‘পথের কেনারে পাতা দোলাইয়া করে সদা সঙ্কেত
সবুজ হলুদে সোহাগ ঢুলায়ে আমার ধানের ক্ষেত।
ছড়ায় ছড়ায় জড়াজড়ি করি বাতাসে ঢলিয়া পড়ে
ঝাঁকে আর ঝাঁকে টিয়ে পাখিগুলো শুয়েছে মাঠের পরে।’
চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় দেশের বৃহত্তম শস্যভাণ্ডারখ্যাত গুমাইবিলের দৃশ্য দেখলে, পল্লী কবি জসিমউদদীনের ‘ধানক্ষেত’ কবিতাই যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।
শীতকালে বিলের পাশে বড় বড় গাছে বাসা বেঁধেছে টিয়া পাখির দল। বিলের কাছে গেলেই শুনতে পাওয়া যায় পরিযায়ী পাখিদের কিচির মিচির শব্দ।
বর্ষার পানিতে থই থই করা গুমাইবিল হেমন্তে শুকিয়ে গেলেও এই টিয়া পাখির দলে যেন লাল-সবুজের ঢেউ বয়ে এনেছে। উপরে নীল আকাশ আর নিচে পাকা ধানের সোনালি আভা। বিলের আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে অজস্র্র টিয়া। তাদের ওড়াউড়ি দেখে মনে হয় যেন নীল আকাশের নিচে সবুজের গালিচা। কখনো উড়োজাহাজের মতো বাঁ দিকে, কখনো ডান দিকে বাঁক নিচ্ছে। কখনো নিম্নগামী মেঘের ওপরে, আবার কখনো নিচ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে তাদের উড়াউড়ি দেখে মনে হয়, নীল আকাশেই যেন সাগরের ঢেউ লেগেছে। উড়তে উড়তে অকস্মাৎ ডুব দেয় নুয়ে পড়া পাকা ধানের ক্ষেতে। ধানের শীষ ঠোঁটে নিয়ে মুহূর্তে উড়ে গিয়ে বসে কোনো গাছের ডালে। উদরপূর্তি করে আবার উড়াউড়ি।
প্রতি বছর এ বিলের জমিতে আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়। এবারো এর ব্যতিক্রম নয়। উৎপাদিত ফসলের ব্যাপারে কথিত আছে দেশের আড়াই দিনের খাদ্যের জোগান আসে গুমাইবিল থেকে। বছরে প্রায় চার হাজার একর জমিতে ফসল আবাদ হয়। মৃদু বাতাসে পাকা ধানের শীষের দোলা বিলের এক প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে। কৃষকরাও ভালো ফলনের আশায় থাকে সারাটি বছর। তবে তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছে টিয়া পাখির দল। সেখানকার কৃষকরা বলছে, বিকেলের দিকে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া পাখির দল নেমে আসে ক্ষেতে। প্রতিটি ঝাঁকে ১৫ থেকে ২০ হাজার করে টিয়া থাকে। পাখির ঝাঁক অনেক সময় ধানক্ষেত নষ্ট করে ফেলে। বাধ্য হয়ে কৃষকরা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পালাক্রমে ক্ষেত পাহারা বসিয়েছে। পাখি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ থাকলেও তারা কেউ এদের হত্যা করার জন্য কোনো ফাঁদ পাতেন না। কারণ টিয়া পাখির সারি দেখতে দূরদুরান্ত থেকে অনেক মানুষ ছুটে আসেন। টিয়া পাখিদের কলতানে মুখরিত গুনাইবিলের দৃশ্য দূর থেকে দেখলে মনে হবে যেন এক টুকরো সবুজের আভা। পাখিগুলোর ঠোঁট আর লেজসহ পিঠ ও পাখা পুরোটা সবুজ। গাছে বসলে আর দেখা যায় না, কেবল লাল ঠোঁট ছাড়া। তখন দেখতে মনে হয়ে যেন ফুল। একবার যে স্থানে গিয়ে টিয়া শান্তিতে সময় কাটাতে পারে, সেখানে বারবার যেতে বেশি পছন্দ করে। বানিয়ে তুলে অভয়াশ্রম। ধান কাটা শেষে ওই অস্থায়ী আবাস ছেড়ে আবার ফিরে যাবে তারা।
হালকা কুয়াশার পর্দা ভেদ করে মিষ্টি রোদে পড়তেই দেখা যায় দিগন্তজোড়া প্রান্তরের সোনালি ঢেউ।