জাহিদুল হক
কার খোঁজে এসেছি এখানে যেন আমি
দীর্ঘ এক ট্রেনের মতন স্বপ্ন যাচ্ছে নিয়ে দূরে
আমাকে এখন, রোম ছেড়ে ফ্লরেন্সকে ছুঁয়ে কুরে
দিচ্ছে সে-ও হুইসেলে কার বুক-তোমার উদ্দেশে?
পৃথিবীর যে কোনো শহরে যাই, একা, ভালোবেসে
মনে হয় কার খোঁজে এসেছি এখানে যেন আমি
সহস্র বছর ধরে কার কাছে এসে আমি থামি!
আমাকে কি দিচ্ছ তুমি আকাশের পূর্ণিমার নীড়
দিচ্ছ তুমি ভাঙনের ব্যথাগুলো, রক্তাক্ত নিবিড়
পতনের শহরের ভগ্নাবশেষের যত স্বর
স্মৃতির সমুদ্রজুড়ে নাবিকের গান, কলস্বর;
তোমার গন্ধটি দিয়ো, তোমার চোখের জমকালো
অন্ধটিও দিও, দিওনা দেয়ার নেভানো সে আলো
জ্বেলে, চির-অমাবস্যা চিরে দিও তোমার আঁধার,
আমার শব্দের মধ্যে দিও তুমি কারুকার্য আর।
যাচ্ছি আমি কার খোঁজে এ শহর থেকে ও শহরে
সেই কি পরম! দীর্ন । ‘না’ শব্দটি ফের যেন ঝরে
দরোজায় টোকা দিলে, তা না হলে স্বপ্নের এ ট্রেনে
স্তব্ধ চলা। কী করে খুঁজতে যাব? জ্যোৎস্নার শ্যাম্পেনে
ভিজবে তোমার মুখ, আর্দ্র হবে পরীদের বাড়ি
আমার স্বপ্নের ট্রেন তখনো পেরুচ্ছে বালিয়াড়ি !
জাহাঙ্গীর ফিরোজ
বিগত দিনের রতন
কত যে মানুষ ছিল কত-না ঘটনা
দীর্ঘ পথ, কেউ কেউ এগিয়ে গিয়েছে
অনেকেই পড়ছে পেছনে
নামধাম ভুলে গেছি ভুলেছি চেহারা
তবুও সঞ্চয়ে আছে যে কয়টি আনন
তাই দিয়ে প্রতিদিন সাজাই কানন।
এ খেলাও ক্লীশে হয়ে উঠেছে এখন;
বইপাড়া? সে-তো ঝাপসা অক্ষরের
মাঝে হাতড়ানো!
স্মৃতিতে সাঁতরানো ছাড়া
কিভাবে পৌঁছাবো তোমার নিকটে!
ক্রমাগত হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত ডেরায়
নিয়েছি ঠাঁই। এখন কোথাও যাবার নাই
কর্মহীন, গতায়াত জীবনের ছাই
উড়াইয়া দেখি তাই
পেয়ে যাই বিগত রতন!
দিলীপ কির্ত্তুনিয়া
শুরু নেই শেষ নেই
বছর শেষে আমার আয়নাখানা ভাঙ্গলো বুঝি!
কিনতে হবে আবার নতুন আয়না
একখানি ।
বছর শেষে কলমের কালি ফুরায় বুঝি!
বছর শেষে লেখা হয় কাগজের শেষ পৃষ্ঠাটি!
তোমার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকার নেশা
ফুরায় না কেন!
