বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয় প্রতি বছরই কমছে এবং ব্যক্তির নিজের পকেটের খরচ বাড়ছে প্রতি বছরই। বর্তমানে স্বাস্থ্য ব্যয়ের চার ভাগের এক ভাগই ব্যক্তি তার নিজের পকেট থেকে খরচ করছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭ থেকে ২০২০-এর হিসাব অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদশে মাথাপিছু বার্ষিক স্বাস্থ্য ব্যয় ৫৪ মার্কিন ডলার (পাঁচ হাজার ৯৪০ টাকা)। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্যে মাথাপিছু ব্যয় ছিল ৩৭ মার্কিন ডলার (৪ হাজার ৭০ টাকা)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাবেক আঞ্চলিক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা: এম মোজাহেরুল হক বলেন, বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে মাথাপিছু গড় ব্যয় শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের চেয়েও কম। বাংলাদেশ কেবল স্বাস্থ্যে ব্যয়ের ক্ষেত্রে আফগানিস্তানের চেয়ে ওপরে আছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস ১৯৯৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২০ সালে স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশে মোট ব্যয় হয়েছিল ৭৭ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় হয়েছিল ৬৮.৫ শতাংশ, সরকারের ছিল ২৩.১ শতাংশ, উন্নয়ন সহযোগীদের ব্যয়ের পরিমাণ ৫ শতাংশ। বাকি ৩.৩ শতাংশ ব্যয় ছিল ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় এনজিওর পক্ষ থেকে। ১৯৯৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যে ব্যয়ের হিসাব দেয়া হয়েছে তাতে সরকারের অংশের ব্যয় ক্রমান্বয়ে কমছে এবং ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ক্রমাগতভাবে বেড়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, স্বাস্থ্য খাতে সরকার যে ব্যয় করে, এর ৯৩ শতাংশ আসে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে আসে ১.৬ শতাংশ এবং বাকি ৫.৪ শতাংশ খরচ করে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। হেলথ অ্যাকাউন্টসের তথ্য বলছে, ব্যক্তির পকেট থেকে যে খরচটা হয়ে থাকে এর ৫৪ শতাংশ খরচ করেন উচ্চবিত্ত পরিবারের মানুষ। দরিদ্র শ্রেণী খরচ করে মাত্র ৪ শতাংশ।
চিকিৎসা করাতে গিয়ে ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে সবচেয়ে বেশি ৬৫ শতাংশ খরচ করে ওষুধ কিনতে গিয়ে। বাকি অর্থ ব্যয় হয় বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসকের ফি, হাসপাতালে ভর্তি এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জাম ও সেবা নিতে। ক্যান্সার, কিডনি রোগ বা পক্ষাঘাতের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে শেষ সম্বল বসতভিটাটাও বিক্রি করে দেন। ক্যান্সার, কিডনি, হার্ট ডিজিজের মতো রোগের চিকিৎসা করাতে গিয়ে অনেকে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ‘বাংলাদেশে প্রায় অর্ধকোটি মানুষ প্রতি বছর চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে দরিদ্র হয়ে যাচ্ছে। দারিদ্র্য থেকে উঠে আসতে এসব মানুষের অনেক দিন লেগে যায় অথবা কখনোই আর দারিদ্র্য দূর করতে পারে না।’ চিকিৎসকরা বলছেন, স্বাস্থ্যব্যয়ে ব্যক্তির খরচের লাগাম টেনে ধরতে হলে ওষুধ বাবদ ব্যয় কমাতে হবে। ক্যান্সার, কিডনি, হার্ট ডিজিজ, উচ্চরক্তচাপ, গ্যাস্ট্রিকের ওষুধ কেনা বাবদই মানুষের পকেট থেকে বেশি খরচ হয়ে থাকে। সড়ক ও অন্যান্য দুর্ঘটনায় অঙ্গহানি হওয়ার কারণেও মানুষের ওষুধ কেনার খরচ বাড়ছে।
