বাবার পুরনো ডায়েরি ও কাগজপত্রের ভাণ্ড নিয়ে বসে শায়ান ও শব্দ। পুরনো আলমিরা থেকে বাবার কাগজপত্র, বই-পুস্তক, ক্রেস্ট, বাবার মার্শাল আর্টের সার্টিফিকেট ও অন্যান্য শোপিস নতুন আলমিরায় রাখার পূর্বে খানিকটা পরিষ্কার ও ভাঁজ করে নিতে এত আয়োজন দুইজনের।
এহেন কাজে ব্যস্ত থাকা শায়ানের হাতে একটি ডায়েরি আসে, যার ভেতরে পাওয়া গেল বিশ্বের বেশকিছু দেশের ডাকটিকিট সংবলিত কয়েকটি কার্ড। সংগ্রাহক হিসেবে বাবার ছবি ও তারিখ দেয়া আছে কার্ডগুলোতে।
কার্ডে যেসব দেশের ডাকটিকিট লাগানো আছে, সেগুলো হলো- বাংলাদেশ, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, মিসর, ফিলিপাইন, কুয়েত, ইয়েমেন, সিঙ্গাপুর, লিবিয়া, মরক্কো, মালয়েশিয়া, জাপান, পাকিস্তান, ভারত, তুরস্ক, শ্রীলঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র, নেপাল, হংকং-চীন, মিয়ানমার, ইরিত্রিয়া, সুদান, ইতালি, সোমালিয়া, ইথিওপিয়া অন্যতম। ডাকটিকিটগুলো দেখে বেশ উৎফুল্ল শায়ান ও শব্দ। দু’জনের মধ্যে বেশ আগ্রহ দেখে কাছে এলেন বাবা।

বাবার কাছে জানতে চায় তারা, কিভাবে এগুলো সংগ্রহ করলেন- কেনইবা সংগ্রহ করলেন।
তখনই বাবার চোখের পর্দায় ভেসে এলো- সদ্য কৈশোর পেরুনো এক টগবগে প্রবাসী যুবকের মুখ। আর সে মুখটা তো তারই। শায়ান ও শব্দর বাবা সবেমাত্র প্রবাসে পাড়ি দিয়েছেন জীবিকার তাগিদে। চোখে স্বপ্ন আর শৌখিন মন নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রিয় মাতৃভূমি ছেড়েছেন তিনি। তারিখটাও ভুলেননি আজো, ১৯৯৮ সালের ২৫ মার্চ। স্বদেশ ছেড়ে যাওয়া বেদনার পাশাপাশি রঙিন বিশ্বের বিলাসীযাপনের সুখ পেতেও মরিয়া ছিলেন তিনি। তাইতো প্রবাসটা বেশ সুখের ছিল তার। নতুন জায়গা, নতুন বন্ধু, ভিনদেশী-ভিনভাষার কতশত মানুষের সাথে পরিচয়। তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাসের সাথে পরিচয়- সবমিলিয়ে এক মজার প্রবাস জীবন শুরু হয় শায়ান ও শব্দর বাবার।
দেশে থাকাকালীন দু-একটি দেশের ডাকটিকিট সংগ্রহ করেছিলেন তিনি- যেমন বড়কাকা ওমান থেকে চিঠি পাঠাতেন, সেখান থেকে ওমানের ডাকটিকিট। ছোটমামার পাঠানো চিঠি থেকে পাওয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডাকটিকিট। এছাড়া দু-একজন প্রবাসী আত্মীয়ের বাড়ি থেকে দু-চারটা ডাকটিকিট সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন সেসময়।

প্রবাসে নানান দেশের মানুষ, তাদের প্রত্যেকের দেশ থেকে চিঠি আসত তখন। তাদের সাথে সখ্য গড়লেই অনায়াসে সংগ্রহ করা যায় শখের ডাকটিকিট। যেমন ভাবা তেমনই কাজ। একে একে নতুন দেশের মানুষের সাথে পরিচয় হতে লাগলেন তিনি। ডাকটিকিট চেয়ে নিতেন, খুশি মনে দিয়েও দিত তারা। কেউ কেউ অবাক চোখে তাকাত তার মুখের দিকে। ভাবতো ডাকটিকিট পাগল এমন মানুষ এর আগে দেখেনি তারা। ডাকটিকিট দিতে পেরে তারাও খুশি থাকত। ব্যস, এভাবেই ডাকটিকিট সংগ্রহ করেছেন শায়ান ও শব্দর বাবা।
আজ পুরনো কাগজপত্র ঘেঁটে পাওয়া ডাকটিকিটগুলো তাকে নিয়ে গেল সুদূর অতীতে, প্রবাসের স্মৃতিময় সেই দিনগুলোতে।
শায়ান ও শব্দ অপলক বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ডাকটিকিট সংগ্রহের পুরো গল্পটা শুনল আর বাবার এমন শৌখিন জীবন সম্পর্কে জেনে মনে মনে গর্ববোধ করল তারা।