অনন্তকাল ধরে তোমাকে দেখছি
কোথায় এখানে সময়ের শেষ এবং শুরু ।
জটিল আরম্ভও নেই -- সরল অন্তও নেই ।
বছর শেষে ফেলে দিচ্ছি বাসি পচা
বছর শেষে চকচকে নতুন গায়ের জামা
একই রকমভাবে তোমাকে আমি
জীবন ভরে দেখছি
তোমার সুবাস গায়ে মাখছি
এর শুরু নেই -- শেষ নেই --
শেষ চৈত্রও নেই -- আরম্ভ বৈশাখও নেই।
সায়ীদ আবুবকর
কে তুমি
সভ্যতার সব কোলাহল থেমে গেলে, আরো এক কোলাহল
জেগে ওঠে একান্ত বিরলে। কিসের ব্যথায় অস্থির চঞ্চল
হয়ে ওঠে দুঃখক্লিষ্ট মন! সেই অস্থিরতা
সমস্ত অস্তিত্ব ঘিরে যেন বলে ওঠে কথা-
তুমি কে? কে তুমি?
আমি এক নীলকণ্ঠ, আকণ্ঠ করেছি পান
ঝড়-ঝঞ্ঝা, ভূমিকম্প, জীবনের তাবৎ তুফান;
মানুষের সব ব্যথা, সব দুঃখশোক
গিলে ফেলে বলেছি উল্লাসে, সুখ হোক, শান্তি হোক,
সমূহ কল্যাণ হোক মানুষের। তারপরও আমি শুনতে পাই
সমস্ত অস্তিস্ত¡ জুড়ে উচ্চারিত সেই একটি কথাই-
কে তুমি? তুমি কে?
তাহলে কি কবিতার নিটোল অক্ষর আমি, কেবলি অক্ষর,
ভূমিকম্পে সবকিছু ধসে গেলেও অক্ষত থাকে যার ঘর?
নাকি আমি কালবেহালার অনিবার বেদনার ধ্বনি,
অর্কেস্ট্রার সুর, সুখের সিম্ফনি?
নাকি আমি অন্য কেউ, অন্য কিছু, দূর অন্তরীক্ষ হতে আসা,
কায়া আছে, ছায়া আছে, শুধু যার নেই কোনো ভাষা?
ফরিদ আহমদ দুলাল
শুদ্ধতার উৎসবে
রুচির সংকটে যখন টালমাটাল সমকাল
দ্বিধার দেয়ালে ঠেকেছে তোমার পিঠ
তুমি গেয়ে ওঠো বেসুরে রবীন্দ্রনাথ;
জানি না শূন্যতা বানান কিভাবে শুদ্ধ লেখা যায়
অন্ধকারের বিশদ বিবরণ দুর্বোধ্য শোনায়;
মনে করো দৃশ্যমান দৃশ্যপটের কোত্থাও আমি আর নেই
আমার নির্মোহ ছায়াবৃক্ষতলে আশ্রয় পেয়েছে অবাঞ্ছিত অনেকেই
তুমি শুধু নেই নিভৃতির জলাশয়ে পানকৌড়ির ভিড়ে
বিকেলে-সন্ধ্যায় সকালের মিঠারোদে তোমার অস্তিত্ব নেই দরিদ্র কুটিরে;
আমার নিঃশ্বাসে প্রগাঢ় প্রশ্বাসে নেই
স্বপ্ন-জাগরণে বহুমাত্রিক বর্ণিল সম্ভাষণে
চুম্বনালিঙ্গনে বাসন্তী মৈথুনে তোমার পেলব উপস্থিতি নেই!
এসব অবগাহন শেষে নিজেকে কি নিঃস্ব-শূন্য মনে হবে
দুর্বিপাকে সত্য ওষ্ঠাগত দেখে বিপন্ন তাকিয়ে রবে!
দু’চোখে কি অশ্রুপাত হবে গোপন শিশির জল
সামাজিক শিষ্টাচার মেনে লাল চোখ মুছবে আঁচল!
তুমিও কি শিখে নেবে শূন্যতার শুদ্ধ ব্যাকরণ?
আঁধারের অমিয় স্বরূপ জেনে মুছে নেবে স্মৃতি
নিজস্ব ভুবনে পাবে কি বাঁচার একান্ত সঙ্গতি?
শূন্যতা বানানে আছে চৈত্রের রোদ্দুর
অন্ধকারে মিশে থাকে চরম দুপুর
পরিমার্জন-পতঙ্গে-কাটা তোমার পাঠ্যসূচিতে ভুল ইতিহাস
দক্ষিণে ঘুমাও তুমি উত্তরে নিবাস,
মাঝে মাঝে পুবে বা পশ্চিমে বে-পাড়ায় যাও
ইশারায় কাছে ডেকে কিছু না-বলে হারিয়ে যাও
যদি জেগে ওঠো নবজন্মে নববর্ষে ফের তুমি
জেনে নাও অনার্য পাঁজর খুলে বেঁচে আছে পুণ্য বঙ্গভূমি।
মাহবুব হাসান
তুমি কী দেখতে পাও?
শোল মাছের ঝোল রাঁধছিলেন মা আমার
তরতরে ঝোল
ঝলমল ঝোল
শুকনা মরিচে রান্না করা সেই ঝোলের ভেতর থেকে
স্মৃতির টুকরোগুলো
সসারের বেগে উড়ছে আমার মনে,
আমি দিব্যচক্ষে দেখতে পাচ্ছি সেই উড়ন্ত
অবিশ্বাস্য স্মৃতির শৈশব,
জ্বলজ্বলে কৈশোরের দিন, অমলিন নিসর্গের রূপ
আমার সিজদার ভেতর থেকে আমি উড়ে যাচ্ছি
পরমাণু খাসলত নিয়ে বেকসুর
সুচতুর মার্কিনি বিমান যেন,
পলকের চেয়েও পলকা সেই পলায়ন
নামাজের ভোরের সংসার থেকে,
ঘোরের ধূসর জগতের ঘুমে,
তুমি কী দেখতে পাও এই পলায়ন,
এই পরিযায়ন আমার?
শাহাজাদা বসুনিয়া
চাই সুন্দর মানুষ
হে পৃথিবী
আমি এক নগ্ন সত্যের সন্ধান পেয়েছি
তোমার গায়ে অসংখ্য ত্বক
ত্বক রহস্যের অন্যতম হলো
‘মানুষ’
মানুষেই হলো ধ্বংস এবং সন্ত্রাসের দেবতা
ভয়ানক ভীতিতে মানুষের বসবাস
মানুষ পান করে বিনাশ ও বিদ্রোহের সূরা
আত্ম-অহংকারে হাঁটে কর্দমাক্ত পঙ্কিলে
ধর্মসংঘের সদস্য মানুষ
ক্রোধ এবং হিংসায় খেপে উঠে মানুষ
ভয়ানক শব্দে কাঁপে পৃথিবী
পৃথিবীতে উষ্ণনিশ্বাস, শ্বাস বন্ধ হয় পৃথিবীর
ক্রোধান্বিত মানুষ!
পৃথিবী কম্পিত!
মানুষের গল্প সহস্রবর্ষের নিঃসৃত-ধূম্র-উত্তপ্ত লাভার মতো
আমরা মানুষ অভিশপ্ত
মানুষের হৃদয় শুকিয়ে নীরস শস্যক্ষেত্র
পৃথিবীর বুকে চলছে অগ্নিবৃষ্টি
মানুষ এখন ক্লান্ত-অবসন্ন, জীবনের ফালগুনধারা শুকিয়ে গেছে
মৃত্যু-মন্দির, মসজিদ, গীর্জার দুয়ার বন্ধ
অমঙ্গলের ভয়ানক শব্দ সর্বত্র
স্যাঁতস্যাঁতে পৃথিবীর বুকে মৃত্যুচিহ্ন
অশুভ চিহ্নের কপাট খুলবে মানুষ
এখন সময়। চূড়ান্ত সময়।
মানুষ জেগে উঠবে, পৃথিবী সুন্দর হবে, সুশোভিত হবে নিঃসর্গ
হে সুন্দর পৃথিবী, তোমার ত্বকে আমরাই শ্রেষ্ঠ মানুষ।
