মিতুর বয়স সাত পেরিয়ে। প্লে-নার্সারি শেষ করে ক্লাস ওয়ানে উঠেছে। মিতু ছোটবেলা থেকেই বেশ চঞ্চল স্বভাবের। হইচই করে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখে। তবে কিছু দিন ধরে ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে। মিতু দখিনের জানালামুখী হয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে শুয়ে আছে। জানালার পাশেই ছিল কাঁঠালবাগান। ঝিরিঝিরি বাতাস আর পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ কানে ভেসে আসছে। মিতু চুপচাপ শুয়ে আছে। মা রান্নার কাজে ব্যস্ত। মিতু অসুস্থতার জন্য স্কুলেও যেতে পারছে না। পারছে না বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করতে। শুধু শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে।
এমন সময় হঠাৎ একটি শালিক ছানা উড়ে এসে জানালার পাশে ধপাস করে পড়ে। আর চিঁ-চিঁ শুরু করে কান্না শুরু করে। ছানাটা একটু উড়ে আবার জানালার পাশে এসে বসে। আবার চলে যায়। আবার ফিরে আসে। আবার চি-চি করতে থাকে। তাই দেখে মিতুর খুব মায়া হয়।
মনে হচ্ছে ছানাটার খুব ক্ষুধা পেয়েছে তাই চি-চি করে কাঁদছে। হয়তো মিতুর মায়ের মতো ছানাটার মাও কাজে ব্যস্ত। তাই ক্ষুধায় ছটফট করছে। মিতু বিছানা ছেড়ে উঠে একটি পাত্রে কিছু খাবার আর অন্য পাত্রে পানি নিয়ে এলো। এসে দেখে জানালার পাশে পাখিটি নেই। মিতু জানালার গ্রিল ধরে চোখ ঘুরিয়ে চার পাশে তাকাল। ছানাটিকে দেখতে না পেয়ে মন খারাপ করে শুয়ে পড়ল।
ছানাটি আবার চিঁ-চিঁ শব্দ করে ওঠে। শব্দ শুনে মিতু লাফিয়ে উঠে বাইরে তাকিয়ে দেখে পাখির ছানাটি নিচে পড়ে কাতরাচ্ছে। উড়তে চেয়েও উড়তে পারছে না। পা আর ছোট ছোট পাখনাতে সুতা পেঁচিয়ে আছে। মিতু ছানাটিকে তুলে এনে সুতা কেটে গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে খেতে দিলো। ছানাটি পানির পাত্র থেকে পানি পান করে আবার চিঁ-চিঁ শুরু করল। মিতু ছানাটিকে আদর করে মাথায় চুমু দিয়ে হা করিয়ে মুখে কিছু খাবার পুরে দিলো। ছানাটি মাথা ঝেড়ে ফেলে দিলো। মিতু আবার হা করিয়ে খাবারের সাথে কিছু পানি দিলো। ছানাটি এবার খেয়ে নিলো।
মিতু খুব খুশি। ছানাটিকে নিয়ে খেলছে, মিতু ভাবছে- ওর জন্য একটি ঘর বানাতে হবে। ওর একটি নামও দিতে হবে।
কী নাম দেয়া যায়? পেয়েছি আজ থেকে ওর নাম টুসি।
এমন সময় মিতুর মা এসে বলল, তুমি পাখি পেলে কোথায়? এটাতে জীবাণু থাকতে পারে, তুমি এমনি অসুস্থ। দাও এটি বাইরে ফেলে আসি। এই বলে মিতুর হাত থেকে পাখিটা নিয়ে যেতেই মিতু হাউমাউ করে চিৎকার শুরু করল। কেঁদে কেঁদে বলে- এটি আমার বন্ধু টুসি, আমাকে দাও আম্মু। ছানাটাও চিঁ-চিঁ করে ওঠে।
অতঃপর মিতুর মা ছানাটিকে ফেলতে পারল না।
ছানাটির জন্য খাঁচার ব্যবস্থা করা হলো। আদর যতেœর কমতি রইল না।
এভাবে বেশ কিছু দিন কেটে গেল। টুসি আর মিতুর মধ্যে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে উঠেছে। টুসি সারাক্ষণ মিতুর আশপাশে ঘুরঘুর করে। এই ফুড়ুত করে উড়ে যায়। টুসি বলে ডাকতেই আবার ফিরে আসে। এতে মিতুও আনন্দ পায়।
টুসি এখন টুকটাক কথা বলা শিখেছে , হঠাৎ হঠাৎ মিতু মিতু করে ডেকে উঠে।
এতে মিতু আনন্দে লাফিয়ে উঠে। মাকে ডেকে বলে- মা শুনো না, টুসি আমার নাম ধরে ডাকছে? মিতুর মা তাদের ভালোবাসা দেখে খুবি আনন্দিত।
মিতু স্কুলে গেলে টুসিও মিতুর সাথে চলে যায়। এতে ছাত্রছাত্রীরা ভিড় জমায়। শিক্ষক মিতুকে নিষেধ করল টুসিকে স্কুলে নিয়ে না আসতে।
মিতু স্কুলে যাওয়ার সময় টুসিকে মায়ের কাছে রেখে যায়। টুসির খাঁচার দরজা সবসময় খোলাই থাকে। ইচ্ছেমতো আসা-যাওয়া করে। টুসি এখন বেশ বড় হয়েছে। মিতু পড়ার সময় টুসি কাঁধে বা মাথায় চুপটি করে বসে থাকে। কখনো ঠোঁট দিয়ে কামড়িয়ে বই এনে দেয়। কিন্তু মিতুর পড়াশোনা সমস্যা হয় ভেবে মিতুর মা পড়ার সময় টুসিকে খাঁচায় ভরে খাবার দিয়ে বলে- এখানে বসে চুপচাপ খাও। মিতু এখন পড়বে। টুসিও বলে উঠে- মিতু পড়বে, মিতু পড়বে। এতে মিতুর মা ও মিতু হেসে ওঠে।
আদর যতœ দিয়ে অনেক কিছু জয় করা সম্ভব। টুসি এখন মিতুদের পরিবারের এক সদস্য বনে গেছে। মিতু টুসিকে নিয়ে হাজারো গল্প বাবাকে বলে, এতে বাবাও আনন্দ পায়।
মিতুর বয়স সাত পেরিয়ে। প্লে-নার্সারি শেষ করে ক্লাস ওয়ানে উঠেছে। মিতু ছোটবেলা থেকেই বেশ চঞ্চল স্বভাবের। হইচই করে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখে। তবে কিছু দিন...
