সাম্প্রতিক সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যান নিশ্চিত করে যে, বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পথে রয়েছে। ১৭টি লক্ষ্য অর্জনে ১৫ বছরের মধ্যে আট বছর ব্যয় অতিবাহিত হওয়ার পর সরকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘দারিদ্র্য বিমোচন, লিঙ্গ-সমতা, বিদ্যুৎ, পয়ঃনিষ্কাশন এবং বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভালো করছে।
মানব উন্নয়ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে থাকায় সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন তুলনামূলকভাবে সহজ বলে মনে করেছে বাংলাদেশ, কারণ এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের আগেই বাংলাদেশ কিছু লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি যৌথ সরকার-এনজিও অভিযানের অধীনে স্যানিটেশন লভ্যতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির উন্নতিতে অবদান রাখে।
তবে নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে এই সমস্ত অগ্রগতি এখনো উন্নয়নের স্থায়িত্বের দিকে মনোনিবেশকে পর্যাপ্তভাবে তীক্ষè করতে পারেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নে প্রথম তিনটি এসডিজিতে বাংলাদেশ ভালো অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে রয়েছে। এখন পর্যন্ত চিহ্নিত চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে সঠিক তথ্যের অভাব। এসডিজির অগ্রগতি মূল্যায়নে জাতিসঙ্ঘ নির্ধারিত ২৩২টি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশের কাছে মাত্র ৭০টি সূচকের তথ্য রয়েছে। সরকার ১৭টি এসডিজির মধ্যে থাকা ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৪১টি অর্জনে উন্নত আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।
বছরের পর বছর ধরে ৬ শতাংশ বা তার বেশি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার, পরিসংখ্যান অনুসারে জুন ২০২৩ সালে মাথাপিছু আয় ২,৭০০ মার্কিন ডলারে উন্নীত করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ মূল্যায়ন অনুযায়ী, জন্মের সময় গড় আয়ু বেড়ে হয়েছে ৭২.৭ বছর- পুরুষ ৭১.১ বছর, নারী ৭৪.৪ বছর।
সরকারের সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, দারিদ্র্যের হার আগের ২৪ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। তবে বেসরকারি গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা অতিমারী এবং অন্যান্য কারণে বিগত কয়েক বছরে দারিদ্র্যের হার বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এসডিজি অর্জনের লক্ষ্যে জিও ও এনজিওগুলোর কার্যক্রম মনিটরিংয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে একটি বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে, যারা এখন এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা ও সূচকের বিশদ বিবরণ নিয়ে কাজ করছে।
তবুও সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো ধনী ও দরিদ্র এবং শহুরে ও গ্রামীণ অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান বাড়ানোর ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন সাবেক ডেপুটি গভর্নর বলেছেন, বাংলাদেশের সম্পদ জনসংখ্যার ৫ শতাংশের কাছে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠের ব্যয়ে ধনী। প্রতি বছর বিভিন্ন শিল্পকারখানার শ্রমিকরা পর্যাপ্ত মজুরি, বকেয়া বেতন ও সুযোগ-সুবিধার দাবিতে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। ধনী লোকেরা আরো ধনী হয়ে উঠছে; কিন্তু তাদের শ্রমিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং তাদের অধিকারের ব্যাপারে আগ্রহের অভাব দেখা যায়।