অন্যদিকে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সম্পর্কে প্রচণ্ড অসচেতনতার পাশাপাশি অত্যধিক মাত্রায় বায়ু, পানি, শব্দ ও প্লাস্টিক দূষণ এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ে ওঠা এবং শহরাঞ্চলে খেলার মাঠ, পার্ক, পাবলিক টয়লেটের অনুপস্থিতি, মানুষের মধ্যে খেলাধুলা কমে যাওয়া ও খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তনের সাথে ভেজাল ও দূষিত খাবারে বাজার সয়লাবসহ নানাবিধ কারণে মানুষের প্রাণঘাতী অসুখ হচ্ছে এবং স্বাস্থ্যের পেছনে খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির ওষুধের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহারও অন্যতম একটি কারণ। এক শ্রেণীর চিকিৎসক রয়েছেন যারা প্রেসক্রিপশনের পাতাটুকু ভরিয়ে ফেলেন ওষুধ লিখে। এর বাইরে রয়েছে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে নিজেই ওষুধ কিনে খাওয়ার প্রবণতা। এতে করে ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় নতুন রোগের উদ্ভব হয়ে থাকে, ফলে খরচ বেড়ে যায়। এছাড়া রয়েছে গ্রাম্য অশিক্ষিত ডাক্তার এবং ওষুধের দোকানের বিক্রেতা কর্তৃক অযাচিত প্রেসক্রিপশন ও ওষুধ বিক্রি। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা কোনো কিছু হলেই ওষুধ খেতে চান এবং খেয়ে থাকেন। এ ধরনের মানুষের বেশি ওষুধ সেবনের অত্যধিক প্রবণতাও ব্যক্তির পকেটের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অনেক মানুষের কাছে চিকিৎসা মানেই ওষুধ সেবন, আশ্চর্য হলেও সত্য, এ ধরনের মানুষ ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে ডাক্তারকে বাধ্য করেন ওষুধ লিখতে।
ওষুধের চাহিদা বেশি থাকায় দেশের অলিগলিতে লাখ লাখ ফার্মেসি গড়ে উঠেছে। মুদিদোকানেও এখন কিছু কিছু ওষুধ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘ওষুধ সেবন সম্পর্কে জনমানুষের ভ্রান্ত ধারণা বন্ধে ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি প্রেসক্রিপশন অডিট চালুকরণ এবং সব ফার্মেসি ও ড্রাগ স্টোরকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় আনতে হবে। তা নাহলে দেশে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন বন্ধ হবে না, ওষুধের অযাচিত ব্যবহারও বন্ধ হবে না।’ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, ‘প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি বন্ধে সব ফার্মেসি ও ড্রাগ স্টোরকে ডিজিটাল সিস্টেম ও প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে কখন কার কাছে কোনো ওষুধ বিক্রি করা হচ্ছে তা মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত। এছাড়া বিক্রেতা ও ক্রেতাকে ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ওষুধ ব্যবহারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা যায়।’

বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে বেশি ব্যয়ের অন্যতম আরেকটি কারণ হলো ওষুধ কোম্পানিগুলোর বেশি বেশি ওষুধ বিক্রির প্রবণতা। মানুষের প্রয়োজন হোক বা না হোক, ওষুধ কোম্পানিগুলোর টার্গেট থাকে ওষুধ বিক্রি বাড়ানো। ওষুধ বিক্রি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ওষুধ কোম্পানিগুলো চিকিৎসকদের নানাভাবে প্রলুব্ধ করে থাকে। চিকিৎসকদের নানা ধরনের সুবিধা দিয়ে থাকে। এর মধ্যে আছে অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট কিনে দেয়া, বিদেশ ভ্রমণের সব খরচ বহন করা, নানা ধরনের দামি উপহার দেয়া অন্যতম। এসব পেয়ে এক শ্রেণীর চিকিৎসক নির্বিচারে ওষুধ লিখে থাকেন প্রেসক্রিপশনে। এভাবে বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে খরচের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ওষুধ উৎপাদন করছে এবং তা বিক্রির জন্য অ্যাগ্রেসিভ মার্কেটিংসহ নানা কূটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে ওষুধ বিক্রি করছে।