কাশফুলের ঝুপড়ি নিয়ে হাঁটছে রাহাত। শরতের নির্মল সমীরণে ঝুপড়ির কাশফুলগুলো ছুঁয়ে দিচ্ছে রাহাতের ঘনকালো চুলগুলো। গোধূলিলগ্নে সূর্যের কসুমবর্ণ আলো কাশফুলের শুভ্রতায় তৈরি হচ্ছে মোহনীয় রূপ। রাহাত আকাশের বুকে চোখ তুলে তাকায়। তার দেখাদেখি কাশফুলগুলোও আকাশের দিকে তাকায়। শরতের নীলাকাশ কখনো ঝাঁ ঝাঁ রোদ্রে ছেয়ে যায়। আবার কখনো বা হঠাৎ নেমে আসে ঝুমবৃষ্টি। এখন আকাশটা কিছুটা স্বচ্ছ। নীলের সামিয়ানায় শিমুল তুলার মতো উড়ে যাচ্ছে মেঘেদের ভেলা। আড়ালে লুকিয়ে আছে একটু পরের জন্য জেগে ওঠা শুভ্র চাঁদ। রাহাত কাশফুলের দিকে তাকায়। কাশফুলগুলোও রাহাতের চোখে চোখ রাখে। আলতো করে ছুঁয়ে দেয় রাহাতের অবয়ব। অদ্ভুত এক আল্পনায় ছেয়ে যায় রাহাতের তনুমন। সে হঠাৎ হোঁচোট খেয়ে পড়ে যায়। পথের সামান্য কাদা তার শরীরকে জড়িয়ে নেয়। কাশের শুভ্রতাগুলো উড়তে থাকে আকাশজুড়ে। রাহাতের অভিমান হয় মাটির উপর। কাদায় মাখামাখি করে উঠে দাঁড়ায় সে। তার সাথে কাশফুলগুলোও কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়। এতে বিষণ্ন হয়ে পড়ে রাহাতের মন। পুনরায় বাড়ির পথ ধরে হাঁটতে থাকে রাহাত। এখনো প্রায় কিছুটা পথ পাড়ি দিয়ে বাড়িতে পৌঁছতে হবে। এমন কাদায় মাখামাখি করে বাড়িতে ফিরলে হয়তো আর রক্ষা নেই। মায়ের বকুনি খেয়েই দিন পার করতে হবে।

গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে পড়ে রাহাত। হঠাৎ কোনো বৃক্ষের পত্র-পল্লবের আড়াল থেকে উদাসমাখা সুরে শিষ বাজায় বিষণ্ণ কোনো পাখি। সেই সুরে কেমন যেন হাহাকার করে উঠে রাহাতের হৃদয়-মন । হঠাৎ ঝড়ো হাওয়া বইতে থাকে। হয়তো প্রলয়ঙ্করী কোনো ঝড়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রকৃতি। অনুজ্জ্বল মেঘের আবরণে ঢাকা পড়ে যায় বাগানের গুচ্ছময় পদ্ম। মনে হয় শরত যেন সৌন্দর্যের চিরন্তন প্রতীক। আকাশ কালো করে নেমে আসে ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি হওয়ার দরুন মুছে যায় শরীরের কাদাগুলো। রাহাত প্রকৃতির লুকোচুরিতে ভারী অবাক হয়। বাড়ির কাছাকাছি কোথাও বড়সড় একটি বাজ পড়ার শব্দ হলো। আঁৎকে উঠে রাহাত। ভয়ে জাম গাছের নিচে আশ্রয় নেয় সে। বেশ কিছুটা সময় পার হওয়ার পর আস্তে আস্তে মেঘ কেটে যেতে থাকে। পুবের আকাশ কালো করে সন্ধ্যারাতেই জেগে উঠতে থাকে আস্তো রূপালি চাঁদটা । নিস্তব্ধতার কোলে উঠে স্নিগ্ধতায় ছেয়ে যায় চরাচর। চাঁদ জোছনা একত্রিত হয়ে অদ্ভুত এক আলোকরশ্মির প্রতিফলন ঘটায়। রাহাত জোতা জোড়া রেখে তার উপর বসে পড়ে। সে কিছুক্ষণ প্রকৃতির খেলায় মেতে উঠতে চায়। বাতাসের পরশে আন্দোলিত হয় জামগাছের সবুজ পাতাগুলো। রাহাতের আনন্দ উচ্ছ্বাসে উঁকি দিয়ে যায় দুর্দান্ত শৈশবের হারিয়ে ফেলা দিনগুলো। কেমন যেন সে খানিকটা উদাসীন হয়ে পড়ে। ঘটনাক্রমে সে গাছে কাঠঠোকরা বাসা বেঁধে ছিল। প্রকৃতির ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির কারণে সে হয়তো এতক্ষণ ঘরের মধ্যেই ছিল। আকাশের স্বচ্ছতা উপলব্ধি হওয়ার পর সে খানিকটা মাথা বের করে। কাঠঠোকরা দেখতে পায় তাদের বাসার নিচে কে যেন বসে আছে। কাঠঠোকরা রাহাতকে প্রশ্ন করে বসল।

‘এখানে বসে আছো যে, মন খারাপ’?
কাঠঠোকরার প্রশ্নে রাহাত সম্বিত ফিরে পায়। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে তাকে কাঠঠোকরার দিকে।
‘না, তেমন কিছু না। শরতের প্রকৃতি আমাকে নিয়ে হয়তো কোনো গল্প এঁকেছে। সে অনুযায়ী আমাকে শরতের কথামতো চলতে হচ্ছে।’
‘আচ্ছা, শরতের কাছ থেকে কি কোনো শিক্ষা পেয়েছ’?
‘না তো’!
রাহাতের এমন উত্তর হয়তো কাঠঠোকরা আশা করেনি। তাই কিছুটা আবেগী কণ্ঠে পুনরায় জিজ্ঞেস করল।
‘যদি শরতের রূপ দেখে নিজেকে চিনতে না পারো, শরতের রঙে নিজেকে রাঙাতে না পারো। তাহলে প্রকৃতির বুকে তুমি আনন্দে থাকবে কী করে।
কাঠঠোকরা আর রাহাতের কথোপকথনের এই পর্যায়ে একফোঁটা শিশির এসে গড়িয়ে পড়ে রাহাতের চোখে। শিশিরের আলতো ছোঁয়ায় চমকিত হয় রাহাত। প্রকৃতির কোলে হারিয়ে গিয়েছিল সে। তার স্পষ্ট মনে আছে। কাঠঠোকরার সাথে সে কথা বলেছে। আসলেই কি এই গাছে কাঠঠোকরা আছে?
জাম গাছে তো কাঠঠোকরা থাকার কথা নয়। অজানা আশঙ্কায় জড়িয়ে যায় সে। রাত বাড়তে থাকে। রাহাত উঠে দাঁড়ায়। প্রকৃতির কোল থেকে বাড়ির পথ ধরে। সে ভাবতে থাকে, হয়তো প্রকৃতি তার অনুপস্থিতিতে আরো ভয়ঙ্কর কোনো পরিকল্পনা এঁকে রেখেছে!
দেখলো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড় গাছটিতে ঠকঠক করে গাঠ ঠুকছে একটি কাঠঠোকরা। আহা কী সুন্দর পাখিটির ডানা। পাখিটির ঠোঁটে মেখে আছে শরতের শিশির।