কল্যাণমুখী ব্যাংকিং ধারার প্রবর্তন এবং প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং সেবা দেশের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালের ২২ নভেম্বর সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল) দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। নতুনত্ব ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে ব্যাংকটি দেশব্যাপী বিস্তৃত ১৭৯টি শাখা, ২০৩টি উপশাখা, ৩৭৪টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ২০২টি এটিএম বুথের মাধ্যমে দেশের সর্বস্তরের মানুষের নিকট ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই আধুনিক প্রযুক্তির সাথে কল্যাণময় অর্থনীতির সমন্বয় ঘটিয়ে দেশের প্রথম সারির একটি ব্যাংক হিসেবে গৌরবের সাথে এগিয়ে চলছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সেবার আওতায় এনে সচল রেখেছে অর্থনীতির চাকা। সেই সাথে শিল্পায়ন ও ব্যবসা বাণিজ্যের গতিশীলতায় কৃষি, বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো এবং আবাসন খাতসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পাশাপাশি নানামুখী সামাজিক কর্মকাণ্ডও সফলতার সাথে পরিচালনা করছে।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক দেশের আপামর জনসাধারণ বিশেষ করে বিশাল যে জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছে তাদের দোরগোড়ায় ব্যাংকিং সেবা পৌঁছে দিচ্ছে। আর সে লক্ষ্যেই ব্যাংকটি বিভিন্ন পেশা ও শ্রেণীর মানুষের কথা বিবেচনা করে নতুন নতুন সেবাপণ্য উপহার দিচ্ছে। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের এরকম কিছু ব্যতিক্রমধর্মী জীবনমুখী সেবাপণ্য সম্পর্কে অবহিত করাই এই লেখার উদ্দেশ্য।
প্রথমেই বলি অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কথা। তাদের জন্য রয়েছে ‘এসআইবিএল রিটায়ার্ড সিটিজেন মাসিক বেনিফিট স্কিম’ নামে একটি বিশেষ সঞ্চয়ী হিসাব। এই হিসাবে সঞ্চিত অর্থের বিপরীতে হিসাবধারীকে প্রতি মাসে আকর্ষণীয় মুনাফা প্রদান করা হয়, যা দিয়ে তিনি মাসিক খরচ মেটাতে পারেন এবং তিনি একজন কর্মময় মানুষের মতো জীবন-যাপন করতে পারেন। এই স্কিমের আওতায় হিসাবধাারীদের জন্য বিশেষ সেবাও দিচ্ছে এসআইবিএল। তাদেরকে এসআইবিএলের নিজস্ব হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের এসআইবিএল ফাউন্ডেশন হাসপাতালে চিকিৎসা ও ডায়াগনসিসের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ ডিসকাউন্ট দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকা সিটির মধ্যে হিসাবধারীদের বাসা থেকে হাসপাতালে আনা নেয়ার সুবিধা এবং গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে অ্যাম্বুল্যান্স সেবাও প্রদান করা হয়। এই ব্যাংকটি আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি ব্যাংক। এসআইবিএলের নিজস্ব অ্যাপটি খুবই গ্রাহকবান্ধব। এসআইবিএল নিউ অ্যাপ ব্যবহার করে বিদেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশীরা মোবাইল থেকেই বিদেশ থেকে ই-অ্যাকাউন্ট খুলতে পারছেন। এই হিসাব খুলে এনআরবি অ্যাকাউন্ট হোল্ডার একটি ডুয়াল কারেন্সি ডেবিট কার্ড পাচ্ছেন যা দিয়ে দেশে-বিদেশে সব জায়গায় কেনাকাটা, টাকা উত্তোলন ও অনলাইন ট্রানজেকশন করা যায়। এ ছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য ব্যাংকটি চালু করেছে এসআইবিএল প্রবাসী ডিপোজিট স্কিম। এই স্কিমের আওতায় গ্রাহকদের আকর্ষণীয় মুনাফা প্রদান করা হয়। এখানে যেকোনো প্রবাসী বাংলাদেশীর ব্যাংক হিসাবে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা থাকলেই বিশেষ সুবিধা দিচ্ছে ব্যাংকটি। ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গাড়ি দিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে প্রবাসী গ্রাহককে ঢাকা সিটির মধ্যে বাসা বা সুবিধাজনক স্থানে পৌঁছে দিচ্ছে। পাশাপাশি দেশে এসে অসুস্থ হলে এসআইবিএল ফাউন্ডেশন হাসপাতালে বিভিন্ন পরীক্ষায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ডিসকাউন্ট সুবিধাও উপভোগ করতে পারছেন প্রবাসী গ্রাহকগণ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বেতন ও অন্যান্য টিউশন ফি সংগ্রহ এবং শিক্ষার্থীদের টাকা জমাদানকে সহজ করতে অতি সম্প্রতি চালু করা হয়েছে অনলাইন ফি কালেকশন সিস্টেম এসআইবিএল এডুপে । এর মাধ্যমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী উভয়ই দ্রুত ও সহজে লেনদেন করতে পারবেন। এছাড়াও কনজ্যুমার বিনিয়োগের আওতায় শিক্ষার্থীদের অতি প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস যেমন- কম্পিউটার, ল্যাপটপ, মোবাইল ইত্যাদি শিক্ষা উপকরণ ক্রয়ের জন্য বিনা জামানতে বিনিয়োগ গ্রহণের সুবিধা রয়েছে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে।
মানুষের মৌলিক বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যাংক চালু করেছে এসআইবিএল শিক্ষা সঞ্চয় স্কিম, চিকিৎসা সঞ্চয় স্কিম এবং বিবাহ সঞ্চয় স্কিম নামে তিনটি নতুন ডিপোজিট প্রোডাক্ট। এই প্রোডাক্টগুলোর অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো এগুলো শুধু সঞ্চয় প্রকল্পই নয়, প্রয়োজনে এসব স্কিমের বিপরীতে সঞ্চয়ের দ্বিগুণ বিনিয়োগ গ্রহণের সুবিধা রাখা হয়েছে। এই স্কিমগুলোও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