সাধারণ আমানতকারীদের কাছ থেকে আসা অর্থ নিয়ে ঋণখেলাপি সংস্কৃতিকে আরো খারাপ করে ধনী ব্যক্তিরাও ব্যাংকের ভিত্তি কাঁপিয়ে তুলেছেন। সম্প্রতি সুপরিচিত কিছু কোম্পানির ৫২টি খাদ্যপণ্যে ক্ষতকারক উপাদানের সন্ধান পাওয়ায় খাদ্য উৎপাদনকারীদের প্রতি ভোক্তাদের আস্থা কমে গেছে। ব্যবসায়ীদের মুনাফাখোরি আচরণ সম্পর্কে সচেতন মানুষ অজানা খুচরা বিক্রেতা ও বিক্রেতাদের কাছ থেকে ফল ও সবজি কিনতে ভয় পাচ্ছেন। অর্থ পাচারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিত্তবানরা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর হিসেবে বিশ্বের প্রথম সারিতে রয়েছে।
আরেকটি দিক হলো- নদী, বিল, খাল ও খাঁড়ি, বন এবং উন্মুক্ত স্থানের মতো সাধারণ সম্পত্তি-সম্পদ মূলত ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পতিত জমিতে পরিণত হয়েছে। অনেক জায়গায় এই ধরনের সম্পত্তি দখল করা হয়েছে যাতে দরিদ্রদের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে গেছে। ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের দারিদ্র্য নিয়ে করা একটি যুগান্তকারী গবেষণার দিকে তাকালে এটা দরিদ্রদের ওপর কিভাবে প্রভাব ফেলে তা স্পষ্ট হয়ে যায়। তার গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী তাদের আয়ের প্রায় ২০ শতাংশের জন্য সাধারণ সম্পত্তির সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে রয়েছে মাছ ধরা, প্রাকৃতিক শাকসবজি ও জীবিকা নির্বাহের জন্য বিকল্প খাদ্য সংগ্রহ এবং অর্থ ব্যয় না করে খাবার রান্নার জন্য জ্বালানি কাঠ এবং ডালপালা কুড়িয়ে নিয়ে আসা।
উন্নয়ন পরিকল্পনাকারীরা কোনো ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে পেছনে না ফেলেও মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে পারেন। টেকসই উন্নয়নের জন্য আরো প্রয়োজন, যে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর ভিত্তি করে মানুষ টিকে থাকে সেগুলো ব্যবহার করে নিঃশেষ করে না ফেলা। এসব প্রাকৃতিক সম্পদের পুনর্জন্মের সীমা ছাড়িয়ে ব্যবহার করা উচিত নয়। উদ্ভিদ এবং প্রাণিসম্পদ এবং মাইক্রো-অর্গানিজম যা স্থলে ও জলে বিকাশ লাভ করে এবং জলজসম্পদগুলো এমন একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করে যা মানব জীবনের জন্য অপরিহার্য।
উন্নয়ন কার্যক্রমকে কেবল বাজেট বরাদ্দ, রফতানি আয়, আমদানি বিল, জিডিপি প্রবৃদ্ধির মধ্যে সীমিত করা উচিত নয়। বরং আয়ের বণ্টন, কম ভাগ্যবান জনগোষ্ঠীর কল্যাণ এবং প্রাকৃতিকভাবে জৈবিক বৈচিত্র্য বজায় রাখার জন্য সাধারণ সম্পত্তি সম্পদ সংরক্ষণের দিকেও মনোনিবেশ করা উচিত।
এসডিজির কৌশলে দূষিত বা মৃত নদী, খাল ও খাঁড়ি, বিলুপ্ত বনাঞ্চল উদ্ধার, কেটে ফেলা পাহাড়ের যতœ নেয়া, হাজার হাজার অপরিকল্পিত বেড়িবাঁধ অপসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশের নদীভিত্তিক ইকোসিস্টেম পুনরুদ্ধার এবং রাসায়নিক কৃষিকে ধাপে ধাপে বন্ধ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা উচিত। রাসায়নিক কৃষি শুধু অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদই ধ্বংস করেনি বরং সামুদ্রিক সম্পদকে হুমকির মুখে ফেলেছে, যার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশ নীল অর্থনীতির স্বপ্ন দেখে। মানুষের পছন্দ করার স্বাধীনতা, বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সম্পদ ও সুযোগের সমান অধিকার নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ যতœ নেয়া উচিত যাতে প্রতিটি নাগরিক তার সৃজনশীল সম্ভাবনাগুলো উন্মুক্ত করে উৎপাদন বাড়িয়ে সার্বিক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।
