বাঁশগাছে ঘেরা। বাঁশজঙ্গলের ভেতর থেকেই আসছে একটা পাখির ডাক। কী পাখি? এক বার, দু’বার, তিনবার ডাকল। চারবারের বেলায় বাঁশঝাড়ের মধ্য থেকে বেরিয়ে এলো টুনা। ডেকে ডেকে জবাব দিলো সেও। বেশ কয়েকবার। তারপর টোনার শব্দ থেমে গেল। কিন্তু একেবারে সামনে ফের সেই ডাক! দেখে অদূরে কঞ্চির ওপরে বসে আছে একটা পাখি। এদিক-ওদিক দেখছে। কোথা থেকে আওয়াজটা আসছিল বোঝার চেষ্টা করছিল বোধহয় ।
ডালে ডালে উড়ে গিয়েই টুনটুনির সাথে টুনার দেখা হলো। টুনা টুনটুনির পাশে গিয়ে বসল। তারপর ওদের মধ্যে কিছু আলাপচারিতা হলো। টুনা বলল, টুনটুনি তুমি দেখতে খুবই সুন্দর। আমি কিন্তু তোমাকে আমার ভালো বন্ধু ভেবে নিয়েছি। টুনি লজ্জা পেয়ে বলল, আমি আবার কী রকম সুন্দর? দেখতে আমি একদম পিচ্চি!

তাতে কী হয়েছে? আমিও তো তোমার মতোই ছোট। তবে তোমার চেয়ে ওজনে দুই-তিন গ্রাম বেশি হবো। যা হোক, তোমার বাবা-মা আছে?
হ্যাঁ আছে। তবে আমি উড়তে শেখার পর তারা আমাকে একা রেখে চলে গেছে। যাওয়ার সময় শুধু এতটুকু বলে গেছে- দেখো টুনি, তুমি এখন বড় হয়েছ, উড়তে শিখেছ। এবার নিজের পায়ে দাঁড়াও। ভালো একজন বন্ধু দেখে বিয়ে করে ফেলো। আমরা চলে যাচ্ছি অন্য কোনো গ্রামে। নতুন বাসা বানাব আমরা। তারা চলে গেছে। তারপর থেকে আমি একদম একা। সারাদিন খাবার খুঁজতে খুঁজতে আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি। রাতে ঘুমানোর জন্য কোনো বাসা নেই। গাছের ডালে বসেই রাত কেটে যায়।
আচ্ছা আমিও তো তোমার মতোই একা বন্ধু। বন্ধু হিসেবে যদি আমাকে পছন্দ হয় তাহলে চলো বিয়ে করে একসাথে বাসা বানিয়ে থাকি।

আমাদের বিয়েতে কি আনন্দ হবে না?
আমাদের বিয়ে করাটাই তো আনন্দের। তাছাড়া আমরা কি মানুষ যে, আমাদের বিয়েতে আত্মীয়স্বজনরা আসবে, নেচে গেয়ে আনন্দ করবে?
আমরা মানুষ হলে কত ভালো হতো তাই না? ওদের কাছে দেখো কত খাবার! যখন খুশি তখন রান্না করে। যখন খুশি তখন খেতে পারে।
হ্যাঁ, ওরা যদি সামান্য শস্যদানা আমাদের দেয় আমরা তাতেই খুশি।
কথা বলতে বলতে টুনা আর টুনি মধ্যে বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। পরস্পর কাছাকাছি এগিয়ে বসল দু’জন। তারপর ডানা দিয়ে একজন আরেকজনকে মাথায় হাত বুলিয়ে বন্ধুত্ব প্রকাশ করল। দু’জনই বিয়ে করে ফেলল। এরপর এলো ঘর বানানোর স্বপ্ন। টুনি বলল, আচ্ছা টুনা, এখন কি আমাদের একটা ঘর বানানো দরকার না?
অবশ্যই টুনি।

কিন্তু আমি তো জানি না কিভাবে ঘর বানাতে হয়।
আরে বোকা টুনি, চেষ্টা করলে ওপরওয়ালা আমাদের মাথায় বুদ্ধি দিয়ে দেবেন। কোনো সমস্যা হবে না। দরকার হলে আমরা জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে দেখব অন্যরা কেমন করে ঘর বানিয়েছে। চলো আমাদের আজকের রাতটা গাছের এই ডালেই গল্প করে কাটিয়ে দিই। কাল থেকে আমরা একসাথে থাকব, একসাথে উড়ব, একসাথে ঘুরব। তারপর যখন তোমার পেটে ডিম আসবে তখন অবশ্যই ঘর বানিয়ে নেবো। ডিমকে বাঁচানোর জন্য আমাদের যা কিছু করণীয় আমরা সবই করব। আমাদের ছানারাই তো আমাদের পরবর্তী বংশধর।
টুনি চিন্তিত হয়ে বলল, কিন্তু জানো তো, মানুষের সন্তানরা কত দুষ্টু। ওরা বাসা খুঁজে খুঁজে ডিম অথবা বাচ্চা চুরি করে নিয়ে যায়। ওরা কী জানে একটা ডিম দিতে কত কষ্ট!
টুনা বলল, এজন্য আমরা গোপন জায়গায় বাসা বানাব। বেশি উঁচুতে বানানো যাবে না। কিছু হিংস্র পাখি আছে ওরা খেয়ে ফেলবে। নিচু জায়গায় বড় পাতা বিশিষ্ট ঘন জঙ্গলে আমরা বাসা বানাব।
আচ্ছা।

টুনি সম্মতি দিলো।
পরদিন থেকে খাবার খোঁজার পাশাপাশি ছোট ছোট তুলা, খেঁজুর গাছের আঁশ এবং প্রয়োজনীয় খড়কুটো জোগাড় করতে লাগল। কিছু দিন পর তাদের ডুমরা পাতার একটা ঘর হলো। এটাই দু’জনের রাজপ্রাসাদ। কিছু দিন পর টুনটুনি ডিম পাড়ল। তারপর ক্রমাগত ডিমে তা দিতে লাগল। টুনা বলল, তুমি এখন থেকে ডিমে তা দিতে থাকো। আমি তোমার জন্য খাবার জোগাড় করে আনব।
টুনি বলল, না টুনা, বাসায় সারাক্ষণ একা থাকতে আমার ভালো লাগবে না। মাঝে মাঝে আমিও বেড়াব।
টুনা আনন্দিত গলায় বলল, আচ্ছা আচ্ছা।
শিউলি গাছে দু’টি পাতার মধ্যে নরম ঘাস, তুলো, সুতার টুকরো দিয়ে বাসা তৈরি করেছে টুনা আর টুনি। পাতা দু’টি তুলো দিয়ে এমন কায়দায় সেলাই করেছে, যাতে রোদবৃষ্টি না ঢোকে। লেজ তুলে ‘তুড়ুক তুড়ুক’ নাচতে লাগল দু’জনেই আনন্দে। আহা, কী দারুণ সেই নাচ!