খুলনা যশোর ও তৎকালীন নদীয়া জেলার মধ্য দিয়ে প্রবল খরস্রোতা অসংখ্য তরঙ্গরাজির তাণ্ডবে প্রবাহিত নদীটি ছিল ভৈরব। এক কালের প্রমত্ত ভৈরব আজ কোথাও একেবারে মজে গেছে, কোথাও বিশীর্ণ স্রোতধারায় তার অস্তিত্ব ঘোষণা করছে, আবার কোথাও সে একেবারেই হারিয়ে গেছে। খুলনা, যশোর, কুষ্টিয়ার (কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর ভারত বিভাগের পূর্বে নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল) ইতিহাস ও সভ্যতায় ভৈরব দীপালোকের বাহক হিসেবে কাজ করেছে।
মালদাহ থেকে প্রবাহিত শ্রুতিকীর্তি নদী যেখানে পদ্মানদীতে মিলিত হবে তার ঠিক অপর পাড়ে মুর্শিদাবাদের আখেরগঞ্জ থেকে যে নদীটির উৎপত্তি হয়েছে তারই নাম ভৈরব। এই ভৈরব দক্ষিণ দিকে এগিয়ে পদ্মার আর একটি শাখা নদী জলাঙ্গীর সাথে মিলিত হয়ে ভৈরব নামেই এঁকেবেঁকে একই দিকে নদীয়া জেলার করিমপুর থানার নন্দনপুর গ্রামে এসে পূর্ব দিকে বাঁক নিয়ে সে মেহেরপুর থানার শোলমারি গ্রামের মধ্যদিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। আজকে যেখানে মুজিবনগর (বৈদ্যনাথতলা) তার পাশে ছোট পাকা যে ব্রিজটি তার তলা দিয়ে ভৈরব এগিয়ে যাবে কাথুলির দিকে- কোথাও কোনো স্রোত নেই। সীমান্তের এপারে-ওপারে হাঁটু পানি- কচুরিপানায় ভরা। কিন্তু ভৈরবের তীরেই আম্রকানন। এখান থেকে অনতিদূরে পলাশির আম্রকাননে একদা বাংলার স্বাধীনতার সূর্য স্তিমিত হয়েছিল- ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল বৈদ্যনাথ তলার অপর একটি আম্রকাননের মাঝে উদিত সূর্যের নতুন প্রাতের আভা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে দিনের পর দিন উদ্ভাসিত করে তুলেছে।

কাথুলি থেকে রতনপুর, দামুড়হুদা, কার্পাসডাঙ্গা, চুয়াডাঙ্গা, কোটচাঁদপুরের নিম্ন দিক থেকে, চৌগাছা, তাহেরপুর, বারোবাজার হয়ে ভৈরব যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের সাতমাইল নামক স্থানে কাজী নজরুল ইসলাম কলেজের কাছে রাস্তা অতিক্রম করে কিছুদূর এগিয়ে যশোর শহরে প্রবেশ করবে এবং বাঁ দিকে শিক্ষা বোর্ড অফিস রেখে আরো সামনে এগিয়ে খুলনা-যশোর সড়কের সামন্তরাল হয়ে দক্ষিণমুখী ভৈরব বসুন্দিয়া, নোয়াপাড়া, তালতলা, ফুলতলা, গিলাতলা, দৌলতপুর, সেনহাটি হয়ে পরবর্তীতে খুলনা জেলা জজের বাংলোর কাছে ঠিক উত্তর-পূর্ব দিকে মোড় নিয়ে আলাইপুর, পিঠাভোগ, মৌভোগ মুলঘর সৈয়দ মহল্লা যাত্রাপুর হয়ে বাগেরহাট জেলা সদরকে ডানদিকে রেখে উত্তর-পূর্বমুখী ভৈরব, সুলতানপুর, ব্যামরতা হাজরাখালীর মাঝখান থেকে কচুয়া থানা সদরের অতি নিকটে পদ্মার অপর প্রশাখা বলেশ্বরে (ুড়হমষড়ৎফ) পতিত হবে। এর পরে ভৈরব এবং বলেশ্বরের মিলিত ধারা সামনে আরো কয়েকটি নদীর স্রোতের সাথে মিলেমিশে হরিণঘাটা নাম নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশে যাবে ।
এখানে টিকা লেখার মতো কয়েকটি কথা বলতে হবে। প্রথমে আলাইপুর : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে এই আলাইপুরের কথা উল্লেখ করেছেন। আজ যেখানে রূপসা নদী এখানে কোনো নদী বা খাল ছিল না। আলাইপুর থেকে তিন মাইল দক্ষিণে কাজীবাছা নামে ছোট একটি নদী ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর কোনো একসময়ে তৎকালীন যশোর জেলার কালিয়ার লবণ ব্যবসায়ী রূপলাল সাহা কাজী-বাছার সাথে ভৈরব নদের সাথে সংযোগ স্থাপনার জন্য একটি খাল খনন করেন। সেই খালই আজকের বিস্তৃত রূপসা নদী। উল্লিখিত আলাইপুরের কাছেই পিঠাভোগ গ্রামে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের পিতৃপুরুষের আবাসস্থল। একই নদীর তীরে ফুলতলার (খুলনা শহরের অনতিদূরে) কাছে দক্ষিণ ডিহি গ্রামে তার শ্বশুরবাড়ি। সুতরাং যেনতেন প্রকারে এখন যা চোখে পড়ে তা দেখেই ভৈরবকে রূপসা নদীর সাথে এক করে সুন্দরবনকে মাঝখানে রেখে বঙ্গোপসাগরে মিলিত করলে ইতিহাস ও ভূগোল দুটোই বিকৃত হবে ।

বারোবাজার : আজ থেকে আটশত বছর আগে মহাপ্রাণ খানজাহান আলী যখন বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের (সূত্র : মরহুম বিচারপতি হাবিবুর রহমান) আঞ্চলিক সেনাপতি হিসেবে বাংলাদেশের দক্ষিণ ও পশ্চিম অংশের বিভিন্ন অঞ্চল জয় করেছিলেন তখন প্রথমে তিনি বারোবাজারে তাবু ফেলেছিলেন। বারোবাজারে তিনি বহুসংখ্যক পুকুর খনন করেন ও মসজিদ নির্মাণ করেন- যা এখনো কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। বারোবাজার থেকে ভৈরবের তীর বেয়ে তিনি বাগেরহাটে উপস্থিত হন। বাগেরহাটে তার অমর কীর্তির বিজয়গাঁথা স্বদর্পে ভাস্বর হয়ে আছে।
কপোতাক্ষ নদ : চৌগাছার সন্নিকটে তাহেরপুর থেকে মধুকবির কপোতাক্ষ নদ ভৈরবের শাখা নদ হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হবে। ভৈরব ও কপোতাক্ষ কচুরিপানায় পরিপূর্ণ। তবে বাংলা সাহিত্যে কপোতাক্ষ তার যথাযথ স্থান দখল করে নিয়েছে।
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড : ভৈরব নদ মেহেরপুরের শোলমারি থেকে শুরু করে যশোরের বসুন্দিয়ার কাছাকাছি পর্যন্ত কোথাও সে মরা নদী, কোথাও তার অস্তিত্ব কচুরিপানার তলে নিমজ্জিত আবার কোথাও নদী খননের নামে খাল খনন করে তার সঞ্চিত জলধারায় সেচের ও স্নানের কাজ চলছে। দর্শনার পরে ভৈরব ভূমিদস্যুদের দ্বারা দখল হয়েছে। ইটেরভাটা, ধানক্ষেত, পাকা দালান, পুকুর খনন করে দখল ও দূষণ সবই চলছে। উৎপত্তিস্থলে পানির প্রবাহ নেই। তা ফারাক্কা সৃষ্টির কয়েকশত বছর আগের কাহিনী। ভৈরবর্তীরে একসময় উৎকৃষ্ট ধরনের তুলো হতো। এই নদীর তীরে নীলগঞ্জের হাটে বস্ত্র ব্যবসার কথা ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের লেখনিতে উল্লেখ করা হয়েছে। যশোরের খেজুরের গুড় এখনো বিখ্যাত। এই খেজুরের রস দিয়ে চিনি উৎপাদন করা হয়। দর্শনার কেরু অ্যান্ড কোম্পানি ও মোবারকগঞ্জ চিনিকল এরই ফলশ্রুতিতে স্থাপন করা হয়। ভৈরব এখানে আজ আর বেঁচে নেই- কিন্তু তার দু-তীরে ইতিহাস তাকে জীবিত রেখেছে। ভৈরবের ডানতীর তার বাম তীরের চেয়ে নিচু। তার কারণ যখন প্লাবনের স্রোতধারা নদী উপচিয়ে প্রবাহিত হয়েছে তা ডানতীর বেয়ে সরাসরি দক্ষিণমুখী হয়ে সাগরে পড়তে চেয়েছে। এর পরিণতিতে তার ডানতীর পলিমাটির সংস্পর্শে এসে বেশি উর্বরা, শস্য খ্যামলা, শাক, সবজি, ফলমূল আর বৃক্ষরাজির গভীর অরণ্যের সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে চৌগাছা, কোটচাঁদপুর, কালিগঞ্জ, বারোবাজার বারিণনগর, বাঘেরপাড়ার সর্বত্র সবজি চায়ের ক্ষেত একরের পর একর চোখে পড়বে। ভোর থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত বারোবাজার আর সাতমাইলের রাস্তার দু’ধারে শাকসবজি বিক্রি হবে কয়েক শ’ টন। এগুলোই পরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাওয়া যাবে। রাজধানীতে আর একটি জিনিস এখন ব্যাপকভাবে দেখা যায়, তা হলো ফুলের দোকান। এই ফুলের জন্ম কপোতাক্ষর অববাহিকায় গটখালি ইউনিয়ন ও পানিসোরা গ্রামে। অনুপম সৌন্দর্যের আঁধার এই ফুলগুলো অর্থ উপার্জনেরও বড় রকমের উৎস। ফুলে ও ফলে, কৃষি ও সবজিতে যশোর এখন বাংলাদেশে উদাহরণ হয়ে আছে।

ভৈরব বাংলাদেশে প্রবেশের পর থেকে যশোর শহর হয়ে বসুন্দিয়ার কাছাকাছি পর্যন্ত তার কোনো নাব্যতা নেই। সম্প্রতি সরকার চৌগাছা অঞ্চলে নদী খনন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ভৈরবকে পুনঃখনন করেছে। এর ফলে এখন ছোট ছোট নৌকা চলাচল করতে পারে। কিন্তু উপরের থেকে পানি আসার সম্ভাবনা নেই। জোয়ারের পানিও প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। ফলে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষায় ভৈরব এখানে একটি লেকের আকার ধারণ করেছে। নোয়াপাড়া ও বসুন্দিয়া পর্যন্ত এক হাজার টন থেকে দেড় হাজার টনের কার্গো জাহাজ খুলনা হয়ে এখানে পৌঁছে যায় । নোয়াপাড়া যশোরের কোনো থানা সদর নয়। জুটমিল, কটন মিল, রড, সিমেন্ট, সাদা সিমেন্ট, লেদার আর সারের ফ্যাক্টরীতে নোয়াপাড়া এখন বৃহৎ শিল্পনগরী। মানুষের খাদ্য, পশুর খাদ্য, মাছের খাদ্যসহ এগ্রোইন্ডাস্ট্রিজের কারখানা, স্টোন, বোল্ডার, চিপস আর কয়লার ডাম্পিং গ্রাউন্ডের সাথে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীর বিনিয়োগে নোয়াপাড়া এখন কয়েক শ’ কলকারখানা আর রিটেল সেলারদের বদৌলতে সমৃদ্ধ শিল্পবাণিজ্য নগরী। নৌপথে, সড়কপথে, রেলপথে, দেশী, বিদেশী, হরেক রকমের পণ্য এখানে এসে জমা হয় এবং পরবর্তীতে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সকাল-সন্ধ্যায় কর্ম ও শ্রম মুখরিত খুলনা-যশোরের প্রায় মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত নোয়াপাড়া অর্থনৈতিক নবজাগরণের প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে। নদী-বন্দর ও শিল্পনগরী হিসেবে সে অনেক পুরনো জেলা শহরকেও ছাড়িয়ে গেছে। এখানে ভৈরব নদীতে মাছ নেই বললেই চলে। দখলে ও দূষণে মৎস্যসম্পদ বিদায় নিয়েছে। নোয়াপাড়া থেকে খুলনার খালিশপুর পর্যন্ত ভৈরবের তীরে মোট ১১টি পাটকল রয়েছে। ফুলতলার তালতলায় এবং খালিশপুরের কাছে গোয়ালপাড়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র রয়েছে। নদীর উত্তর তীরে দিঘলিয়া থেকে আতাই নদী পর্যন্ত খুলনার পার্টের প্রধান আড়ত। কয়েকটি জুট প্রেস, ১টি কাগজের কল, ১টি হার্ডবোর্ড মিল এবং ছোটখাট অনেক মিল কারখানা রয়েছে- ভৈরবের উভয়তীরে। আলাইপুর থেকে ভৈরব বাগেরহাটের দিকে রওনা হয়ে সে ঝিমিয়ে পড়েছে। একটি শীর্ণখালের আকার ধারণ করে টিকে আছে। আলাইপুর থেকে ফকিরহাট, ফকিরহাট থেকে বাগেরহাট, বাগেরহাট থেকে কচুয়া এখানে শুধু ভৈরব বাগেরহাট সদরের সামনে লোনা পানি বহন করি একটি নদী হিসেবে টিকে আছে। কিন্তু ফকিরহাটের উত্তরে ও দক্ষিণে আপন হাতে খাল-নালা সৃষ্টি করে ডিপ টিউবওয়েলের স্ফটিক পানি ব্যবহারের মাধ্যমে এক ফসলি জমিতে দু-তিনবার শস্য উৎপাদন করছে এ অঞ্চলের কৃষক। ফকিরহাট থানার ফলতিতা বিল ও মোল্লাহাট থানার কোদালিয়া-কেন্দুয়া বিলে মিঠাপানির মাছ চাষ চলছে অবিরামভাবে। ফকিরহাট থেকে মোল্লাহাটের শেষ সীমানা পর্যন্ত রাস্তার দুইপাশে তা চোখে পড়বে। বাগেরহাট ও কচুয়ার দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের সমাজ ও প্রকৃতির চিত্তাকর্ষক রূপ হরণ ও বিরান করেছে লোনার গ্রাসে। সেই লোনা পানিতে চিংড়ি উৎপাদন করে যেমন তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড জোরদার হয়েছে তেমনি তার সাথে সমাজের ভাঙন ও সঙ্ঘাতের আলামত দিন দিন প্রকট হচ্ছে। বাগেরহাট থেকে কচুয়ার দিকে ভৈরবের শেষ প্রান্তে দুই তীরের নারকেল, সুপারির বাগানের নৈসর্গিক শোভা এখন আর নেই। ভৈরব কচুয়ার সামনে বসর ত্রিশোক আগে সে ছিল ঢাকার বুড়িগঙ্গার মতো চওড়া- এখন সে ক্ষিণ স্রোতধারা। ভৈরবের জলস্তম্ভের ভৈরবী আওয়াজ এখন আর শোনা যায় না। আপনভুবনে নিমগ্র, চৈতন্যে সে আজ শান্ত-জরাগ্রস্ত। ভারতীয় পুরাণ শাস্ত্রমতে একদা শিবের রুদ্রমূর্তির গর্জনের ফলে সৃষ্টি হয়েছিল ভৈরব আর তার কর (হাতের তালু) থেকে তোয়া (পানি) পড়ে সৃষ্টি হয়েছিল করতোয়া নদী। আজ সেই ভৈরবও নেই করতোয়াও নেই ।

এই নদী বিধৌত বাংলাদেশকে তার খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, জঙ্গল আর সমুদ্র এমনভাবে ঘিরে রেখেছে যে এ দেশের মানুষের শৌর্যে-বীর্যে, জীবন-আচরণে, ধর্ম-সংস্কৃতিতে, কৃষি, অর্থনীতি, সাহিত্য ও লোকগাঁথার সাথে দরিয়ার পানি ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। নদীর তীরে গড়ে উঠেছে তার নগর-বন্দর, বাজার শিল্প-কলকারখানা সর্বোপরি তার কৃষ্টি ও সভ্যতা। তার সাহিত্যের চাঁদ সওদাগর শিরদাঁড়া খাড়া করা অসম সাহসিকতার সমুদ্র-বাণিজ্যে অপার শক্তির প্রতীক। যতদূর জানা যায়, একদা বাংলার বাণিজ্যের বহর আরব বিশ্ব, বার্মা, থাইল্যান্ড, জাভা, চীন, জাপান এমনকি আফ্রিকা ও সুদূর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। রেশম, তুলা চাল, সরিষা এবং পরবর্তীতে পাটের বিনিময়ে আসতো চা, পিতল, কাচা তুলা, মসলা আর উদ্ভিতজাত নীল আর বাংলার ভূখণ্ড সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও তার উপনদীগুলোর সম্মিলিত পলিমাটি। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনে আছে জান্নাতের তলদেশ থেকে প্রবাহিত হচ্ছে নদ-নদী। মুঘলদের জান্নাতাবাদ বাংলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত অসংখ্য নদী। নদী মুখসৃত বদ্বীপ হিসেবে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে বৃহত্তম। মাছে-ভাতে বাঙালির নদীগুলো ছিল মাছের উৎস। দিনে-রাতে লাখ লাখ জেলে এই মাছ ধরা কাজে ছিল নিয়োজিত। একজন বিদেশি লেখকের মতে সমুদ্র ও নদীর ওপার বাংলাদেশ নির্মিত। বাংলার ইতিহাস রচনা করেছিল বাংলার অসংখ্য নদ-নদী। এই নদীগুলোই বাংলার প্রাণ। ভূগর্ভস্থ পানির আধার- প্রয়োজনীয় মাপে পানি ধরে রাখতে নদীগুলোর ভূমিকা ছিল মুখ্য। নদ-নদীর গতি-প্রকৃতি ও ভাঙাগড়ার কারণে বহু জনপদ গড়ে উঠেছে আবার বহু জনপদ বিলীন হয়ে গেছে। বাংলার ইতিহাসের উত্থান-পতনের সাথে নদী ও নৌপথ ছিল অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলার ভূ-প্রকৃতি ও জলবায়ু বর্ষা-বাদল ও মশা বহিরাক্রমণ থেকে বাংলাকে প্রতিরোধে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। মোগল আমলেও বর্ষাকালে ছিল বারো ভূঁইয়াদের শাসন আর শুকনোকালে শাসন করত মোগলরা। একজন বিদগ্ধ ব্যক্তি বলতেন, ঢাকা থেকে রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর না করা হলে ইংরেজদের পক্ষে ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপন করা কঠিন হতো। কিন্তু বাংলাদেশের সেই নদীগুলো আজ হারিয়ে যাচ্ছে। একদা বঙ্কিমচন্দ্র আক্ষেপ করে বলেছিলেন, বাঙালির ইতিহাস চাই। নইলে বাঙালি বাঁচিবে না। আজ বাঙালির ইতিহাস আছে, দেশ আছে, পতাকা আছে, আছে তার সঙ্গীত। কিন্তু বাঙালি তার ভূগোল হারাতে বসেছে। শুকিয়ে যাচ্ছে তার অসংখ্য নদ-নদী। শুকিয়ে যাচ্ছে তার ভাটি অঞ্চলের হাওর-বাঁওড়, বিল, পুকুর, ডোবা সব। বাঙালির ভৌগোলিক অস্তিত্বের প্রতি হুমকি আসছে। বাঙালির ভূগোলকে বাঁচাতে হবে- নইলে সে বাঁচিবে না। বেলাভূমি পরিশেষে ভৈরব, ‘সত্য হে, নদ তুমি পড় মোর মনে’। তুমি আমার শৈশব শালা, কৈশোরের উপবন; দুর্দম জীবনোল্লাসে আজ তুমি বিস্মৃত বিলীন। ফিরে এসো হে ভৈরব! লইছে যে তব নাম বঙ্গের সঙ্গীতে। তোমার সন্ধানে গিয়েছি আমি হিমালয়ের চূড়ায়। পদ্মার বালু চরে। পূর্ব সাগর তীরে। আমার বিস্তীর্ণ স্রোতধারা আজ সমগ্র বাংলাদেশের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। তোমার দু-তীরের বিস্তৃত জনপদের বৃক্ষ-বীথির পত্র-পল্লবের মর্মর ধ্বনিতে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে স্বাধীনতা নও তুমি শুধু নজরুলের ঝাঁকড়া চুল, রবিঠাকুরের অজর কবিতা, তুমি শেখ মুজিবের বজ্রকণ্ঠ অবিনাশী গান। তুমি কোদাল-লাঙল হাতে শাণিত দুর্বার শক্তির লাখ লাখ কর্মবাদী প্রাণ। অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে ডাকছে আজ বাংলাদেশ। মাতৃভূমির ইতিহাসে ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে তারা দিনমজুর, কিষাণ-কিষাণী বয়ন কন্যারা শিল্পপতি থেকে কারখানার শ্রমিক, ছাত্র-যুবক, চাকরিজীবী সবাই আজ সেই দিগন্তের অভিযাত্রী। এই যাত্রা রুখবে কে?