হেবাল একটি অদ্ভুত রাজ্যের নাম। এখানকার রাজা আর প্রজা সবাই সুখী। রাজার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ প্রত্যেকের মাঝে। এই রাজ্যে কৃষকরা চাষ করে খুশি আর মজুরেরা মজদুরি করে খুশি। মানুষের মধ্যে কোনো হিংসাবিদ্বেষ নেই, সবাই মিলেমিশে ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করছে। হেবাল রাজ্যে অনেক সুন্দর বাগান রয়েছে, এখানে সারা বছর বিভিন্ন ধরনের ফুল ও ফল পাওয়া যায়। এই রাজ্যে একটি অভয়ারণ্যও রয়েছে, সেখানে অনেক সুন্দর পশু-পাখি একসাথে বাস করে।
হেবাল রাজ্যের রাজা হিরন অত্যন্ত ধার্মিক আর পরোপকারী, প্রজাদের বিশেষ যতœ নেন। প্রজাদের সুবিধার জন্য তিনি রাজ্যজুড়ে সুন্দর বাসস্থান তৈরি করেছেন, খাদ্যের কোনো অভাব নেই। তাই প্রজারা সবসময়ই রাজার প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানায়। রাজা হিরনের রাজ্যে সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল, আচমকা কী যে হলো, কয়েক মাস ধরে মানুষ ভয় ও নিরাপত্তাহীনতায় উদ্বিগ্ন হচ্ছে। কারণ সারা রাজ্যে কৃষিকাজ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, বাড়ির জিনিসপত্র নিরাপদ হচ্ছে না, এমনকি খাবারের জিনিসপত্রও ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে না। কিছু অদৃশ্য শক্তি গোটা রাজ্যের মানুষকে কষ্ট দিচ্ছে, যার কারণে এখানকার মানুষ এখন বিচলিত হয়ে রাজ্য ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
রাজা হিরন উদ্বিগ্ন হতে লাগলেন। চিন্তিত হলেন এই ভেবে যে, এই রাজ্যে এখানকার মানুষ বাস করে, এখানে যদি কেউ না থাকে তাহলে এই রাষ্ট্র অস্তিত্ববাদ থেকে বিলুপ্ত হবে, এটি অস্তিত্বহীন হয়ে যাবে। এটি একটি ভুতুড়ে ধ্বংসাবশেষ ছাড়া আর কিছুই হবে না। এ কারণে রাজা হিরন প্রজাদের চেয়ে বেশি চিন্তিত, তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না।

রাজা হিরন রাজদরবারে কয়েকজন বুদ্ধিমান লোককে ডেকে রাজ্যের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত করেন। জ্ঞানী লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। অনেক চিন্তাভাবনার পর জানা গেল, গোটা রাজ্যে কিছু অদৃশ্য শক্তি জেগে উঠেছে, যার কারণে এখানকার মানুষ অতিষ্ঠ। এই অদৃশ্য শক্তিগুলোকে যদি রাষ্ট্র থেকে বিতাড়িত করা হয় বা তাদের নির্মূল করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রে আবার শান্তি আসবে। সমস্ত বুদ্ধিমান লোকের সাথে পরামর্শ করার পরে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, রাজ্য থেকে একজন প্রমাণিত বুদ্ধিমান একজনকে ডাকতে হবে, কেবল তার মাধ্যমেই এ সঙ্কট এড়ানো যেতে পারে। কিন্তু রাজ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান কে এই নিয়ে মতবিরোধ দেখা গেল। কেউ বলল রাজা সবচেয়ে বুদ্ধিমান, কেউ বলল মন্ত্রী, কেউ আবার বিভিন্ন লোকজনের নাম বলাবলি করল। রাজা সিদ্ধান্তে আসতে কিছু দিন সময় নিলেন। একদিন রাতে ঘুমের ভেতর স্বপ্নে দেখেন, রাজ্যের পাশে এক বালক আছে। বাবার সঙ্গে বালকটি কৃষিকাজ করে। জমিতে যেসব ফসল উৎপাদন হয় তার অর্ধেক গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিলিয়ে দেয়। আর বাকি অর্ধেক বাজারে বিক্রি করে ওজনের মাপ ঠিক রেখে।
স্বপ্ন ভেঙে রাজা জেগে ওঠেন। রাজ্যে নিজেই খোঁজ নিতে থাকেন স্বপ্নে দেখা বালকের। অবশেষে পেয়ে গেলেন সেই বালকের দেখা। রাজা ভূত তাড়াতে বুদ্ধিমান বালকের কাছে সাহায্য চাইলেন। রাজা নিজে হেঁটে বুদ্ধিমান বালকের বাড়ি গিয়ে তাকে সালাম করলেন। রাজ্যে আসা সব দুর্যোগ ও সঙ্কটের কথা জানান। সব পরিস্থিতি জেনে বুদ্ধিমান বালক তৎক্ষণাৎ রাজাকে সাহায্য করতে রাজি হলো। বুদ্ধিমান বালক রাজাকে আশ্বস্ত করে তার রাজ্যে ফিরে যাওয়ার কথা বলে আরো বলল, আগামীকাল সকালে এসে আমি আপনাকে এসব অদৃশ্য শক্তিকে আপনার রাজ্য থেকে মুক্ত করতে সাহায্য করব।

বালক রাজাকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে রাজা তার রাজ্যে আসেন। রাজা মনে মনে ভাবেন, বালকটি অবশ্যই আমাদের রাজ্যকে এ সঙ্কট থেকে বের করে আনবেন।
ভোর হতে না হতেই সারা রাজ্যে এক মধুর শব্দের জগৎ বেজে উঠল, সবাই অবাক হয়ে ভাবল কোথা থেকে এমন মিষ্টি আওয়াজ আসছে, যা এত আকর্ষণীয় ও মোহনীয় মনে হচ্ছে। সবাই অবাক হয়ে এ শব্দের উৎস খুঁজতে থাকে; কিন্তু এই সুমধুর ধ্বনিটি অদৃশ্য শক্তির পছন্দ হলো না, তারা এ সুরেলা ধ্বনি শুনে বিরক্ত হয়ে এ ধ্বনির উৎসের কাছাকাছি পৌঁছে গেল। সেখানে পৌঁছে তারা দেখতে পেল একজন বালক কী যেন পড়ছে, সেই পড়ার সুরে এ মধুর ধ্বনি বাজছে। সেই অদৃশ্য শক্তিগুলো বালককে পড়তে নিষেধ করল; কিন্তু বালক তাদের কথায় কান না দিয়ে ক্রমাগত স্পষ্ট উচ্চারণে পড়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে এ শব্দ অদৃশ্য শক্তির শক্তি কেড়ে নিচ্ছে। ভূত বালককে আক্রমণ করার চেষ্টা করল। সব অদৃশ্য শক্তি একত্রে বালককে আক্রমণ করার চিন্তা করল; কিন্তু কেউই সফল হতে পারল না। কারণ বালক একজন সৎ মানুষ। তার ক্ষতি করা এসব অদৃশ্য শক্তির নিয়ন্ত্রণে নেই। অনেক চেষ্টার পর সবাই একসাথে হাত গুটিয়ে বালকের সামনে দাঁড়াল এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ক্ষমা চাইতে শুরু করে। বালক একটি শর্তে তাদেরকে মুক্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলো যে, ভবিষ্যতে তারা কাউকে অযথা কষ্ট দেবে না। সমস্ত অদৃশ্য শক্তি এক কণ্ঠে বালকের কথা মেনে নিলো। রাজার রাজ্য থেকে দূরে সরে গেল।
রাজা হিরন আবার বালককে সালাম করলেন এবং কৃতজ্ঞতা জানালেন। এখানকার লোকেরাও বালককে তার জ্ঞান ও নিঃস্বার্থ সেবার জন্য প্রশংসা করল। তাকে সালাম করে ধন্যবাদ জানাল, বালকের কারণেই আজ তাদের জীবন সমস্যামুক্ত।
রাজা হিরন বালককে অনেক উপহার দিয়ে খুশি করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। বালক সানন্দে রাজার হাদিয়া তোহফা গ্রহণ করল। কিন্তু রাজার কাছ থেকে বিদায় নেয়ার আগেই সব উপহার রাজ্যের সাধারণ মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিয়ে হাসিমুখে বিদায় নিয়ে চলে গেল।