বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম
(পরম করুনাময় আল্লাহর নামে)

সকল প্রশংসা আল্লাহর প্রতি। শান্তি বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মদ সা:-এর প্রতি এবং তাঁর সম্মানীত পরিবারবর্গ ও সাহাবিদের প্রতি।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আজ সৌদি আরবের ৯৩তম জাতীয় দিবস। এই দিনটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের। দিবসটি উপলক্ষে প্রতি বছরের মতো এবারও আপনাদের সবাইকে স্বাগত জানাই। প্রথমত দিন থেকে দিবসটি ঐতিহাসিকভাবে স্মরণীয়। ইতিহাসের পাতায় অমলিন ও খোদাই করা এই দিন সৌদি নাগরিকদের হৃদয়ে স্মরণীয় ও চিরভাস্বর।

বাদশাহ আব্দুল আজিজ বিন আব্দুর রহমান আল-সৌদ (আল্লাহ তার কবরকে শান্তিময় করুন) এই দিনে পবিত্র ভূখণ্ডকে খণ্ডবিখণ্ড হওয়ার পর একীভূত করেছেন। বিভক্তি ও শত্রুতার বদলে ঐক্য, সংমিশ্রণ এবং সংহতিতে পরিবর্তন করেছেন। আমাদের দেশ ঐতিহাসিক দিনটি (৯৩তম জাতীয় দিবসের বার্ষিকী) উদযাপন করছে। এটি একটি চিরস্মরণীয় ঘটনা। গৌরবময় এ দিন উপলক্ষে নতুন প্রজন্ম এই বিশাল ভূখণ্ডের নির্মাণের সাথে যে মূল্যবোধ, উপলব্ধি, ত্যাগ এবং অসাধারণ যে সব প্রচেষ্টা রয়েছে তা বুঝতে পারে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর অনুগ্রহে আমাদের দেশ যে কল্যাণ ও স্থিতিশীলতায় বরকতময় সেই ভূমির অভিবাসী হয়ে আমরা তার প্রতি নিজেদের ভালোবাসা এবং শুভ কামনা জানাতে দিবসটি উদযাপন করছি।
বিশ্ব সভ্যতা প্রত্যক্ষ করেছে, কয়েক বছরে সব ক্ষেত্রে সৌদি আরবে নজিরবিহীন উন্নয়ন হয়েছে। এ সময়ে অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত এবং নিরাপত্তা ক্ষেত্রে এ দেশের অর্জন পরিমাপের বাইরে; যা বর্ণনা করা সত্যিই কঠিন। সৌদি আরব আঞ্চলিক পরিধিতে স্থিতিশীলতা, সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের একটি আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠেছে। রাজ্যের ভিশন ২০৩০-তে জীবনের সব দিক থেকে একটি ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা হয়েছে; যা অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং সভ্যতার দিকে দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট একটি বিবরণ। ২০৩০ ভিশন দুই পবিত্র মসজিদের তত্ত্বাবধায়ক এবং যুবরাজের নেতৃত্বে তার বিচক্ষণতা এবং বুদ্ধিমত্তায় বরকতময় এই দেশের নাগরিকদের অবদান এবং তাদের মিথস্ক্রিয়াগুলোর প্রয়োজনীয়তা চিত্রিত করে।

সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কয়েকটি বাক্যে ব্যক্ত করলে বলতে হয়, এর মধ্যে রয়েছে বিশাল প্রকল্প, উদ্যোগ, ভবিষ্যতের উজ্জ্বল এবং গভীর জীবন দর্শনের পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই উন্নয়নের প্রতি উচ্চাকাক্সক্ষা। যেটি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী, মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আবদুল আজিজের পরিকল্পনায় করা হয়েছে- (আল্লাহ তাদের উভয়কে হেফাজত করুন)।
ভিশন ২০৩০ নিম্নলিখিত তিনটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে প্রণয়ন করা হয়েছে: ১. সমাজ, ২. সমৃদ্ধ অর্থনীতি এবং জাতীয় আকাক্সক্ষা।
আজ জাতীয় দিবস উপলক্ষে আপনাদের কাছে উল্লেখ করতে চাই, এই পবিত্র ভূমি ওহির অবতরণের স্থান, আল্লাহর বাণীর সূচনা এবং মুসলমানদের কেবলা। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে এ রাষ্ট্র ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি অত্যন্ত গুরুত্ব ও মনোযোগ দিয়েছে। তাই এটি বিশ্বের সব জায়গায় অনেক মসজিদ এবং ইসলামী কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। সৌদ রাজবংশের শাসনামলে, দুই পবিত্র মসজিদ পূর্ববর্তী সব যুগের তুলনায় সবচেয়ে সম্প্রসারণ কাজের সাক্ষী হয়েছে। ফলে হজ পালন এখন খুব সহজ হয়েছে। কারণ, হজ পালনকারীদের হজযাত্রা সহজ করতে নতুন কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। হজযাত্রীদের মহৎ উদ্দেশ্য, আগ্রহ এবং আরামের সব উপায়-উপকরণের ব্যবস্থা হজের আনুষ্ঠানিকতাকে হজযাত্রী এবং মসজিদে নববীর দর্শনার্থীদের জন্য আরো সহজ এবং আরামদায়ক করা হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী এবং নিকটবর্তীরা দেখছেন, এই দেশের সব সম্ভাবনাকে তাদের সেবায় সর্বান্তকরণে ব্যবহার করা হচ্ছে। নবীর শহরে একটি কুরআন মুদ্রণ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠা করে সারা বিশ্বে শান্তি ও স্থিতিশীলতার বার্তা ছড়িয়ে দিতে, বিভিন্ন ভাষায় কুরআনের তরজমাসহ লাখ লাখ কপি বিতরণ করা হয়েছে।

সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক গভীর এবং অসামান্য মর্যাদায় উত্তীর্ণ। যা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে দুঃসময়ে সৌদি আরব বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াতে এবং সাহায্য করতে কোনো কার্পণ্য করে না। বাংলাদেশ মুসলিপ্রধান দেশ হওয়ায় ইসলামকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। এ কারণে সৌদি আরবকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসে।
সৌদি আরব বিশ্বের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হিসেবে স্বীকৃত। দেশের বিভিন্ন খাতে লাখ লাখ বাংলাদেশী কর্মরত। সৌদি আরব বাংলাদেশের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সৌদি আরবে কাজের সুযোগ পেয়ে বাংলাদেশী শ্রমিকরা তাদের পরিবারের সদস্যদের কাছে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রবাসী আয় পাঠাচ্ছেন।

উপকূলীয় অঞ্চলে বাংলাদেশের অনেক জেলা রয়েছে। যেগুলো প্রতি বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে। সৌদি আরব একটি নেতৃস্থানীয় দেশ যে সর্বদা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং যখনই বাংলাদেশ দুর্যোগে আক্রান্ত হয় তখনই সাহায্য করে। ২০০৭ সালে বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড় ‘সিডরে’ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ডলারের বিশাল ত্রাণ সহায়তা এবং অনুদান দিয়েছে রিয়াদ। তা ছাড়া বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি হওয়ায় রিয়াদ বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। অনেক বিখ্যাত সৌদি কোম্পানি এবং বিনিয়োগকারী বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। সৌদি সরকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষায় বাড়ি, স্কুল, মসজিদ, এতিমখানা এবং আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি হাসপাতাল, সেতু এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মতো বিভিন্ন প্রকল্পে আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রিয়াদ সফর এবং সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি বেশ কয়েকজনের সফরের পর সৌদি-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হয়েছে। সৌদি মন্ত্রীরা দেশের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সাথে নিয়ে বাংলাদেশ সফর করেছেন।

ওপরে যা বলা হয়েছে তা সৌদি আরবের ধারাবাহিক কর্মকাণ্ডের কিছু উজ্জ্বল আভাস এবং সংক্ষিপ্ত চিত্র। আমি আমাদের জাতীয় দিবস উপলক্ষে আমাদের বাদশা এবং সৌদি নাগরিকদের পক্ষ থেকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি এই বরকতময় ভূমিকে রক্ষা করুন; যিনি আমাদের এ দেশের অধিবাসী হওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছে। আল্লাহ সেই সাথে আমাদের দেশকে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন তাদের ওপর করুণা বর্ষণ করুন। তাদের নেতৃত্বে অশান্ত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার অবসান ঘটানোর তৌফিক দান করুন।
এ আনন্দঘন মুহূর্তে, আমার এবং দূতাবাসের সব কর্মকর্তার পক্ষ থেকে, দুই পবিত্র মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণকারী বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং তার আস্থাভাজন যুবরাজ এবং সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্য এবং বিশিষ্ট সৌদি নাগরিকদের প্রতিও শুভেচ্ছা।
ওয়াস-সালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহ।
ঈসা বিন ইউসুফ আল দুহাইলান
ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূত