এবারের মহান বিজয় দিবসটি এমন এক সময় আমরা উদযাপন করছি যখন সারা বিশ্বময় অর্থনৈতিক মন্দা বিরাজ করছে, পরোক্ষভাবে বিশ্বের দুই পরাশক্তির পেশির লড়াই অব্যাহত রয়েছে। পুরো বিশ্বে বিরাজমান এরকম নানান সঙ্কটের পাশাপাশি আমাদের দেশের কিছু দুর্বৃত্তের সিন্ডিকেট কারসাজিতে দেশের দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন চরম ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ জনমনে নাভিশ্বাস বিরাজ করছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশ- দেশের প্রায় ৪৪ শতাংশ মানুষ তাদের পরিবারের খাদ্যের চাহিদা জোগান দিতে ভিটেমাটি বিক্রি তথা আপৎকালের জন্য জমিয়ে রাখা শেষ সম্বল খরচ করতেও বাধ্য হচ্ছে। দেশের আপামর জনগণকে জিম্মি করে এসব মানুষ নামধারী অমানুষদের সিন্ডিকেট বাণিজ্য করে রাতারাতি টাকার কুমির হওয়ার জন্য নিশ্চয় আমাদের উত্তরসূরিরা জীবন বলিদান করে দেশটি স্বাধীন করেননি।
পাকিস্তানি জুুলুমবাজ শাসকদের লেজ গুটিয়ে স্বর্ণভূমি বাংলা ছাড়ার সাত বছর পর আমার জন্ম। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও সে বছর ডিসেম্বরের বাঙালির ঐতিহাসিক বিজয়োল্লøাস আমি স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করতে না পারলেও সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ের করুণ আর্তি, মাতৃভূমি রক্ষার্থে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান, অগণিত সরলা-সাধবী মা-বোনের সম্ভ্রমহানি-আর্তনাদ, সর্বোপরি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমাকে প্রতিনিয়ত অনুরণিত করে। পথ দেখায় সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার মিছিলে একজন দেশপ্রেমিক কর্মী হওয়ার মন্ত্রে দীক্ষা নেয়ার। তার সাথে দিবা-রাত্র স্বপ্ন দেখায় এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের প্রিয়তম মাতৃভূমি বাংলাদেশের স্বাধীনতা রক্ষায় স্বাধীন বাংলাদেশের একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে সদাজাগ্রত এক বীর-সেনানীর বেশে এগিয়ে যাওয়ার।
ডিসেম্বর মাস আমাদের বিজয়ের মাস। আজ থেকে ৫১ বছর আগে এ মাসেই আমরা পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছিলাম। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আমাদের যুদ্ধটা কিন্তু হঠাৎ করেই শুরু হয়নি। এই যুদ্ধ ছিল আমাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন, স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতি। বাঙালির প্রেরণার উৎস গৌরবময় এ বিজয় দিবস বর্তমানে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এবং বাঙালির জীবন চেতনায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ বিজয়ের অনুপ্রেরণা থেকে বাঙালির আজকের দীর্ঘ পথচলা, যাবতীয় অর্জন ও সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় চেতনা।


পৃথিবীর সব স্বাধীন দেশের স্বাধীনতা দিবস থাকলেও সাধারণত বিজয় দিবস থাকে না। বাংলাদেশ সেই বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী দেশ, যেটি ২৪ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের পর রণাঙ্গনে শত্রুকে পরাজিত করে বিজয় অর্জন করেছে। যে বিজয় বিশ্ব দরবারে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে করেছে মহিমান্বিত।
১৬ ডিসেম্বর তথা মহান বিজয় দিবস বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। আর এ অর্জন একদিনে সম্ভব হয়নি। এর জন্য বাঙালি জাতির ছিল অপরিসীম ত্যাগ-তিতিক্ষা, সুদীর্ঘ তপস্যা ও নিরলস সাধনা। এ সাধনার কাণ্ডারি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আর তাঁর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছিল সাড়ে সাত কোটি মুক্তিকামী জনতা। যুগ যুগ ধরে বাঙালি স্বপ্ন দেখেছে নিজেদের একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র কায়েমের। প্রায় ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অপরিমেয় ক্ষয়ক্ষতি ও অগণিত জীবনের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। তাই ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় কোনো সাধারণ বিজয় নয়, এটি আমাদের রক্তে রঞ্জিত চেতনার বিজয়, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের বিজয়। তাই এই বিজয় আমাদের প্রেরণার উৎস; যার জন্য আমরা বাঙালি হিসেবে গৌরববোধ করে থাকি। ১৯৫৭ সালে পলাশীর আম্র্রকাননে স্বাধীনতার যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল সেটির পুনরোদয় ঘটে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। জাতির শ্রেষ্ঠ গৌরব, অহঙ্কার ও আনন্দ উজ্জ্বলতার সাক্ষ্য বহনকারী একটি অনন্য দিন এটি। ১৯৭১ সালের এই বিশেষ দিনটিতে ২৬ মার্চ ১৯৭১-এ সূচিত মহান মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা মিত্রবাহিনীর সক্রিয় সহযোগিতায় শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করে এ বিজয় ছিনিয়ে আনে।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত গেছে আমাদের গণজাগরণের ও গণআন্দোলনের কাল। তারপর ইতিহাসের প্রকৃতি বদলে যায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গণজাগরণ ও গণআন্দোলনের মৌলিক প্রকৃতিও বদলায়নি। এই সুদীর্ঘ আন্দোলন ও গণজাগরণের কালে সংগ্রামমুখর ছিল রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে, জমিদারি প্রথার বিলোপ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, অত্যাচার-নির্যাতনের বিষয়ে। এসব গণআন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন- দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাস বসু, বিপিন চন্দ্র পাল, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, কমরেড মণি সিংহ, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ।


আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম মূলত শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সূত্র ধরে। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এ দেশে এক যুগান্তকারী রেনেসাঁর সূচনা হয়েছিল। উন্মেষ ঘটেছিল এক নতুন বাঙলি জাতীয় চেতনার। এই চেতনা প্রতিফলিত হয়েছিল আমাদের রাজনীতিতে।
বাঙালির শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস সুদীর্ঘ। ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসনকালে বাঙালি রক্ত দিয়েছে। লড়াই করেছে শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে। সোয়া দুই শ’ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম ও লড়াইয়ে রক্ত দিয়েছে এই বাঙালি জাতি। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনেও ছিল বাঙালিদের বিশেষ অবদান। বাঙালিরাই ছিলেন পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল কারিগর। কিন্তু কয়েক বছরেই বাঙালির স্বপ্নভঙ্গ হয়। যে শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে তারা ইংরেজদের বিতাড়িত করেছিল সেই একই রকম শোষণ বঞ্চনার মুখোমুখি হয়ে পড়ে কয়েক বছরের মধ্যেই। শুরু হয় সংগ্রামের নতুন যুগ। পাকিস্তানিরা এ ভূখণ্ডের জনসাধারণকে তাদের অধীনস্থ আজ্ঞাবহ মনে করত। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সর্ব ক্ষেত্রেই তারা বঞ্চিত করত নিরীহ বাঙালিদের। এমনকি নির্বাচনে বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও তা তারা মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ’৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-এর ঐতিহাসিক ছয় দফা, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর ৭ মার্চ স্বাধীনতার প্রেরণাদায়ী বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালি জাতির মনে বয়ে আনে অন্য এক প্রেরণা, জাগিয়ে তোলে মুক্তির উন্মাদনা। সূচনা ঘটে বাংলাদেশের মহান বিজয়, জন্ম হয় একটি স্বাধীন দেশের, সোনার বাংলা খ্যাত দেশটির নাম হয় বাংলাদেশ।
মহান এই বিজয়ের মাসে প্রত্যাশা একটাই, যে আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে ৩০ লাখ তাজা প্রাণ তাদের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের সেই কাক্সিক্ষত সোনার বাংলা গড়তে সব মত-পথ ভুলে সবাইকে একযোগে দেশের স্বার্থে কাজ করতে হবে। নিজের স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বার্থকে অবশ্যই বড় করে দেখতে হবে। দেশ থেকে দুর্নীতি, মজুদদারি, কালোবাজারির মূলোৎপাটন অবশ্যই করতে হবে। তা হলেই না আগত প্রজন্ম একটি সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার হিসেবে পাবে অগ্রজদের কাছ থেকে।