আমাদের সংবিধানের ৯৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, “বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট” নামে বাংলাদেশের একটি সর্বোচ্চ আদালত থাকবে যা আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগ সমন্বয়ে গঠিত হবে। সংবিধানের বিচার বিভাগ শিরোনামে ষষ্ঠ ভাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কোনো স্পষ্ট বিধান সন্নিবেশিত হয়নি। কেবল ৯৪(৪) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারকগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবে। প্রধান বিচারপতিসহ অন্য বিচারকগণ রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারক নিয়োগের জন্য বিস্তারিত কোনো বিধিমালা প্রণীত না হওয়ায় এ যাবৎ ক্ষমতাসীন দলের পছন্দের তালিকার বাইরে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের ঘটনা বিরল। কেবল একবার বেগম জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগের জন্য প্রেরিত তালিকা নিয়ে তদানীন্তন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ আপত্তি জানালে জ্যৈষ্ঠ আইনজীবীদের মধ্যস্থতায় একটি সম্মত তালিকা তৈরির মাধ্যমে বিচারক নিয়োগ করা হয়। এর আগে বা পরে কখনো নির্বাহী বিভাগের বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এর ফলে বিচারক হিসেবে দলীয় পরিচয় আদালত অঙ্গনে প্রায়ই প্রকটভাবে দৃশ্যমান হতে থাকে। অনেকেই বিভিন্ন বেঞ্চকে বিএনপির কোর্ট ও আওয়ামী লীগের কোর্ট হিসেবে ভূষিত করেন। সম্প্রতি আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি বিদায় সংবর্ধনায় আঙ্কেল কোর্ট, ফ্রেন্ডস কোর্ট ইত্যাদির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন। সাম্প্র্রতিককালে কেবল আদালতে মামলা শুনানিকালেই রাজনৈতিক ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য শোনা যাচ্ছে না। বরং অনেক বিচারক এখন প্রকাশ্যে সভা সমাবেশে রাজনৈতিক ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য রাখছেন। একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রপাগান্ডার ধারা অনুসরণ করে কারণে অকারণে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের কথা বলা হচ্ছে। সংবিধানে দেশের সর্বোচ্চ আইন হিসেবে কেবলমাত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সুকৌশলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বাতাবরণে একটি বিশেষ গোষ্ঠীর বা বেসামরিক জান্তার শাসন কায়েমের চেষ্টায় বিচারকদের কেউ কেউ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কখনো সরব কখনো নীরব ভূমিকা পালন করছেন। তারা নিজেদের শপথের অপব্যাখ্যা করে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদের তকমা শিরোধার্য করছেন। একজন বিচারক স্বাধীনতা বিরোধীদের নির্মূল করার জন্য অস্ত্র হাতে মাঠে নামার ঘোষণা দিতেও দ্বিধা করেননি। ফলে দুর্ভাগ্যজনকভাবে মার্কিন ভিসানীতির আওতায় বেশ
কিছু বিচারকের নাম অন্তর্ভুক্ত আছে বলে শোনা যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কেবল নির্বাহী বিভাগই খর্ব করছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই, বরং বিচারকরাও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছেন। এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে তারা রাজনৈতিকভাবে একটি পক্ষ অবলম্বন করায় বিচারকার্য পরিচালনায় স্বাধীন থাকতে পারছেন না। দৃশ্যত নির্বাহী বিভাগ তাদের কার্যসিদ্ধির জন্য বিচার বিভাগের কাঁধে ভর করছে। সংবিধানের মৌলিক অধিকার সংবলিত তৃতীয় ভাগে সমাবেশ, সংগঠন, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার পাশাপাশি বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করলেও হাইকোর্ট ডিভিশন একটি বিশেষ দলের প্রতিপক্ষ রাজনীতিবিদের বক্তব্য প্রথমে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং অতি সম্প্রতি সোস্যাল মিডিয়ায় প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তা বাস্তবায়নের জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন। কোনো রাজনীতিবিদের বক্তব্য গণমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার বেআইনি বা রাষ্ট্রবিরোধী হলে সরকার নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়ে বিটিআরসির