শক্তিধর।
আমার কবিতা মুক্তিসেনার
বুলেট বিদ্ধ খুলি
আমার কবিতা ভয় করেনি
এটম বোম আর গুলি।
আমার কবিতা গণতন্ত্রমনা
লাল সবুজের ছবি
আমার কবিতা অগ্নিমিছিল
রাজপথের এক কবি।
আমার কবিতা ফেলানীর লাশ
সাগর-রুনির মা
আমার কবিতা বিশ্বজিতের
মায়ের বুকের ঘা।
আমার কবিতা বন্দী এখন
বিশ্বায়নের হাতে
আমার কবিতা চেটেপুটে খায়
হায়েনারা সব রাতে।