আমরা ১৯৭১ সালে বিজয় অর্জন করেছি। আমাদের বিজয় অর্জনের পাঁচ দশক পূর্ণ হয়েছে। আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ভূখণ্ড পেয়েছি। একটি লাল সবুজ পতাকা পেয়েছি। একটি পার্লামেন্ট ও সংবিধান পেয়েছি। আমাদের অর্থনীতিতে বেশ উন্নতি সাধিত হয়েছে। কৃষিতে উন্নতির ফলে উত্তরের মঙ্গাকে আমরা জয় করতে পেরেছি। দক্ষিণের বেলে মাটিতে আমরা সোনালি মাঠ উপহার দিয়েছি। দেশের অবকাঠামোগত ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছি। আমরা বিশ^মানের সেতু নির্মাণ করে বিশ^কে তাক লাগিয়ে দিয়েছি। আমরা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাফল্য লাভ করেছি। তৈরী পোশাক শিল্পে বলতে গেলে আমরা বিপ্লব সাধন করেছি। আমাদের জীবন মানের যথেষ্ট উন্নতি ঘটেছে। দৈনন্দিন কাজের অনেকাংশই আমরা প্রযুক্তিনির্ভর করে ফেলেছি। শিক্ষায় আমাদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। ’৭১ সালে আমাদের দেশে মাত্র ৩টি বিশ^বিদ্যালয় ছিল। বর্তমানে সে সংখ্যাটিকে আমরা ৫৮টিতে উন্নীত করেছি! ’৭১ সালের বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একটি সুন্দর প্লাটফর্মে দাঁড় করিয়েছি। ইতোমধ্যে আমরা উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় নামও লিখিয়েছি। এখন আমরা উন্নত রাষ্ট্র গঠন করতে অবিরাম পরিশ্রম করে যাচ্ছি। ‘নাই নাই অবস্থা থেকে আমরা এখন নানা প্রাপ্তিতে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছি। তবে ভাববার ব্যাপার হলো, আমরা একটা জায়গায় তিমিরেই রয়ে গেছি। যে চেতনা নিয়ে আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম সে চেতনাকে জলাঞ্জলি দিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধে লালিত সেই চেতনাকে আমরা বাস্তবায়ন করতে পারিনি। যদিও বিগত ৫০ বছর ধরে দেশটি মুক্তিযোদ্ধারাই শাসন করেছেন। দীর্ঘ এতদিনেও দেশটিকে আমরা একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে পারিনি। আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম। বাংলার গণমানুষের মুক্তির জন্যই স্থায়ী হয়েছিল দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারের জন্যই ৩০ লাখ বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ উৎসর্গ করেছিল।
কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্রের ধারণাই পাল্টে গিয়েছে। আমরা গণতন্ত্রকে হাস্যকর বস্তু বানিয়ে ফেলেছি। আমাদের রাজনীতিবিদগণ গণতন্ত্র বিনিয়োগ করে অর্থ উপার্জন করে চলেছেন। অথচ গণতন্ত্র হলো একটি রাষ্ট্রে বিরাজিত সামগ্রিক এক আদর্শের নাম। যা সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের সর্বত্রই বিকশিত হবার দাবি রাখে। কিন্তু সেটাকে আমরা আজ শুধু নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে ফেলেছি। আর বর্তমানে সে নির্বাচনটাকেও ধ্বংস করে ফেলেছি। আমরা ’৭১-এ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করেছিলাম। কারণ তারা আমাদের সার্বিকভাবে বঞ্চিত করে রেখেছিল। আজও তাদেরকে আমরা ঘৃণার চোখেই দেখে থাকি। কিন্তু আমরা সবাই জানি, তাদের অধীনেই ১৯৭০ সালে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, সে নির্বাচনটি শতভাগ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছিল। আর সেই নির্বাচনে বর্তমান আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল। পাকিস্তানি স্বৈরাচারী জান্তাদের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সুষ্ঠু হলেও আমাদের নির্বাচন আমরা সুষ্ঠুভাবে করতে পারছি না। জাতি হিসেবে এর চেয়ে লজ্জার আর কী থাকতে পারে! আমরা আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা ধ্বংস করেছি। জনগণের ভোটাধিকার বিলুপ্ত করেছি। আমাদের গণতন্ত্রকে এখন লুটপাটতন্ত্রে পরিণত করেছি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে পৈতৃক সম্পদ মনে করে নিয়েছি। আর সেই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে আমরা সম্পদের পাহাড় গড়েছি। সম্পদের মালিক হতে রাষ্ট্রক্ষমতাকে জোর করে দখল করে রেখেছি। অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ ভাগবাটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছি। আমরা গণতন্ত্র ধ্বংসের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক সব প্রতিষ্ঠানকেও ধ্বংস করে ফেলেছি। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করতে আমরা গুম ও খুনের সংস্কৃতি চালু করেছি। মানবাধিকার খর্ব করেছি। এক কথায় বলতে গেলে, গণতন্ত্রকে আমরা গলাটিপে হত্যা করেছি। দেশ থেকে এক দিকে গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়েছে। অন্য দিকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার কবরস্থ হয়েছে। ফলে দেশ আজ গভীর সঙ্কটে নিপতিত হয়েছে। তথাপিও রাজনীতিবিদদের গলাবাজি চলমান রয়েছে। ক্রমেই রাজনৈতিক মাফিয়াদের অসভ্য চেহারা ভয়ঙ্কররূপে প্রকাশ পাচ্ছে। ‘নাই নাই খাই খাই’ অবস্থা তাদেরকে সার্বক্ষণিকভাবে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সময় যেন তাদের কাছ থেকে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। তারা দ্রুত বড় লোক হবার নেশায় আখের গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছে। করোনার অর্থনৈতিক দুঃসময়েও তারা বিত্ত-বৈভব বৃদ্ধি করেছে। এ সময়ে দেশে ছয় হাজার নতুন কোটিপতির জন্ম হয়েছে। নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে তারা বিদেশে বাড়ি তৈরি করছে। ক্ষমতাসীনরা পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে। কৃষক, শ্রমিক আর মজুররা বরাবরের মতো উপেক্ষিত থেকেই চলেছে। গত ১৪ বছরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ করেছে। ক্ষমতাসীনরা সাধারণ জনগণের কথা বেমালুম ভুলে গেছে।
দেশীয় গণতন্ত্র ধ্বংস হবার পাশাপাশি নিজ দলীয় অভ্যন্তরেও গণতন্ত্র ধ্বংস হয়ে গেছে। দেশ ও দলে গণতন্ত্র চর্চার পরিবর্তে পরিবারতন্ত্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। দলীয় পদে নমিনেশন পেতে কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দেয়া লাগছে। টাকার বিনিময়ে পদে আসীন হয়ে নেতাজি টাকার নেশায় হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ছেন। দ্রুত প্রদত্ত ঘুষের টাকা উসুল করতে নেতাজি বেপরোয়া হয়ে পড়ছেন। এসব নীতিহীন ব্যক্তিরাই আবার প্রতিদিন আমাদেরকে সততার নসিহত করে চলেছেন। তারাই আবার গণতন্ত্রের প্রবক্তা সেজে গণতন্ত্রের ফেরি করে বেড়াচ্ছেন! এতসব কারণে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাস্তবিকই আমরা গণতন্ত্রের গায়ে এক কালো ছায়া লেপটে দিয়েছি সেই বহুদিন আগেই। আজ পর্যন্ত সেই কালো ছায়াকে কেউ মুছে দিতে পারিনি। গণতন্ত্রের উক্ত কালো ছায়াকে সঙ্গে নিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। সঙ্গত কারণেই সাধারণ মানুষের এখন আর রাজনীতিকদের প্রতি ন্যূনতম কোনো আগ্রহ নেই। দেশে একজন রাজনীতিক মানেই অনৈতিক ক্ষমতাধর, রাজনৈতিক মাফিয়া ও পেশিশক্তির অধিকারী। রাজনীতি মানেই হলো চাপাবাজি, ধান্ধাবাজি ও ভোটচুরি। রাজনীতি মানেই হলো জোর-জালিয়াতি করে ক্ষমতায় যাওয়া। সাধারণ জনগণের সম্পদ লুটপাট করে বড় লোক হওয়া। এ কারণে সাধারণ জনগণ রাজনীতিকদের থেকে আজ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ভোটের ব্যাপারে তারা একবারেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে। তারা তাদের ভোট প্রয়োগ করা থেকে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছে। যেকোনো দেশে যখন এমন অবস্থা চলতে থাকে এবং স্থায়ী হয় তখন বুঝতে হবে, রাষ্ট্রটি লক্ষ্যহীন উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে দেশটি তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না। সুতরাং বলাই যায় যে, বর্তমান বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির সর্বাঙ্গে ঘুণ ধরেছে।