মাধ্যমে কার্যকর করতে পারে। এ ক্ষেত্রে বরং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির সংবিধানের ১০২ তৎসহ ৪৪ অনুচ্ছেদ মোতাবেক মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনের শরণাপন্ন হওয়ার কথা। আলোচ্য ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগকে কোনো দায়িত্ব পালন করতে হয়নি বরং বিচার বিভাগ তাদের মনোবাঞ্ছা পূরণে এগিয়ে এসেছে। দুদক আনীত একাধিক মামলার গতি প্রকৃতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, একই অভিযোগে আনীত মামলায় এক পক্ষ দণ্ডিত হওয়ার পরও সংসদ সদস্য পদ অক্ষত থাকে অপরপক্ষ নির্বাচনের জন্য অনুপযুক্ত ঘোষিত হয়। নাইকোর মামলায় দুই নেত্রীই আসামি ছিলেন। কিন্তু একজনের বিরুদ্ধে সরকার মামলা প্রত্যাহার করায় রুল ডিসচার্জ হয়েছে। অন্য দিকে অপর নেত্রীর বিরুদ্ধে মামলা আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছে। আরো লক্ষণীয় বেগম খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড আপিল পর্যায়ে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশন সাজা ৫ বছর থেকে ১০ বছর বর্ধিত করে বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে এ ধরনের পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে প্রহসনে পরিণত করেছে। বহুল আলোচিত মাজদার হোসেন মামলার রায়ের পর ২০০১ সনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তা কার্যকর হয়। কিন্তু বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ বাস্তবে রূপায়ণের জন্য নি¤œ আদালতের বিচারকদের জন্য প্রযোজ্য বিধিমালা প্রণয়নে বিলম্বের কারণে তা পুরাপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিচারপতি এস কে সিনহা বিধিমালা প্রণয়নের জন্য সক্রিয় হন। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে দফায় দফায় সময় নেয়ায় ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে আপিল বিভাগ আইন
মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের তলব করেন। তারপরও টালবাহানা চলতে থাকে। নির্বাহী বিভাগের মুসাবিদা সংশোধনের জন্য বারবার নির্দেশনা দিলেও আপিল বিভাগের নির্দেশনা পরিপালন না করায় বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের পরিবর্তে সংসদ কর্তৃক বিচারকদের অভিশংসনের বিধান সংবলিত আইন মহামান্য আপিল বিভাগ কর্তৃক রদ রহিত করায় নির্বাহী বিভাগের
সাথে তদানীন্তন প্রধান বিচারপতির বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। ঘটনা পরিক্রমায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং সিঙ্গাপুরে বসে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করেন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি জনাব আব্দুল ওয়াহাব মিয়ার আমলে নির্বাহী বিভাগের পছন্দ অনুযায়ী বিধিমালার মুসাবিদা চূড়ান্ত হয়। সেই বিধিমালায় কলমের এক খোঁচায় মাসদার হোসেন মামলার চেতনা ভূলুণ্ঠিত করা হয়। উপর্যুক্ত কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা হিসেবে ফুটনোটে আইন মন্ত্রণালয় উল্লেখের মাধ্যমে কার্যত অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদায়ন, পদোন্নতি, বদলি, শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মূল কর্তৃত্ব আইন মন্ত্রণালয়ের উপর ন্যস্ত করা হয়। অন্য দিকে সুপ্রিম কোর্টের আলাদা কোনো সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় তাদের পক্ষে অধস্তন আদালতের বিচারক ও বিচারিক কার্যক্রম কার্যকরভাবে তদারকি করা আদৌ সম্ভব নয়। উদ্ভূত প্রেক্ষাপটে অধস্তন আদালতের ওপর সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে এবং তা সময় সময় প্রধান বিচারপতি ও অন্যান্য বিচারপতিদের সফর ও পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ ।
আইন মন্ত্রণালয় রেফার না করলে অধস্তন আদালত বা এর বিচারকদের ওপর কোনো খবরদারি করার সুযোগ সুপ্রিম কোর্টের নেই।
এ অবস্থায় খোদ সংবিধান এবং উপরে বর্ণিত বিধিমালার সংশোধন ছাড়া সুপ্রিম কোর্টের পক্ষে অধস্তন আদালতকে বাগে আনা সম্ভব হবে না। পাশাপাশি একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্ট, অধস্তন আদালত ও এর বিচারকদের কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে তদারকি করতে পারবে না ।
