ভাষা হলো মানবচিন্তার ধ্বনিমাধ্যম প্রকাশ। চিন্তা ও ভাষার মধ্যে যোগসূত্র নির্ণয় প্রসঙ্গে প্লেটো বলেছেন, ‘চিন্তা ও ভাষা মূলত একই। মৌলিক পার্থক্য : চিন্তা হলো আত্মার সঙ্গে ব্যক্তির নিজের নীরব কথোপকথন, আর ভাষা হলো ফুসফুস নির্গত বাতাস বাগযন্ত্রের মাধ্যমে কণ্ঠ ও মুখবিবর দিয়ে উত্থিত হয়।’ ভাষা হলো মানুষের এমন অভিজ্ঞান, যা অন্য প্রাণী থেকে তাকে স্বাতন্ত্র্য দান করেছে। এ প্রসঙ্গে আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি মনে করেন, মানুষের ভাষার প্রকাশরূপের অন্তরে আছে যে অর্থসম্পদ, তার বাহ্য গঠনের (surface structure) অভ্যন্তরে রয়েছে গভীরতর গঠন (deep structure), অর্থ এবং বাহ্য ব্যবহারের অন্তরে রয়েছে মানুষের মন, তাকে আবিষ্কার করাই ভাষা জিজ্ঞাসার মূল লক্ষ্য। '.. in the technical sense, linguistic theory is mentalistic. Since it is concerned with discovering mental reality underlying actual behavior.' (Noam Chomsky, Aspects of the Theory of syntax)
বাংলা ভাষার জন্ম ইন্দো-ইউরোপীয় মূল ভাষা পরিবার থেকে। ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা পরিবারের অন্যতম সদস্য আর্য ভাষা। আর্য ভাষা দু’টি প্রধান শাখায় বিস্তৃত। এক : ভারতীয় আর্য, দুই : ইরানীয় আর্য। ভারতীয় আর্য শাখাটি তিনটি স্তরে বিভক্ত। প্রাচীন ভারতীয় আর্য, মধ্যভারতীয় আর্য এবং নব্য ভারতীয় আর্য ভাষা। বাংলা ভাষা নব্য ভারতীয় আর্য ভাষাসমূহের একটি ভাষা। নব্য ভারতীয় আর্য ভাষার অন্যান্য ভাষা পরিবারের নাম : হিন্দি, উর্দু, আসামি, উড়িয়া ও মাগধি।
বাংলা ভাষার জন্ম আনুমানিক খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকের মধ্যবর্তী সময়। অর্থাৎ ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। বাংলা ভাষার যুগবিভাগকেও তিনটি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। যেমন-
ক. প্রাচীন যুগ ( ৬৫০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত)
খ. মধ্যযুগ (১২০১ -১৮০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত)
গ. আধুনিক যুগ (১৮০১ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত)।
বংলা ভাষার প্রাচীনতম একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। যা সহজিয়া বৌদ্ধদের সাধনসঙ্গীত নামে পরিচিত। এ সঙ্গীতগুলো সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে রচিত। ড. মুহম্মদ শহীদল্লাহ Buddhist Mystic Songs (1960) নামে চর্যাপদ নিয়ে গবেষণা করেছেন প্যারিসের সরোবন বিশ্ববিদ্যালয়ে। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন-শ্রীকৃষ্ণকীর্ত্তন, পদাবলী সাহিত্য, মঙ্গলকাব্য, নাথ সাহিত্য, জীবনী সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান ও দোভাষী পুঁথিসাহিত্য।

চতুর্দশ শতকে শুরু হয় মুসলমানদের সালতানাত। এই সুলতানগণ বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেন। ফলে বাংলা ভাষা স্থানীয় ভাষায় পরিণত হয়। ষোড়শ শতকে মুঘলরা বাংলা দখল করলে বাংলা ভাষার সাথে ফার্সির সংযোগ ঘটে। বর্তমান বাংলা ভাষার আধুনিক রূপটি পাওয়া যায় ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের সময় বাংলার নদীয়া অঞ্চলে কথিত উপভাষায়। এই ভাষাটির দু’টি রূপ : সাধু ও চলিত। এগুলোর ভিত্তি গড়ে উঠেছে প্রধানত বঙ্গ-কামরূপী প্রাকৃত, মাগধি প্রাকৃত এবং পালিসহ তুর্কি, পর্তুগিজ, ফার্সি ও ইংরেজি থেকে।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫২সাল পর্যন্ত বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার দাবিতে তুমুল গণ-আন্দোলন গড়ে ওঠে। সৃষ্টি হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অন্যায়-অত্যাচার ও বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ স্বাধিকার আন্দোলনে সঙ্ঘবদ্ধ হয়। ফলে ১৯৭১ সালে ৯ মাসব্যাপী এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে মহান মুক্তি সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ভাষা আন্দোলনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

পৃথিবীতে বর্তমানে ভাষার সংখ্যা সাত হাজার ১১১টি। সমগ্র বিশ্বের ভাষাসমূহকে ১২টি মৌলিক পরিবার এবং ৫০টি গৌণ পরিবারে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিটি দেশে আয়তন অনুযায়ী এক বা একাধিক রাষ্ট্রীয় ভাষা স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে ভাষারবৈচিত্র্য সর্বাধিক। ওই অঞ্চলে এক হাজার ৬৫২টি ভাষা প্রচলিত থাকলেও ১০ লাখের অধিক মানুষ কথা বলে এমন প্রতিনিধিস্থানীয় ভাষার সংখ্য ২৯। জাতিসঙ্ঘের দাফতরিক ভাষা ছয়টি, যথা : চিনা, ফরাসি, ইংরেজি, রুশ, স্পেনিশ ও আরবি। বিশ্বসভায় নেতৃবৃন্দের প্রদত্ত বক্তৃতা-বিবৃতি এই ছয়টি ভাষায় অনূদিত হয়।
বাংলা ভাষা ব্যবহারকারী অঞ্চলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসাম, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, মিজোরাম, ঝাড়খণ্ড, মেঘালয়, অরুণাচল, নাগাল্যান্ড : বাংলাদেশ ও ভারতে বসবাস করেন ২৬ কোটির বেশি বাংলা ভাষাভাষী। বাকি চার কোটি মানুষ ছড়িয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। পাকিস্তানের করাচিতে প্রায় ২১ লাখ মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলেন। করাচি সিটি করপোরেশনের অন্যতম দাফতরিক ভাষা বাংলা। ইংল্যান্ডে স্বীকৃত পঞ্চম অভিবাসী ভাষা বাংলা। সেখানে আট লক্ষাধিক মানুষ বাংলা ভাষা ব্যবহার করেন। মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও যুক্তরাষ্ট্রেও আছেন অনেক বাঙালি অভিবাসী। এশিয়া, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, আমেরিকা সর্বত্র রয়েছেন বাংলা ভাষাভাষী। বাংলাদেশ, ভারত ও আফ্রিকার সিয়েরালিওনের দাফতরিক ভাষা বাংলা।