আজ পয়লা বৈশাখ, বাংলা সনের প্রথম দিন। স্বাগতম ১৪৩০ বাংলা নববর্ষ! শিশু-যুবা-বৃদ্ধসহ সব বয়সের এবং সব শ্রেণীর মানুষ এ দিনটি উদযাপন করে। বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হয় উৎসবমুখর পরিবেশে। নববর্ষ উদযাপন বাঙালি সংস্কৃতির বিশেষ অনুষঙ্গ হয়েছে। দিনটি উদযাপনের জন্য সরকারি-বেসরকারি, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিভিন্ন সংগঠন-সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে। নববর্ষ উদযাপনের সুবিধার্থে বাংলাদেশে এ দিনটি সরকারি ছুটি থাকে।
বাংলা নববর্ষ উদযাপন বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতির একটি অন্যতম উপাদান। এ উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ বৈশাখী মেলা। বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে গ্রাম-গঞ্জে বৈশাখী মেলা বসে। এ মেলায় কৃষিজ পণ্য, কুঠির শিল্প দ্রব্য, মৃৎ ও হস্তশিল্প দ্রব্য প্রয়োজনীয় ও অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, খেলনা ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয়ের ধুম পড়ে। আগের দিনে মেলায় ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, লাঠি খেলা, বলীখেলা ইত্যাদি বিনোদন অনুষ্ঠান প্রদর্শনী হতো। তখন মেলা ছিল বাঙালির প্রাণের উৎস। মেলা উপলক্ষে আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে বেড়ানো ও আপ্যায়নের ব্যবস্থা হতো। আর বিবাহিতা মেয়েরা বাপের বাড়িতে নাইওর যেত। আবালবৃদ্ধবণিতা সবাই মেলায় আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠত। আগের দিনে মেলার সময় বাংলার গ্রামে গ্রামে আনন্দের ধুম বয়ে যেত। মেলায় লাঙল, জোয়াল, মইসহ বিভিন্ন কৃষি সরঞ্জামাদি, গৃহস্থালির প্রয়োজনীয় মাটির হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র, শিশুদের খেলাধুলার জন্য ঘুড়ি, মাটির তৈরি হাতি-ঘোড়া ইত্যাদি বেচা-কেনা হতো। মেয়েদের হাতের চুড়ি, কানের দুল, গলার হার, প্রসাধনী সামগ্রীও মেলায় বেচাকেনা হতো। এ ছাড়া জুড়ি-বুন্দি, জিলাপি, রসগোল্লা ইত্যাদি মুখরোচক খাবারের সমারোহ তো ছিলই। তবে সব মেলা নববর্ষ উপলক্ষে পয়লা বৈশাখে কিংবা একই দিনে হতো না বরং চৈত্র সংক্রান্তি, বারুনিসহ বিভিন্ন নামে বিভিন্ন সময়ে হতো। নববর্ষ উপলক্ষে আমানি, রাজপুণ্যাহ, হালখাতা, গাজনের গান ইত্যাদি গ্রামীণ অনুষ্ঠান মাসজুড়ে চলত।
বাংলা সনের ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। তাই স্বাভাবিক কারণেই বাংলা নববর্ষের উৎসব-সংস্কৃতিও খুব পুরনো নয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু লোক বাংলা নববর্ষে সেন যুগীয় (খ্রিষ্টীয় একাদশ-দ্বাদশ শতকের) ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতিকে বাংলা নববর্ষের সংস্কৃতি বলে অপপ্রচার করছে। আর এ অপপ্রচারের ফাঁদে পড়ে সহজ-সরল অনেক বাঙালি ঐসব অপসংস্কৃতিকেই বাংলা নববর্ষের সংস্কৃতি হিসেবে পালন করছে। মুসলিম আমলের (১২০৩-১৭৫৭ খ্রি.) বাংলা সাহিত্যে বাংলা নববর্ষভিত্তিক কোনো সাহিত্য নেই। ইংরেজ আমলের (১৭৫৭-১৯৪৭ খি.) সাহিত্যেও বাংলা নববর্ষভিত্তিক কোনো রচনা পাওয়া যায় না। বিশ শতকের প্রথমার্ধেও বাংলা ‘নববর্ষ’ সাহিত্যে তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে নাই। তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা-গানে ‘বৈশাখ’ ‘পুণ্যাহ’ বিষয় থাকলেও বাংলা ‘বর্ষবরণ’ উৎসবের বিষয় নাই। একইভাবে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যে পারস্যের ‘নওরোজ’ অনুষ্ঠানের উল্লেখ থাকলেও বাংলা ‘নববর্ষ’ বা বর্ষবরণ’ উদযাপনের বিষয় নাই। অর্র্থাৎ গত শতাব্দীর প্রথমার্ধের বাংলা সাহিত্যে ‘নববর্ষ উৎসব’ প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। অবশ্য তখন যে ‘নববর্ষ’ বা ‘বর্ষবরণ’ ছিল না বিষয়টি তেমন না। তবে তৎকালে ‘বর্ষবরণ’ বা ‘নববর্ষ’ উদযাপন ছিল অনাড়ম্ভরপূর্ণ ও জৌলুশহীন। ঘরোয়া পরিবেশে পরিবার-পরিজন ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যেই নতুন বছরের প্রথম দিনে ভালো খাবার আয়োজন-আপ্যায়ন এবং নতুন পোশাক পরার ‘বর্ষবরণ’ বা ‘নববর্ষ’ উদযাপন সীমাবদ্ধ ছিল। বর্তমানের মতো এত জমকালো অনুষ্ঠান তৎকালে ছিল না। মিষ্টান্ন বা মিঠা জাতীয় দ্রব্য দিয়ে ‘মিঠামুখ’ করানো এবং অপেক্ষাকৃত ভালো খাবারের আয়োজন করা হতো ‘বর্ষবরণ’ বা ‘নববর্ষ’ দিনে। তৎকালীন বাঙালি সমাজে প্রচলিত ধারণা ছিল বছরের শুরুর দিন ‘মিঠামুখ’ করলে সারা বছর মুখ মিঠা থাকবে এবং এদিন ভালো খাবার খেলে সারা বছর অনুরূপভাবে ভালো খাবার খাওয়া যাবে। কুসংস্কার হলেও বাঙালিরা এ বিশ্বাসের ভিত্তিতে ‘নববষর্’ দিনে অপেক্ষাকৃত ভালো খাবারের আয়োজন ও ভালো পোশাক পরিধান করে। কালের পরিক্রমায় বছরের প্রথম দিনে ভালো খাবারের আয়োজন-আপ্যায়ন, নতুন পোশাক পরা, হিন্দুদের পূজা-অর্চনা, মুসলমানদের মিলাদ-মাহফিল-দোয়া অনুষ্ঠান ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলা ‘নববর্ষ’ ‘বর্ষবরণ’ উদযাপনের উৎপত্তি ঘটে। আর ইংরেজ শাসনামল অবসানের পর কালক্রমে ‘নববর্ষ’ উদযাপন উৎসবে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তীকালের ঘটনাপ্রবাহ বাংলা ‘নববর্ষ’ উদযাপনকে ত্বরান্বিত ও বিস্তৃত করেছে। অবশ্য সাম্প্রতিককালের ‘নববর্ষ’ বা ‘বর্ষবরণ’ ও আগের দিনের ‘নববর্ষ’ বা বর্ষবরণের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য আছে। বিশ্বায়নের ফলে আধুনিক যুগের বাংলা নববর্ষ উদযাপনের মনোহরি চাকচিক্য বাড়লেও আন্তরিকতার যথেষ্ট অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বর্তমান সময়ের নববর্ষ উদযাপনে পান্তাভাত ও ইলিশ ভাজাসহ মুখরোচক অনেক খাবারের সমারোহ ঘটালেও এতে প্রাণের স্পর্শ পাওয়া যায় না। এতে ধনী ও বিলাসী মানুুষের বিনোদনের ব্যবস্থা হলেও দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের অন্তরে সুখ আসে না। আধুনিক যুগের শহুরে মানুষদের প্রাণহীন জমকালো বর্ষবরণের কৃত্রিমতায় নিবিড় পল্লীর প্রীতিপূর্ণ ছোট ছোট উৎসব ঢাকা পড়ে যায়। করপোরেট বিভিন্ন কোম্পানি, শিল্পপতি, বড় চাকরিজীবী ও টাকাওয়ালাদের উৎসবের তাণ্ডবতায় বাঙালি কৃষকদের নববর্ষ উৎসব পিষ্ট হয়। অথচ বাংলা নববর্ষের সূচনাই হয়েছে বাঙালি কৃষকের সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে। বাংলা নববর্ষের মূলে কৃষক ও কৃষি। মুঘল শাসনামলে হিজরি সনের ভিত্তিতে এ দেশে বছর গণনা হতো। হিজরি বছর সৌরবছর থেকে ১১ দিন ছোট হওয়ায় এ দেশের ঋতু পরিবর্তনের সাথে হিজরি বছরের মিল হয় না। এতে কৃষকদের ফসলি সন গণনায় সমস্যা হয়। অধিকন্তু কৃষকের কাছ থেকে জমিদারের খাজনা আদায়েও সমস্যা দেখা দেয়। এজন্য কৃষক ও জমিদারের সমস্যা দূর করতে মূলত বাংলা সনের প্রর্বতন করা হয়।
বাংলা সনের সূচনা হয়েছে মুসলমানদের হাতে। মুসলিম ঐতিহ্যের হিজরি সনকে ভিত্তি করেই বাংলা সনের উৎপত্তি হয়েছে। মুঘল সম্রাট আকবর বাংলার কৃষকদের সুুুবিধার্থে হিজরি সনকে ভিত্তি ধরে বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। চলতি নববর্ষে বাংলা সন ১৪৩০তম বছরে পদার্পণ করলেও মূলত এর যাত্রা শুরু হয়েছে মাত্র ৪৬৫ বছর আগে মুঘল শাসনামলে। উল্লেখ্য, হিজরি সন গণনা করা হয় মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা:-এর মক্কা থেকে মদিনা হিজরতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। হজরত ওমর রা: রাসূল সা:-এর হিজরতকে স্মরণীয় রাখতে হিজরতের বছরকে ভিত্তি বছর ধরে হিজরি সনের প্রবর্তন করেন। পরে মুঘল সম্রাট আকবর তার সভাজ্যোতিষী আমীর ফতেউল্লাহ সিরাজীর (দৈবে দশমরতœ) পরামর্শে হিজরি ৯৬৩ সনকে বাংলা ৯৬৩ সন ধরে বাংলা সন গণনার নির্দেশ দেন। পারস্যের (ইরানের) নববর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠান ‘নওরোজ’ এর আদলে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সূচনাও করেন তিনি। তার আনুকূল্যে ও পৃষ্ঠপোষকতায় জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপিত হতো। ‘নওরোজ’ অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ ‘মীনা বাজার’। আর এ মীনা বাজারের আদলে বাংলা নববর্ষ উৎসবে যোগ হয়েছে ‘বৈশাখী মেলার’। প্রকৃতপক্ষে বাংলা ‘নববর্ষ’ উৎসবের মূলে আছে মুসলিম ঐতিহ্য। উৎপত্তিগত দিক দিয়ে বাংলা সনের সাথে মুসলিম ঐতিহ্য জড়িত। অনুরূপভাবে নববর্ষ উৎসবের সাথে পারসিয়ান মুসলিম সংস্কৃতি সম্পর্কিত। মুসলিম ঐতিহ্য-সংস্কৃতির ভিত্তিতে বাংলা ‘নববষর্’ চালু হলেও মুসলমানদের উদারতার কারণে তা সর্বজনীন অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বাঙালি মুসলিম সমাজের অজ্ঞতা, অদূরদর্শিতা, সংস্কৃতিবিমুখতার কারণে মুসলিম ঐতিহ্যমণ্ডিত বাংলা ‘নববর্ষ’ উৎসব ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির অন্তরালে ঢাকা পড়েছে। বাংলা ‘নববষর্’ ও ‘বৈশাখী মেলা’ মুসলমানদের প্রবর্তিত বাঙালি সংস্কৃতি হলেও ইতিহাস-ঐতিহ্য বিস্মৃতরা বাংলা নববর্ষ উদযাপনকে ইসলাম গর্হিত ও পাপ মনে করে। আর এ সুযোগে কতিপয় ব্যক্তি-সংস্থা অশালীন-অপসংস্কৃতিকে বাংলা ‘নববর্ষ’ উৎসবে যোগ করেছে। দেশজ সংস্কৃতির বাতাবরণে মঙ্গল শোভাযাত্রা, কপালে তিলক-সিঁদুর পরা, উলুধ্বনি দেয়া ইত্যাদি ভিনজাতীয় সংস্কৃতি যোগ হয়েছে বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। অধিকন্তু মুক্তবাজার অর্থনীতি ও বিশ্বায়নের ফলে আমাদের দেশের এলিট শ্রেণী খ্যাত কিছু অর্ধবাঙালি হোটেল-পার্কে জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেন Happy new year এর আদলে। যা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে দুর্বল ও অপদস্ত করছে।
ধর্মের ভিন্নতা সত্ত্বেও অভিন্ন মূল্যবোধ ও জাতীয় চেতনায় বাঙালি সংস্কৃতি সমন্বিত ও সংস্থিত হয়েছে। তবে সম্প্রতি আমাদের সংস্কৃতি বিশ্বায়নের নামে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছে। অন্তঃসারশূণ্য বাহ্যিক চাকচিক্যময় কুরুচিপূর্ণ আগ্রাসী অপসংস্কৃতি আমাদের যুব ও তরুণসমাজকে বিভ্রান্ত করছে। তারা নিজস্ব সংস্কৃতি ভুলে ভিনদেশী-বিজাতি সংস্কৃতিতে মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে। তাদের অপসংস্কৃতি হতে প্রতিহত করতে না পারলে প্রাণশক্তি হারিয়ে আমাদের সংস্কৃতি কালের গর্ভে তলিয়ে যাবে। আর অপসংস্কৃতি প্রতিহত করতে হলে নিজস্ব সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। উচ্চকিত করতে হবে মানবিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাঙালি সংস্কৃতিকে। বিশ্বায়নের বিভ্রান্তি থেকে নতুন প্রজন্মকে মুক্ত করতে শেকড়সন্ধানী হতে হবে। দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরতে হবে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতিকে। আর পরিহার করতে হবে ভিনদেশী-বিজাতীয় অপসংস্কৃতিকে। সর্বোপরি তরুণ-নবীন-শিক্ষার্থীদের জাতীয় মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও নৈতিকতার চেতনায় জাগ্রত করতে হবে। তাহলেই বাংলা নববর্ষ উৎসব উদযাপন সার্থক হবে।
