প্রতি বেলা খাবারের মুহূর্ত হলে তিন চারটি বিড়াল এসে মিউমিউ করে। অসহায় অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়, যাতে মাছের কাঁটাটা, মাংসের হাড্ডিটা, পরিত্যক্ত ঝুটাগুলো ওদেরকে দিয়ে দিই। এ-সবই তো ওদের প্রিয় খাবার। বেশ আয়েশ করে খায় ওরা এগুলো। আমাদের ঘরে যখন একটি বিড়াল ছিল; দাদাভাই বেঁচে থাকতে যেটি পালতেন সে বিড়ালটিকে খুব আদর আত্তি করতাম আমরা। বিড়ালটি দাদাভাইয়ের খুব প্রিয় ছিল। প্রিয় ছিল ঘরের সবার কাছেও। দাদাভাইয়ের মৃত্যুর পর সেবার ঢাকা থেকে ফেরার পর বিড়ালটিও কোথায় যেন হারিয়ে যায়। হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি করেও কোথাও দেখা মেলেনি তার। জানি না, দাদাভাইয়ের সাথে অভিমান করেই বিড়ালটি নিখোঁজ হয়ে গেলো কিনা।
এখন আমাদের ঘরে যে তিন-চারটি বিড়াল সকাল দুপুর ঘুরঘুর করে সেগুলোর একটাও অভিজাত, রুচিশীল নয়। সারাদিন শুধুই ধান্দামি, চুরিচামারি করে বেড়ায়। কখনো আলমিরা থেকে, কখনো বা রান্নাঘরের হাঁড়িপাতিল থেকে, আবার কখনো পাতের প্লেট থেকে ছোঁ মেরে এটা ওটা নিয়ে যায়। আম্মু এ নিয়ে বেজায় ক্ষুব্ধ। এই সেদিনও তো কী ছ্যাচড়ামিটাই না করল একটা ভাগ্নি নাযিফার সাথে। ও ভাইয়াদের সাথে ঢাকায় চলে যাবে, সে উপলক্ষে আম্মু ভালো ভালো খাবার রান্না করেছেন। ওর জন্য বড় একটি সরপুঁটি মাছ ভেজেছিলেন, কিন্তু পাজি বেড়াল তা দেখে আর নিজের লোভ সামলাতে পারল না। মচমচে ভাজা মাছটা নাযিফার পাতে রাখা মাত্রই ছোঁচাটা ছোঁ মেরে মাছটা নিয়ে কোথায় যেন হাওয়া হয়ে গেলো। রাগে ক্ষোভে আম্মুর অবস্থা তখন অন্যরকম হয়ে গিয়েছিল। কত আশা করে নাতনির পাতে মাছভাজাটা দিয়েছিলেন, কিন্তু তা দেখে পাজি বেড়ালটা নিজের লোভ সামলাতে পারল না। এর ফলে যা হয়েছে তা বিড়ালগুলোর জন্য মোটেই সুখের না। তারপর থেকে যখনই বেড়ালগুলো ঘরে আসত তখনই আম্মু দূরদূর করে তাড়িয়ে দিতেন সবগুলোকে। তবে ধীরে ধীরে রাগ কমে গেলে একটু সহনশীল আচরণ করতে থাকেন আম্মু। কিন্তু রাতের বেলায় কিছুতেই ঘরে জায়গা দিতেন না। কারণ, কয়েকটি খাটের ওপর হাগু করে দেয়ার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ইতোমধ্যেই তারা ঘটিয়েছে। বিড়ালগুলোর সারারাত এখন রান্নাঘরেই ঘুমে কাটে হয়তো। একটা পাজি তাও কীভাবে যেন জাম্বুরা গাছ ডিঙিয়ে টিনের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়ে ঘরে। এটাকে আপাতত শায়েস্তা করা যাচ্ছে না। সামনে কখনো দুই নম্বরিতে ধরা পড়লে হয়তো একেও কড়া বিচারের মুখোমুখি করা হবে।
আজকে যখন বিড়ালগুলোকে তাড়িয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে ফেলছিলেন আম্মু তখন হঠাৎ করেই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায় আমার। এক অদ্ভুত মায়া অনুভব করি বিড়ালগুলোর প্রতি।
ভাবছিলাম, সারারাত বাইরে বিড়ালগুলোর কি কষ্টটাই না হবে! আম্মুকে বললাম ব্যাপারটা। আম্মু বললেন, রান্নাঘরেও তো থাকতে পারে পাজিগুলো। তা না করে ঘরদোর ময়লা করে ফেলে। রান্নাঘরের কথা মনে হতেই কষ্ট কিছুটা লাঘব হয়ে গেলো। ওদের থাকার একটা বন্দোবস্ত হলো তাহলে। ওরা তো অবলা নির্বোধ প্রাণ। আমরা স্ব-বাক, বুঝমান। ওদের ক্ষুধা যন্ত্রণা আর নিরাপত্তা দেয়া তো আমাদেরই কর্তব্য।
প্রতি বেলা খাবারের মুহূর্ত হলে তিন চারটি বিড়াল এসে মিউমিউ করে। অসহায় অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়, যাতে মাছের কাঁটাটা, মাংসের হাড্ডিটা,...
