সকাল থেকেই নাহিমের মনটা খারাপ। এক জায়গাই ঠাঁয় বসে আছে। কারো সাথে কোনো কথা নেই। বাবা টুকুকে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। সেদিকেই অপলক থাকিয়ে আছে নাহিম। ও! বলাই হয়নি টুকু হচ্ছে নাহিমের পোষা ছাগলের নাম। আজ হাটে নিয়ে যাবে টুকুকে। ভাবতেই চোখ ফেটে কান্না এলো নাহিমের। বাবা যেদিন টুকুকে প্রথম নিয়ে এসেছিল তখন সে বাচ্চা বলা চলে। লাফিয়ে লাফিয়ে এদিক সেদিক দৌড়ে বেড়াত। তখন নাহিম কি যে খুশি হয়েছিল। আজ দেখতে দেখতে দু’টি বছর খেটে গেল। সেই ছোট্ট টুকু নাহিমের কাঁধ বরাবর হয়ে উঠল। নাহিম টুকুকে খুব ভালোবাসে। সে আদর করে খাইয়ে না দিলে টুকু খাবেই না। স্কুল থেকে এসেই নাহিম টুকুকে নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করত। টুকুর জন্য ঘাস কাটা কিংবা কাঁঠালের পাতা এনে দেয়া এ ছিল নাহিমের নিত্যদিনের কাজ।
নাহিমের আজ কত কথাই না মনে পড়েছে। কত রাগ, অভিমান, আনন্দ ভাগাভাগি করেছে টুকুর সাথে। টুকু বুঝত কখন নাহিম রেগে আছে কিংবা আনন্দে মনটা গদগদ করছে। কতবার যে টুকু খেতে চাইত না বলে ঝাড়ি দিয়েছে সে। ঝাড়ি বা বকাবকি করলে টুকু ফ্যাল ফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকত তার দিকে। কতবার যে নাহিমের কাঁধে মাথা দিয়ে ঘুমিয়েছে টুকু। মাকে গিয়ে কাঁদো কাঁদো গলায় নাহিম বলল, তুমি বাবাকে বলো না, টুকুকে যাতে বিক্রি না করে। পাগলামো করিস না নাহিম। টুকুকে তো আমরা আর সারা জীবন রেখে দিতে পারি না। মায়ের সেই একই উত্তর যা কয়েকদিন ধরেই শোনে আসছে। আমি বরং তোর বাবাকে বলতে পারি তোর জন্য আরেকটি ছাগল আনার কথা। এই টানাটানির সংসারে কেমনে দিন পার করছি সে খবর রাখিস তুই। ছাগলটা বেচে নতুন টিন দিতে হবে চালে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরটা ভেসে যায়। শুরু হলো মায়ের লেকচার। নাহিম আর কিছুই বলে না। বাবার কাছে গিয়ে বলল, বাবা আমিও তোমার সাথে টুকুকে নিয়ে হাটে যাব। বাবা মানা করলেন না। কিন্তু শর্ত দিলেন, হাটে গিয়ে কোনো অজুহাত দেখাতে পারবে না টুকুকে নিয়ে। কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে পড়ল হাটের দিকে।
হাটে গিয়ে নাহিম তো অবাক কত গরু ছাগল। বাবার সাথে ক্রেতারা দর কষাকষি করছে। নাহিম টুকুর গলা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। একপর্যায়ে ৪০ হাজার টাকায় বিক্রি করা হলো টুকুকে। নাহিম কিছুতেই টুকুকে ছাড়বে না। বাবা বারবার তার শর্তের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা। এক সময় নাহিম কেঁদেই দিলো। তখন টুকুর দুচোখও টলমল করছে। মানুষের ভিড় জমে গেল। সবাই বুঝাচ্ছে নাহিমকে। শেষে বাবা বললেন, যা তুর জন্য আজকেই আরেকটি ছাগল কিনে নিয়ে যাব। নাহিম চোখ মুছতে মুছতে বলল, সত্যি বলছ তো। এবার বিদায়ের পালা, ক্রেতা টুকুকে নিয়ে যাচ্ছে। নাহিম শেষবারের মতো টুকুকে আদর করে দিচ্ছে। সে স্পষ্ট দেখতে পেল, টুকুর দুচোখ বেয়ে পানি পড়ছে।
সকাল থেকেই নাহিমের মনটা খারাপ। এক জায়গাই ঠাঁয় বসে আছে। কারো সাথে কোনো কথা নেই। বাবা টুকুকে পরিষ্কার করে দিচ্ছে। সেদিকেই অপলক থাকিয়ে আছে নাহিম।...