বিগত দুই বছর করোনা মহামারী বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে দুমড়ে মুচড়ে দিয়েছে। তদুপরি ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধ ইউরোপের মতো বাংলাদেশকেও নাড়িয়ে দিচ্ছে। যুদ্ধ অধিক দীর্ঘ হলে দেশের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়বে। দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি তার গতিপথ হারিয়ে ফেলবে। প্রধানমন্ত্রীর মুখে সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষের ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। ২০২৩ সাল যত কাছে আসবে দেশের সামগ্রিক অস্থিরতা ততই বৃদ্ধি পাবে। ইতোমধ্যে অস্থিরতা সৃষ্টিও হয়েছে। সরকার ও বিরোধী দলের বক্তব্যে সব প্রকার রাজনৈতিক শিষ্টাচার ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। দেশের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার অবশ্য অনেক আগেই হারিয়ে গেছে। রাজনীতির মাঠে ‘খেলা পাল্টা খেলা’র মতো অশোভন ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। যদিও দেশের রাজনীতিকদের মুখে এ জাতীয় ভাষা ব্যবহার নতুন নয়। তবে ২০২৩ সালের নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সব পক্ষই তাদের শিষ্টাচারহীন বক্তব্য বৃদ্ধি করছে। ক্ষমতায় যেতে ও থাকতে একে অপরে কাণ্ডজ্ঞানহীন বক্তব্য প্রদান শুরু করছে। এ কথা আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিগত প্রশ্নবিদ্ধ দুটি নির্বাচন সরকারের নৈতিক শক্তি হারিয়ে দিয়েছে। ফলে মুখে তারা যত কথাই বলুক ভিতরে তারা অনৈতিক অস্থিরতায় ভুগছে। আগামী নির্বাচন নিয়ে তারা বহুমুখী চাপে দিশেহারা হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মহল নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রতি গুরুত্বারোপ করছে। মুখে যাই বলুক ভিতরে ভিতরে সরকার মারাত্মক অস্বস্তিতে ভুগছে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে সদ্য গঠিত নির্বাচন কমিশন হিমশিম খাচ্ছে। সব দল নিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান তাদের জন্য ভয়াবহ কঠিন অনুভূত হচ্ছে। এমতাবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, দেশে অদূরভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে? সচেতন মহলের মধ্যে মারাত্মক শঙ্কা বিরাজ করছে। দেশে দিনে দিনে নৈরাজ্য বেড়েই চলছে। মনুষ্যত্ব বিকাশের সব পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। একটি দেশের মূল চালিকাশক্তি সে দেশের যুবসমাজ। সেই যুবসমাজের চরিত্রগঠনের সব উপাদান দেশ থেকে হারিয়ে গেছে। বিপরীতে চরিত্র নষ্টের সব উপাদান ক্রমাগত সাপ্লাই দেয়া হচ্ছে। যাবতীয় নেশাদ্রব্য তাদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। হাত বাড়ালেই তারা ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ নানা জাতীয় নেশাদ্রব্য বিনামূল্যে সংগ্রহ করছে। দেশে বর্তমানে ১৭ কোটি মানুষ রয়েছে। এর মধ্যে শিশু-কিশোরের সংখ্যাই প্রায় ছয় কোটি। তাদেরকে জাতীয়ভাবে কোনো ধরনের মোটিভেশন দেয়া হচ্ছে না। তাদেরকে নৈতিকতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। লেখাপড়ার নামে ছোটো ছোটো এসব শিশুর কাঁধে গাদাগাদা বই তুলে দেয়া হচ্ছে। সেই বইয়ের ভারে কোমলমতি শিশুরা নুইয়ে পড়ছে। তাদেরকে শুধুমাত্র জিপিএ ফাইভ পাবার জন্য নানা কোচিং-এ পাঠানো হচ্ছে। সনদনির্ভর এসব লেখাপড়া তাদেরকে বেকারত্ব উপহার দিচ্ছে। এ বেকারত্ব তাদেরকে ক্রমাগত হতাশা আর অধোগতির দিকে ধাবিত করছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব অধোগতির মূল কারিগর ও নাটের গুরু হলো রাষ্ট্রনায়করা। কেউ যখন এসব নীতিহীন অধোগতিতে আক্রান্ত হয় তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের অবকাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে।
আজ আমরা অস্থির রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছি। যা আমাদের ’৭১-এর স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। এতসব অসঙ্গতির মাঝেও আমরা উন্নয়নের মিথ্যা ফানুসে গদগদ হচ্ছি। উন্নয়নের ভ্রান্তিবিলাসে আমরা গা ভাসিয়ে দিচ্ছি। ’৭১ কে পুঁজি করে আমরা অনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ঘৃণ্যপথ অবলম্বন করছি। জনগণের মনের ভাষা বুঝেও না বোঝার ভান করছি। গায়ের জোরে তাদেরকে নীরবে নিষ্পেষণ করে চলছি। বিগত দুই দশকে আমরা রাজনীতিতে বুঝে শুনেই ভ্রান্তনীতি অবলম্বন করেছি। আর সে ভুলনীতির ওপর আমরা এখনো অটল রয়েছি। অথচ আমাদের মাঝে প্রকৃত ও ন্যূনতম দেশপ্রেম থাকলে আমরা রাজনীতি ও গণতন্ত্রকে একটি টেকসই নীতির ওপর দাঁড় করাতে সক্ষম হতাম। কিন্তু সেটা আমরা পারিনি। দেশের দ্বিদলীয় শাসনব্যবস্থাকে আমরা কবর রচনা করেছি। গণতন্ত্রকে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরে গোষ্ঠীতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছি। ফলে আমাদের সামাজিক জীবন ভদ্রতাবিহীন এক নির্জীব কাঠামোতে রূপায়িত হয়েছে। দ্বিদলীয় নেতাদের মতান্তর আজ মনান্তর ও বিভেদে রূপ নিয়েছে। বাংলার চিরায়ত কালচারও আজ হুমকির মুখে পতিত হয়েছে। একে অপরের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। বাংলার সেতুবন্ধ খ্যাত নানান সামাজিক অনুষ্ঠানও তারা একে অপরে বয়কট করেছে।
জবাবদিহিতামূলক ব্যবস্থা ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। ক্ষমতা একতরফা ও নিরঙ্কুশ হওয়ায় সমাজে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সমাজ ও পেশার সব স্তরে সহিংসতা ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো ব্যক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের যেকোনো সমস্যার ক্ষেত্রেও ব্যক্তিবিশেষের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশের প্রশাসনিক সব প্রতিষ্ঠান অকেজো ও স্বেচ্ছাচারী হয়ে পড়েছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন প্রশাসন ভয়ানক নিপীড়ক যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। তারা নিজেদেরকে প্রজাতন্ত্রের সেবক না ভেবে মালিক ভেবে নিয়েছে। দেশটিকে নিজের ও দলের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করতে শুরু করেছে। ফলে প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক ধরনের স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তর ঘটেছে। দেশের সরকারি দলের লোকজন ব্যতীত অন্য সবাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পাশাপাশি সাধারণ জনগণ চরম অধিকারহীনতায় ভুগছে।
’৭১ কে পুঁজি করে আমরা হীনস্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত আছি। ’৭১ এর মূল চেতনা থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছি। আমরা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ’৭১ পূর্ব সেই তিমিরেই রয়ে গেছি। আমাদের বিজয়ের বয়স ৫১ বছরে উপনীত হয়েছে। সামনে এগুবার পরিবর্তে আমরা পিছনেই ফিরে যাচ্ছি। এর চেয়ে কম সময়ে এশিয়ার অনেক দেশ উন্নত বিশে^ পরিণত হয়েছে। আমাদের বড্ড বেশি দেরি হয়ে যাচ্ছে! আমাদের আর কালবিলম্ব করা যাবে না। এই মুহূর্তে আমাদের সবাইকে ’৭১-এর চেতনায় ফিরে আসতে হবে। সবাই মিলে ’৭১-এর চেতনাকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এবারের নির্বাচনটি যদি অংশগ্রহণমূলক না হয় তাহলে দেশটি অন্ধকার অমানিশার অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে। স্বাধীনতার লাল সূর্যটি কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে। ফলে দেশ এক ভয়ানক অন্ধকার অমানিশায় নিপতিত হবে। সোনালি সূর্যের উদয় অনিশ্চিত হয়ে যাবে। ফলে গোটা বাঙালি জাতি মুক্তির স্বাদ পাওয়া থেকে চিরতরে বঞ্চিত হয়ে যাবে।
