ঋতুর পরিক্রমায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের রূপসীকন্যা আমাদের ষড়ঋতুর এই অমোঘ প্রকৃতিকে বৈচিত্র্যময় করে তুলছে। নতুন দ্যোতনায় পৌষ-মাঘ, এই দুই মাসে নতুন সাজে সজ্জিত হয় গ্রামবাংলার প্রকৃতি। সকাল থেকেই শিশিরবিন্দুর মতো দূর্বাঘাসের ডগায় ভর করে প্রকৃতির বুকে নেমে আসছে ঝাপসা কুহেলিকার দল। ফিকে রোদ্রের কুয়াশায় ছড়িয়ে পড়ছে হিমশীতল ঝিরি বাতাস। এই কনকনে শীতে লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে তানভীর। শহরের দিকে ডিসেম্বরের পর শীতের আগমনের বার্তা পৌঁছলেও গাঁয়ের মেঠোপথ, দূর্বাঘাস, মায়ের কোমল আঁচল, খড়ের ছাউনিতে শীত নেমে এসেছে নভেম্বরের শেষ দিকেই। বিবর্ণ হয়ে পড়া পাতারা হিহি করে কাঁপতে থাকে হিমেল হাওয়ার শীতে। চার দিকে বাতাসের কোমল স্পর্শে এভাবেই একসময় বাঘের গায়েও লাগে মাঘের শীতের প্রকোপ। প্রচণ্ড শীতে পাতাদের এভাবে কাঁপতে দেখে তানভীর আপন মনে কবিতা আবৃত্তি করল- হিমহিম শীত শীত/শীতবুড়ি এলো রে/কনকন ঠাণ্ডায়/দমবুঝি গেলো রে।

তানভীর লেপের মাঝ থেকে উঠি উঠি করেও দীর্ঘ একটা সময় সে লেপমুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে। শিয়রে হিংস্র শীত কেশর ফুলিয়ে থাবা পেতে বসে আছে। তানভীরের কাছে হঠাৎ মনে হলো, চার দিকের পৃথিবী এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতায় মগ্ন। শীতের এক সীমাহীন বিষণœতা ও বৈরাগ্যে সবার হৃদয় কানায় কানায় ভরে উঠেছে। তানভীর শরীর ঝাড়া দিয়ে উঠে পড়ে। কিন্তু শীতের কাছে হার মেনে কাঁথাটি শরীরের উপর জড়াতেই হয় তাকে। উঠোনে এসে দাঁড়াতেই সে লক্ষ করে, অপূর্ব শান্ত প্রকৃতি ভোরের আবছা আলো-আঁধারিতে কেমন যেন রহস্যঘন রূপ। টিনের চালে শিশিরের বিন্দুকণা ভোরের আলোতে ঝলমল করছে। তানভীরের মনে হলো শীতের সকাল এক নতুন পদ্মফুল। তার মুখখানি দিগন্তপানে বাড়তেই থাকে। আর এভাবেই তানভীরের মন জয় করে নেয় শীতের উৎফুল্লতা। শীতের মধ্যেও কি এমন অপার সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে? ওদিকে সর্ষেক্ষেতের শীত মাধুরী, গাঁদা, ডালিয়ার রূপের ডালি। আছে তৃণ শীতের একেকটি শিশিরবিন্দু।
কচুরিপানায় শত শত অতিথি পাখি বসে আছে। কিছু প্রাণ খুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। তাদের উড়ে যাওয়া দেখে তানভীরের মনও তাদের সাথে উড়ে যায় বহুদূর। আল্লাহর প্রতিটি সৃষ্টিই অপরূপ। এই অতিথি পাখি দেখতে কত সুন্দর। অথচ মানুষ তাকে গুলি করে বিভিন্ন ফাঁদ পেতে মারে। কত নিষ্ঠুর আমরা। এ কথা মনে হতেই তানভীরের মনটা বিষণœতায় ছেয়ে যায়। তানভীরের কাছে মনে হলো- এই পাখিগুলোও তো আমাদের অতিথি, মেহমান! তাও আমরা তাদের সাথে কত নিষ্ঠুর আচরণ করি।

উদাসী কুয়াশার চাদর জড়িয়ে তানভীর শীতের অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যায়। তানভীরের তখন মনে হয় যাতনায় পিষ্ট মানুষগুলোর কথা। হাড়কাঁপানো শীত যাদেরকে দুর্বল করে দেয় দেহ-শক্তিতে। রাত কাটে ফুটপাথে। শীতের সাথে যাদের রয়েছে অঙ্গাঙ্গি সংস্পর্শতা। যা তাদেরকে ভোগান্তিতে ফেলে দেয়। তানভীরের কাছে মনে হয় এর জন্য দায়ী আমাদের মতো বৃত্তশালী সমাজ। সেলফি আর সংবাদ প্রচারণায় এক-দু’টি কাঁথা আর শীতবস্ত্র বিতরণ হলেও আড়ালে থেকে যায় হাজারো মা-বোন। তাই শীত যেন সবার জন্য বয়ে আনে মুগ্ধতা আর ভালোলাগা। শীতের যাতনা যেন কুপোকাত না করে বিশেষ শ্রেণীর কোনো মানুষকে। এই প্রত্যাশায় তানভীর মনে মনে বলল- আমাদের সবার জন্যই মানবতার হাতকে প্রসারিত করা উচিত।