একজনকে অবশ্যই জানতে হবে কার শরীরে কোলেস্টরলের মাত্রা কত। বয়স বাড়ার সাথে সাথে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যায়। ২০ অথবা এর চেয়ে বেশি যাদের বয়স, তাদের রক্ত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত। বয়স ৪০ হয়ে গেলে তাদের সবারই রক্ত বছরে একবার করে পরীক্ষা করে দেখা উচিত। যাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, ডায়াবেটিস আছে, ধূমপানের ও মদপানের অভ্যাস আছে, অতিরিক্ত মেদ ভুঁড়ি আছে এবং যাদের পরিবারে ও বাবা-মায়ের হৃদরোগ হওয়ার ইতিহাস আছে, তাদের ছয় মাস অন্তর রক্ত পরীক্ষা করে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা দেখা উচিত। কারো রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে কোলেস্টেরলের মাত্রা ২০০ মিলিগ্রামের বেশি হলে কিংবা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের (এলডিএল) মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারের ১০০ মিলিগ্রাম বেশি হলে তা বিভিন্ন উপায়ে কমিয়ে আনতে হবে। যাদের হৃদরোগ হওয়ার মতো ঝুঁকির উপাদান বেশি রয়েছে তাদের সেই ঝুঁকি কমাতে ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে ৭০ মিলিগ্রামের নিচে রাখতে হবে। আর যাদের হৃদরোগের ঝুঁকির উপাদান নেই ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারের ১৬০ মিলিগ্রামের নিচে রাখা উচিত। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায় রাখা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। কিছু কৌশল অনুসরণ করলে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

নিয়মিত হাঁটা ও পরিমিত ব্যায়াম
শারীরিক পরিশ্রম ও ব্যায়াম রক্তের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায় এবং রক্তের উপকারী কোলেস্টেরলের মাত্রা ১০ শতাংশ বাড়ায়। মাঝারি পরিমাণে ব্যায়াম কিংবা জোরে হাঁটলে (মিনিটে ১০০-১২০ কদম) এমন উপকার পাওয়া যায়। সপ্তাহে সাত দিন ব্যায়াম করতে পারলে ভালো। তবে ব্যায়াম কমপক্ষে পঁাঁচ দিন অব্যশই করতে হবে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে রাখতে। নৈশভোজের পর ৪৫ মিনিট হাঁটুন। আর কেউ যদি অফিসে চাকরি করেন। তাঁর উচিত অন্তত প্রতি ঘণ্টায় পাঁচ মিনিট হাঁটা বা চলাফেরা করা।

চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার
কোলেস্টেরল কমানোর একটি সাধারণ উপায় হচ্ছে যাবতীয় চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার করা। যেমন ডিমের কুসুম, লাল গোশত (গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ), বড় তৈলাক্ত মাছ (পাঙ্গাস মাছ, রুই মাছের পেটি), দুধ ও দুধ সম্পর্কিত খাবার এমনকি দুধ দেয়া চা ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। মাটির নিচে জন্মে এমন সব সবজি খাওয়ার ওপরও নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। তবে অনেকেই এ কথা স্বীকার করেন যে, শুধু খাবারের চর্বি রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়ায় তা ঠিক নয়, মানুষের শরীরে এমনিতেই প্রতিদিন কোলেস্টেরল তৈরি হয় যা তার বংশগত বা জেনেটিক কারণে হয়ে থাকে। যেসব খাবারে সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি থাকে সেসব খাবারই কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে থাকে। আর যেসব খাবারে অসম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ বেশি যেমন সয়াবিন তেল, সূর্যমুখী তেল, জলপাইয়ের তেল, ছোট মাছ সেসব খাবার খাওয়া উচিত। তবে মুরগির গোশত অনেক ভালো, তবু পরিমাণে কম খেতে হবে।

আঁশযুক্ত খাবার গ্রহণ
যেসব সবজি বা ফলে আঁশ রয়েছে সেগুলো খেলে শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা সঠিক পরিমাণে থাকে। খাবারে থাকা আঁশ পরিপাক নালী থেকে কোলেস্টেরলকে স্পঞ্জের মতো শুষে নেয়।

বেশি করে মাছ খান
মাছ ও মাছের তেল কোলেস্টেরল কমাতে পারে। মাছের তেলে ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে। এটা খুব সহজে রক্ত থেকে কোলেস্টেরল বা অন্যান্য ক্ষতিকর চর্বি কমিয়ে ফেলে। প্রত্যেক সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিনবার মাছ খাওয়া উচিত। অধিকাংশ মাছেই ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে। বিভিন্ন উদ্ভিদজাত খাবারেও ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড পাওয়া যায়। যেমন- সয়াবিন তেল, কাঠবাদামের তেল ইত্যাদিতে।

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুন
অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। সে কারণে ব্যায়াম করে হোক কিংবা ইনসুলিন নিয়ে হোক অবশ্যই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে হবে। ডায়াবেটিস থাকলে শরীরে অন্যান্য অসুখ বাসা বাঁধবে শিগগিরই। ডায়াবেটিস থাকলে শরীরে জীবাণু বাসা বাঁধা ছাড়াও হার্ট, কিডনি, ব্রেইন ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে, একসময় এসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ অকার্যকর হয়ে যাবে। এ ছাড়া শরীরে কোনো ক্ষত হলে তা সহজে শুকাবে না ডায়াবেটিসের কারণে।

ধূমপান পরিহার করুন
ধূমপান করলে রক্তে উপকারী কোলেস্টেরলের পরিমাণ কমে যায়। অতএব রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে অবশ্যই ধূমপান ছেড়ে দিতে হবে। তা ছাড়া ধূমপানে ক্যান্সার হয়ে থাকে, এটা সবাই জানে।

গ্রিন টি সেবন
বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সবুজ চায়ের (গ্রিন টি) ভেতর রক্তের ক্ষতিকারক কোলেস্টেরল কমানোর উপাদান রয়েছে। তাই সবুজ চা সেবন হৃৎপিণ্ডের জন্য উপকারী। কাঠবাদাম ও কাজুবাদাম খেলে রক্তের কোলেস্টেরল কমে। বাদামে প্রচুর ক্যালোরি রয়েছে। এ জন্য পরিমিত পরিমাণ বাদাম খাওয়া উচিত।

ওষুধ সেবন
চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রক্তে কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ ব্যবহার করুন। যেমন- নিয়াসিন, ফাইব্রেটস, স্টেটিন ইত্যাদি। রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে হৃদযন্ত্রের ক্ষতির সাথে সাথে দেহের বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতি হয়। বিশেষ করে যে অঙ্গে প্রান্তিক শিরা থাকে যেমন- চোখ, কিডনি, ব্রেইন, হাত ও পায়ের দূরবর্তী অংশ। ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণ রাখার জন্য যে ধরনের সতর্কতা নিতে হয়, ঠিক একই ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক রাখা বা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য।
লেখক : এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), সদস্য-প্রশাসন, ফুয়াদ ফাউন্ডেশন ও সাবেক পরিচালক, ইবনে সিনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা