দাদুর কাছ থেকে গল্প শোনার স্মৃতি গ্রামীণ ছেলেদের থাকবে না এমন কথা হতে পারে না। ভূত-পেতনি, মৃত দাদার, দাদুর শৈশব সে যাই হোক- প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন গল্প শুনা যায়। গল্প শুনতে শুনতে দাদুর করা মাঝে মধ্যে কিছু শব্দ উচ্চারণে ভুল নিয়ে কত হা আর ঠাট্টা করা হয়। আজ সন্ধ্যার এই সময়ে বিদ্যুৎ নেই, এ জন্য পড়াশোনা থেকে বাঁচা গেল। দাদুর ঘরে গিয়ে তার কাছে বসলাম গল্প শুনতে। নানান কথা বলতে বলতে বিষধর অজগরের কথা চলে এলো। অজগর সব থেকে বিষধর সাপ, তবে দাদুর মতে ঢোঁড়া ছিল সবচেয়ে বিষধর। এটি কেমন কথা! ঢোঁড়া তো সবচেয়ে ভীতু আর নির্বিষ সাপ। আমি তো নির্ভয়ে কত ঢোঁড়া সাপ মেরে ফেলতে পা। তখন দাদু বিষধর ঢোঁড়ার গল্প বলতে শুরু করলেন-
অনেক আগের কথা, সব প্রাণীর মধ্যে তখন ঢোঁড়া একমাত্র বিষধর প্রাণী। অন্য সব প্রাণী ছাড়াও সব প্রজাসাপও একদম নির্বিষ। এ জন্য ঢোঁড়া সাপ ছিলে ভীষণ অহঙ্কারী আর রাগী স্বভাবের। ঢোঁড়া নাম শুনলেও অন্য সবাই ভয়ে কাঁপতে থাকে। তার সামনে কখনো কেউ কোনো ভুল করলেই ছোবল বয়ে দেয় রাগে। আর ছোবল মারলে সেই প্রাণীর মৃত্যু হবে তা অনিবার্য। এত অবিষ ছিল তখন ঢোঁড়ার বিষদাঁতে! এভাবে বেশ ভালো দিন যাচ্ছিল তার। তবে একসময় বিয়ের বয়স চলে এলো। ঢোঁড়া অন্য প্রজাসাপেদের কন্যা বিয়ের জন্য পছন্দ করতে গেল। কিন্তু বিয়ের জন্য কন্যা দেখতে গিয়ে কোনো গোলমাল হলেই হবু শ্বশুর মশাইকে পর্যন্ত ছোবল মেরে শেষ করে ফেলে। তার অতিরিক্ত বিষ তখন বিশাল বিপদ হয়ে দাঁড়াল। ঢোঁড়ার মা তখন তাকে একটি বুুদ্ধি দিলেন, সে যেন কন্যা দেখতে যাওয়ার সময় তার সমস্ত বিষ একটি কচুপাতায় সংরক্ষণ করে রেখে যায়। তাতে যদিও তার কোনো বিষয়ে রাগ হয় তবে তার ছোবলে কেউ মারা পড়বে না অন্তত। ঢোঁড়ার বুুদ্ধিটি পছন্দ হয়, ভাবলো কন্যা দেখে ফিরেই আবার নিজের বিষ নিজের দাঁতে তুলে নিতে পারবে।
পরের দিন বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে তার সম্পূর্ণ বিষ একটি কচুপাতার মধ্যে রেখে সামান্য একটু নিজের আত্মরক্ষার জন্য দাঁতে রেখে দিলো। তারপর দূরে একজায়গায় চলে গেল বিয়ের জন্য কন্যা দেখতে। এই বিষয় মুহূতের্র মধ্যে তখন সব প্রাণীর কানে কানে পৌঁছে গেল। আজ ঢোঁড়া তার সমস্ত বিষ ফেলে এসেছে, কাউকে ছোবল মারলে কেউ মারা যাবে না তাতে। ঢোঁড়ার সমস্ত বিষ যে একটা কচুপাতায় রেখে গেছে এটিও সবাই জেনে ফেলেছে। মহা এই সুুযোগ কাজে লাগিয়ে তখন অন্য সব প্রাণী ঢোঁড়ার বিষ নিয়ে চিন্তা করল। সব প্রজাতির সাপ, মাছ, পশু সবাই ঢোঁড়ার রাখা বিষ চুকতে ছুটে গেল। সবার মধ্যে অজগর দেহের দিক থেকে একটু শক্তিশালী ছিল, সবাইকে পেছনে ফেলে তাই সবচেয়ে বেশি বিষ সে নিয়ে নিলো। অন্য সব সাপ আর পশু অনেকে এভাবে বিষ নিয়ে নিলো। তারপর মাছের মধ্যে টেংরা, মাগুর এমন কয়েকটি মাছ সেই কচুপাতা মুছে বিষ সংগ্রহ করল। এভাবে সবশেষে সবার ভাগ্যে আর বিষ জুটল না, আর যারা বিষ নিতে পারল তারা সেদিন থেকে হয়ে উঠল বিষধর প্রাণী। তাদের মধ্যে অজগর সবচেয়ে বিষধর হলো, কারণ সে সবচেয়ে বেশি বিষ নিল। শেষমেশ ঢোঁড়া যখন ফিরে এলো তখন এই অবস্থা দেখে ভয়ে পেয়ে গেল এবং সবার কাছ থেকে পায়ে গেল। কারণ এত দিন যাদের উপর বিষের জন্য সে অত্যাচার করেছে তারা আজ তার থেকে বেশি বিষধর এবং তারপর থেকেই ঢোঁড়া এমন নির্বিষ আর দুর্বল এক সাপ হয়ে গেল।
দাদুর কাছ থেকে গল্প শোনার স্মৃতি গ্রামীণ ছেলেদের থাকবে না এমন কথা হতে পারে না। ভূত-পেতনি, মৃত দাদার, দাদুর শৈশব সে যাই হোক- প্রতিদিন ভিন্ন...