রাজধানীসহ বড় বড় শহর শহরগুলোতে দেখা যায় হাজার হাজার হকার ভাসমানভাবে ব্যবসা করছেন। এদেরকে ব্যাংকিং চ্যানেলে আনয়নের জন্য চালু করা হয়েছে হকার্স ডিপোজিট এবং ব্যবসা উন্নয়ন স্কিম। হকাররা এই স্কিমের আওতায় সঞ্চিত ডিপোজিটের সাথে ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ নিয়ে স্থায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন। আবার একইভাবে ড্রাইভিংকে পেশা হিসেবে নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন অনেকে। তারা নিজের মনে একটি গাড়ির স্বপ্ন লালন করেন সবসময়। ড্রাইভার ভাইদের এই স্বপ্ন পূরণে চালু করা হয়েছে ড্রাইভার ডিপোজিট স্কিম নামে একটি বিশেষ সঞ্চয় স্কিম। এই স্কিমের বিপরীতে তারা তাদের সঞ্চিত ডিপোজিটের সাথে ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ নিয়ে গাড়ি ক্রয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন।
প্রচলিত এসব ব্যাংকিং খাতের বাইরেও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে রয়েছে পারিবারিক ক্ষমতায়নে ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স প্রোগ্রাম। ‘দরদী সমাজ গঠনে সমবেত অংশগ্রহণ’ এই ধারণাকে সামনে নিয়ে গ্রাম ও শহরের দরিদ্র জনগণের আয় বৃদ্ধিতে সহায়তা এবং সমাজের অপ্রতিষ্ঠিত খাতে এই বিনিয়োগ প্রদান করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে সবাইকে অধিকতর নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনে সহায়তা করে আসছে এই ব্যাংক। শহরভিত্তিক অর্থনীতির পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে এসআইবিএল দেশের শহর এবং গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকিং সেবা চালু রেখেছে যার মাধ্যমে গ্রাম এবং শহরে অংশীদারিমূলক অর্থনীতির বিকাশ ঘটাতেও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এসআইবিএল।
অন্যদিকে এই ব্যাংকের উদ্যোগে স্বেচ্ছামূলক খাতের আওতায় ক্যাশ ওয়াক্ফ তহবিল পরিচালনা, মসজিদ-মাদরাসা উন্নয়ন, পথশিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা, প্রান্তিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে চিকিৎসাসেবা প্রদান এবং ওয়াক্ফ উন্নয়নসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছামূলক খাত পরিচালিত হচ্ছে। ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার গোড়াতেই সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ক্যাশ ওয়াক্ফের মতো সেবা চালু করে বাংলাদেশ এবং সারা বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সমাজের সর্বস্তরে ক্যাশ ওয়াক্ফ ব্যাপক সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। ধর্মপ্রাণ এবং সম্পদশালী মানুষ সহজেই এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করে এসআইবিএলের সোশ্যাল ফান্ডকে সমৃদ্ধ করে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষের কল্যাণে অংশগ্রহণ করতে পারেন অন্যদিকে তেমনি পারলৌকিক প্রশান্তি লাভ করতে পারেন।
ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর মধ্যে জাকাতের গুরুত্ব অনেক। জাকাত আদায় সহজতর ও নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে জাকাত আদায়কারীর পাশে দাঁড়িয়েছে এসআইবিএল। চালু করেছে প্রশান্তি নামে মুদারাবা জাকাত সঞ্চয়ী হিসাব। এই হিসাব খুলে বছরব্যাপী কিছু কিছু টাকা সঞ্চয় করে বছরান্তে জাকাত আদায় করা সহজসাধ্য হয়। আবার খেয়াল করুন বিবাহের ক্ষেত্রে স্ত্রীর মোহরানা আদায়ও স্বামীর জন্য ফরজ। এই ফরজ বিধান পরিপালনের সুবিধার্থে এই ব্যাংকে সোনালি কাবিন নামে মুদারাবা মোহর সঞ্চয় স্কিম রয়েছে। এই স্কিমে সঞ্চয় করে সহজেই মোহরানা আদায় করা যায়।
জীবনঘনিষ্ঠ এসব সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়ে তাদের জীবনমান উন্নয়নের মাধ্যমে জীবনকে সহজ ও সুন্দর করার মাধ্যমে মানবকল্যাণই আসলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।
সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক শুরু থেকেই করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটির (সিএসআর) আওতায় ব্যাংকের অর্জিত আয়ের একটি অংশ সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করে। বিশেষ করে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা ও জাতীয় ইস্যুতে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে এসআইবিএল মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। এসআইবিএল ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেও নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এসআইবিএল ফাউন্ডেশন হাসপাতাল যার মাধ্যমে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ স্বল্প খরচে আধুনিক মানের চিকিৎসাসেবা নিতে পারছেন। এভাবে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ক্রমশ গণমানুষের ব্যাংকে পরিগণিত হয়েছে।
লেখক : এসভিপি, বিভাগীয় প্রধান, মার্কেটিং অ্যান্ড ব্র্যান্ড কমিউনিকেশন ডিভিশন, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড
