মিছির মাস্টার অবসরপ্রাপ্ত। কর্মঠ। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেন না। তিনি বলেন, ‘সূরা জুমু’আহর ১০ নম্বর আয়াতে বলা আছে- ‘নামাজ শেষে তোমরা জমিনে ছড়িয়ে পড়বে আর আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করবে এবং এ সময় তোমরা বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করবে, যেন তোমরা সফল হও।’ তাই কাজেই তার আনন্দ। এখনো নিজ হাতে জমির চার পাশ কোপান। জমি চাষ দেন। সোনার ফসল ফলান। তার ভাষায়, জমির মালিক জমিতে না গেলে জমি অনাথ হয়ে যায়। তিনি খুব গোছানো মানুষ। পরিছন্ন। মাথার চুল আর দাড়ি মেহেদি রাঙানো। খুব শৌখিন মানুষ। রুচিবোধ সম্পন্ন।
তার তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলে শহরে থাকে। তারা খুব ব্যস্ত। গ্রামের বাড়ি আসার সময় হয় না। তাদের সময় হয় তো, তাদের ছেলেমেয়েদের সময় হয় না। তাদের ছেলেমেয়েদের ওপর চেপে বসেছে, লেখাপড়া নামক পাষাণভার। স্কুল, কোচিং আর প্রাইভেট পড়া নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। দম ফেলানোর সময় নেই। এভাবে কি লেখাপড়া হয়? তিনি দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন। এভাবে আর যা-ই হোক, শিক্ষার ভিত মজবুত হয় না। নিজে নিজে বারবার চেষ্টা করেও যখন পারবে না, তখন শিক্ষকের কাছে যাবে। এভাবে কষ্ট করে শিখলে জীবনেও ভুলবে না। কোচিং আর প্রাইভেট পড়া ছাত্রদের এ সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে।
তার ছোট ছেলের দুই মেয়ে এক ছেলে। তারা তার সাথে গ্রামেই থাকে। তিনি তাদের বলেন, তোরা ভাগ্যবান। শহর তোদের সোনালি শৈশব কেড়ে নিতে পারেনি। যারা শহরে বড় হয় তারা হতভাগা। খাঁচায় পোষা পাখি। তাদের নীল আকাশ নেই। চরে বেড়ানোর ধু ধু করা মাঠ নেই। তারা শরতের জোছনা গায়ে মাখতে পারে না। ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে আম কুড়াতে পারে না। মোরগের ডাকে তাদের ঘুম ভাঙে না। সকালের শিশু সূর্য তাদের চোখে পড়ে না। তোরা প্রতিদিন যা করিস, তারা তা কল্পনায় দেখে। তোরা দল বেঁধে মাঠে গোল্লাছুট খেলিস, তারা ভিডিও গেম খেলে। তোরা স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে নদীতে সাঁতার কাটিস। তারা ঘরে বসে টেলিভিশন দেখে সময় কাটায়। এ কারণে গ্রামের ছেলেমেয়েরা শারীরিক ও মানসিক দিকে অনেক শক্ত হয়।
সারা গ্রামে আর কারো বাড়িতে পত্রিকা নেই। মিছির মাস্টারের বাড়িতে আছে। পত্রিকা বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে বিকেল হয়ে যায়। তিনি খুব আয়োজন করে পত্রিকা পড়েন। বারান্দায় বসে চা-নাশতা খেতে খেতে পত্রিকা পড়েন। তার নাতি-নাতনীরা তাকে ঘিরে বসে থাকে। মজার কোনো খবর থাকলে তাদের সাথে শেয়ার করেন। একটি খবর খুব মনোযোগ সহকারে পড়লেন। তিনি খুব চিন্তিত হলেন। কপালে ভাঁজ পড়ে গেল। খাবারে ভেজাল! চামড়ার বিষাক্ত বর্জ্য থেকে তৈরি হচ্ছে হাঁস-মুরগি আর মাছের খাবার। যাতে রয়েছে ক্রোমিয়াম, মার্কারি আর ক্যাডমিয়ার মতো ক্যান্সার সহায়ক উপাদান। এগুলো পরে মাছ, গোশত আর ডিম হয়ে মানুষের শরীরে ঢুকে যাচ্ছে। এতে মানুষ ভয়াবহ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হতে পারে। মিছির মাস্টার হতাশ হলেন। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ভাবলেন, মানুষের নৈতিকতা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে!
বারান্দার সামনে শিমের জাংলা। বেশ ঝোপ হয়েছে। মাঝে ঘুঘু বাসা বানিয়েছে। তিলা ঘুঘু। ঘাড় ও পিঠের কালো বলয়ের উপর সাদা তিল। ডানার উপর ধূসরের ছোপ। লাল পা। বাদামি ঠোঁট। খুব সুন্দর পাখি। আজকাল তেমন একটা দেখা যায় না। বাসাটা উনি অনেক আগেই দেখেছেন। কাউকে বলেননি। তার নাতি-নাতনীরা দেখলে ঘুঘুটাকে ধরে ফেলতে পারে। তবুও শেষ রক্ষা হলো না। তার নাতি, শৈবাল বাসা থেকে ছা চুরি করে এনেছে। ঘরের কোনায় লুকিয়ে রেখেছে। গুটিসুটি মেরে বসে আছে ছা টা। দেখে মিছির মাস্টার বেজার হলেন। তার বউমাকে ডাকলেন। কে এনেছে ছা টা, জিজ্ঞেস করলেন। কে আর আনবে,আপনার ছোট ভাই ছাড়া; বউমা জবাব দিলেন। তিনি একটু হেসে বললেন, ‘বউমা তুমি পাশের বাড়িতে একটু লুকিয়ে থাকো। আমি ডাকলে আসবে।
শৈবাল দৌড়ে ঘরে এসে মা বলে ডাক দিলো। মা নেই। কান্না জুড়ে দিলো। মাস্টার সাহেব তাকে কোলে নিলেন। আদর করে বললেন, ‘কাঁদিস না, তোর মা এসে পড়বে।’ শৈবাল কারো কথা শুনছে না। তার কান্না থামছে না। মাস্টার সাহেব বললেন, ‘মায়ের জন্য খুব খারাপ লাগছে?’ শৈবাল মাথা নেড়ে বলল, ‘হ্যাঁ’। এবার তিনি একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘আচ্ছা দাদুভাই, তুমি যে ঘুঘুর ছানাকে মা ছাড়া করেছ, তার কি খারাপ লাগছে না?’ শৈবাল বলল, ওটাকে তার মায়ের কাছে রেখে এসো।
এবার তিনি বললেন, ‘ঘুঘু দেখতে যেমন সুন্দর, তার ডাকও খুব সুন্দর। ভরদুপুরে ঘুঘুর ডাক শুনে উদাস হতাম। চারপাশে কত ঘুঘু দেখতাম! আজকাল ঘুঘু চোখেই পড়ে না। শিকারিদের অত্যাচারে আর ঝোপঝাড়ের অভাবে ঘুঘু শেষ হতে চলেছে। কতদিন সবুজ ঘুঘু দেখি না! এ ঘুঘুর ডানা ও পিঠ সবুজ। লাল ঠোঁট। ঠোঁটের পেছনে কপাল, থুঁতনি আর ভুরু সাদা। বাকি শরীর লালচে। লেজ কালচে। দেখতে খুবই সুন্দর। তোমরা যদি এদের লালন না করো এরা থাকবে না।’