তুহিনদের বাসার অদূরেই একটি বড় ময়লার স্তূপ। এলাকার সবাই এখানে পচা-বাসি জিনিস ফেলে যায়। আশপাশে কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। উৎকট গন্ধে বমি চলে আসে। সবাই কোনোমতে বালতি ঢেলে ময়লা ফেলেই মুখ চেপে ধরে চলে যায়।
তুহিনদের স্কুলে যাওয়ার পথেই ময়লার ভাগাড়টি। প্রতিদিনই ও এখান দিয়ে যাওয়ার সময় নাক মুখ চেপে ধরে রাখে। যত দ্রুত চোখের আড়াল হবে তাতেই যেন মুক্তি। জায়গাটা পার হয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে ও। কী গন্ধরে বাবা! আশপাশের মানুষজন কিভাবে থাকে এদিকে- তুহিন ভেবে পায় না!
অন্যান্য দিনের মতো আজো রিকশায় করে স্কুলে যাচ্ছে ও। সাথে আম্মু। রিকশাওয়ালা চাচা ময়লার স্তূপের কাছে আসতেই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল ও। আম্মুও উড়না দিয়ে মুখে চেপে রাখলেন। যাতে কোনোভাবেই গন্ধটা নাকে এসে না লাগে।
কিন্তু একি! কোনো কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ রিকশাওয়ালাকে থামিয়ে দিয়ে নেমে পড়ল ও। তাও আবার ঠিক ময়লার স্তূপের কাছেই। আম্মু ওকে ধমক দিলেন।
‘এখানে নামলে কেন তুমি? ওঠো রিকশায়।’
‘না আম্মু, আমার একটি কাজ আছে এখানে। তুমি চলে যাও বাসায়।’ বলেই ময়লার স্তূপের দিকে হেঁটে চলল তুহিন। অগত্যা রিকশাওয়ালাকে বিদায় দিয়ে আম্মুও ছুটে চললেন ওর পেছন পেছন।
‘তুহিন! তোমার কী হলো আজ! ময়লার ওদিকে যাচ্ছ কেন?’
তুহিন আম্মুকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘তুমি একটু এখানে দাঁড়াও আম্মু। আমি এক্ষুনি চলে আসছি।’
কিছু বলার আগেই টিফিনবক্সটা নিয়ে ময়লার স্তূপের দিকে হাঁটতে থাকল ও। আম্মু মনে মনে ভীষণ রাগ করলেন। আজ আচ্ছামতো ধোলাই দেবেন ওকে। দূর থেকে চেয়ে চেয়ে দেখতে থাকলেন ও কী করে ময়লার স্তূপে গিয়ে। কিন্তু পরের দৃশ্য দেখতেই তার সব রাগ মিটে গেল। দেখলেন, ও একটা ছেলের কাছে গেল, ছেলেটি ময়লার স্তূপ থেকে বেছে বেছে একটি পলিথিনে পচা-বাসি খাবার ভরছে। তুহিন ছেলেটির কাছে গিয়ে ওর হাত থেকে নষ্ট খাবারের পলিথিনটি নিয়ে ফেলে দিলো। তারপর ওর টিফিনবক্সটা খুলল। বক্স থেকে বের করল একটি ডিম, পাউরুটি আর কলা। সেগুলো একে একে তুলে দিলো ছেলেটার হাতে। ছেলেটি এসব পেয়ে যেন পুরোই হতভম্ব হয়ে গেল। তুহিন পেছন ফিরে দেখল, আম্মু দূর থেকে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন। দেরি না করে ও আম্মুর কাছে ফিরে এলো।
কাছে আসতেই ও দেখতে পেলো, আম্মু কাঁদছেন। তবে বুঝতে বাকি রইল না, এ কান্না যে আনন্দের। কিছু বলার আগেই আম্মু ওর কপাল স্নেহের চুমু এঁকে দিলেন। তুহিনের কাছে আজকের দিনটি একটু অন্যরকম আনন্দময় হয়ে উঠল।